স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, শেয়ারবার্তা ২৪ ডটকম, ঢাকা: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ওষুধ ও রসায়ন খাতের কোম্পানি সিলভা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের আইপিও তহবিল ব্যবহারে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, আইপিও অর্থ দিয়ে ক্রয়কৃত যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামের মূল্য নির্ধারণে অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে কড়া অবস্থান নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।

এর পরিপ্রেক্ষিতে বিএসইসি কোম্পানিটিকে একজন স্বাধীন মূল্যনির্ধারক নিয়োগ করে যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামের পুনর্মূল্যায়ন সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে সংশোধিত মূল্যায়ন প্রতিবেদন কমিশনে জমা দিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি নতুন কারখানা ভবন কার্যকর করে এর বর্তমান পরিচালন অবস্থার হালনাগাদ প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশও দিয়েছে কমিশন।

বিএসইসির চিফ অ্যাকাউন্ট্যান্ট ডিভিশনের কর্পোরেট রিপোর্টিং ডিপার্টমেন্ট থেকে সম্প্রতি এ সংক্রান্ত একটি চিঠি সিলভা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বরাবর পাঠানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। বিগত সরকারের আমলে আইন বা বিধি-বিধান লঙ্ঘন করা কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর বিরুদ্ধে তেমন কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর পুনর্গঠিত বিএসইসির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বাধীন নতুন কমিশন কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে।

আইপিও তহবিল ব্যবহার করে ক্রয়কৃত যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামের জন্য সিলভা ফার্মাসিউটিক্যালসের দাখিলকৃত মূল্যায়ন প্রতিবেদন পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয় যে, উক্ত মূল্যায়ন প্রতিবেদনটি ১৮ আগস্ট ২০১৩ তারিখে জারিকৃত নোটিফিকেশনের শর্তাবলি অনুসরণ করে প্রস্তুত করা হয়নি। তাই সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯-এর ধারা ১১ (২) অনুযায়ী কোম্পানিটিকে পুনরায় গত ১৮ আগস্ট ২০১৩ তারিখে জারিকৃত নোটিফিকেশনের শর্তাবলি পরিপালন করতে হবে।

পাশাপাশি একজন স্বাধীন মূল্যনির্ধারক নিয়োগের মাধ্যমে আইপিও তহবিল ব্যবহার করে ক্রয়কৃত যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামের সংশোধিত মূল্যায়ন প্রতিবেদন এই পত্র জারির তারিখ থেকে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে কমিশনে দাখিল করতে হবে। এছাড়া আইপিও তহবিল ব্যবহার করে ক্রয়কৃত যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম স্থাপনপূর্বক নতুন কারখানা ভবন কার্যকর করতে হবে। এরপর উক্ত নতুন কারখানা ভবনের হালনাগাদ পরিচালন অবস্থা প্রতিবেদন এই পত্র জারির তারিখ থেকে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে কমিশনে দাখিল করতে হবে।

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির পর থেকে বিগত ৬ বছরেও আইপিওর মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ ব্যয় করতে পারেনি সিলভা ফার্মাসিউটিক্যালস। এরই মধ্যে আইপিওর অর্থ ব্যবহারে কোম্পানিটি ৫ দফা সময় বাড়িয়েছে। তবুও ওই অর্থ ব্যয় করতে ব্যর্থ হয়েছে কোম্পানিটি। এবার কোম্পানির বিরুদ্ধে আইপিওর অর্থ ব্যয়ে সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে আইপিওর অর্থ ব্যয় সংক্রান্ত প্রতিবেদন নিরীক্ষা করেছে পিনাকী অ্যান্ড কোম্পানি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস আইন লঙ্ঘনের তথ্য জানিয়েছে।

পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় আইপিও তহবিল ব্যবহারের বিষয়টি কমিশন নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করে থাকে। সে অনুযায়ী, স্বাধীন মূল্যনির্ধারক নিয়োগের মাধ্যমে আইপিও তহবিল ব্যবহার করে ক্রয়কৃত যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামের সংশোধিত মূল্যায়ন প্রতিবেদন এবং নতুন কারখানা ভবনের হালনাগাদ পরিচালন অবস্থা প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্দেশনা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে বা আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইপিও তহবিল ব্যবহারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা বিনিয়োগকারীদের আস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের নির্দেশনা কমিশনের কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার বার্তা দেয়।
২০২৫ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থ বছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে সিলভা ফার্মাসিউটিক্যালসের পরিচালনা পর্ষদ শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ না দেওয়ার (নো ডিভিডেন্ড) ঘোষণা দেয়।

আলোচ্য সময়ে কোম্পানিটির ওই বছরে শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে (০.৯৭) টাকা। আগের হিসাববছরে কোম্পানির শেয়ারপ্রতি লোকসান ছিল (০.৪৭) টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্য (এনএভিপিএস) দাঁড়িয়েছে ১৫.৪৮ টাকায়। সর্বশেষ চলতি অর্থ বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর, ২০২৫) কোম্পানির শেয়ারপ্রতি লোকসান (ইপিএস) হয়েছে (০.২৬) টাকা। আগের অর্থ বছরের একই সময়ে কোম্পানির শেয়ারপ্রতি মুনাফা ছিল ০.২৪ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কোম্পানির শেয়ার প্রতি সম্পদ (এনএভি) হয়েছে ১৫.২২ টাকা।

২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত কোম্পানিটির স্বল্পমেয়াদি ঋণ ছিল ২ কোটি ৮২ লাখ ২০ হাজার টাকা।এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএসইসির একজন কর্মকর্তা বলেন, কোম্পানিটির আইপিও তহবিল দিয়ে কেনা যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামের জন্য কোম্পানির দাখিল করা মূল্যায়ন প্রতিবেদন ২০১৩ সালের ১৮ আগস্ট জারি করা বিএসইসির নির্ধারিত নোটিফিকেশনের শর্ত অনুসরণ করে প্রস্তুত করা হয়নি।

তাই ক্রয়কৃত যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামের সংশোধিত মূল্যায়ন প্রতিবেদন পুনরায় দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গত বছরের মার্চে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় সিলভা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের পাঁচ বছরের সম্পদ, ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও আর্থিক সক্ষমতা খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নেয় বিএসইসি। এ লক্ষ্যে ১৫টি শর্ত নির্ধারণ করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

২০১৮ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ‘বি’ ক্যাটাগরির কোম্পানি সিলভা ফার্মাসিউটিক্যালসের পরিশোধিত মূলধন ১৩৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা। মোট শেয়ারের মধ্যে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে রয়েছে ৪৫.২১ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ১৬.০৭ শতাংশ, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে ০.০১ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ৩৮.৭১ শতাংশ শেয়ার।