স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, শেয়ারবার্তা ২৪ ডটকম, ঢাকা: দেশের পুঁজিবাজারে চরম আস্থার সংকট চলছে। প্রতিদিনই বাজারে লেনদেন তলানিতে চলে যাচ্ছে। পুঁজিবাজারে দরপতনের কারণে বিভিন্ন সময় পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। তবে এর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে মার্জিন ঋণ দায়ী বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া একটি দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকা শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয় পুঁজিবাজারকে।

অর্থনীতির অগ্রগতির ধারাকেও তরান্বিত করে পুঁজিবাজার। তবে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের চিত্র ভিন্ন রকম। দেশের অর্থনীতি এগিয়ে গেলেও পুঁজিবাজার তার তুলনায় অনেক দূর্বল। মুলত পুঁজিবাজারের অগ্রগতি না হওয়ার পেছনে দায়ী করা হয় পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের হঠকারী সিদ্ধান্তকে। মুলত সম্প্রতি পুঁজিবাজার দরপতনের পেছনে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) মার্জিন ঋণ ইস্যু ও পাঁচ ব্যাংক ইস্যুতে বাংলাদেশ ব্যাংকের হঠকারী সিদ্ধান্তে পুঁজিবাজারে আস্থা সংকটের সৃষ্টি হয়েছে।

বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, পুঁজিবাজার ইস্যূতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ঘন ঘন সিদ্ধান্ত সিদ্ধান্ত ও পাঁচ ব্যাংকের শেয়ার শূন্য ঘোষণায় বাংলাদেশ ব্যাংকের হঠকারী সিদ্ধান্তে পুঁজিবাজারে আস্থা সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া মার্জিন ঋণ পুঁজিবাজারের জন্য ক্যান্সারে পরিণত হয়েছে।

একাধিক সময়ে পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতার জন্য নানা ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হলেও সুফল মিলছে না। প্রতিনিয়ত এই ঋণের বোঝা বাড়ছে। প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা মার্জিন ঋণে আটকে গেছে বলে মনে করছেন দেশের পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা।

এছাড়া অনিয়ম ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বল ভূমিকার কারণে দেশের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের তৈরি হয়েছে চরম আস্থাহীনতা। লেনদেনে দেখা দিয়েছে খরা। দীর্ঘদিন ধরেই মন্দার মধ্যে বাজার। গত ১৭ মাসের বেশি সময় ধরে আসেনি কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও)। সার্বিকভাবে দেশের পুঁজিবাজার এখন কার্যত গতিহীন।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, গত ১৫ বছরে বাজারে ধারাবাহিক অনিয়ম বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট করেছে। সম্প্রতি পাঁচটি ব্যাংকের শেয়ার শূন্য ঘোষণার ঘটনায় সেই আস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে, যার দায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার। অতীতেও বাজারে খারাপ সময় গেছে, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি নজিরবিহীনভাবে ভয়াবহ।

তাদের ভাষ্য, বর্তমানে তালিকাভুক্ত কোম্পানির প্রায় ৫০ শতাংশই উৎপাদনে নেই। বাজারে গতি ফেরাতে হলে দ্রুত কিছু ভালো ও শক্তিশালী কোম্পানির আইপিও আনতে হবে। ভালো কোম্পানি পুঁজিবাজারে এলে বিকল্প বিনিয়োগ সৃষ্টি হবে, নতুন বিনিয়োগকারী আসবেন এবং এর ইতিবাচক প্রভাব পুরো বাজারে পড়বে।

একাধিক ব্রোকারেজ হাউজের কর্মকর্তারা জানান, প্রতিদিন গড়ে এক হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন হলে অধিকাংশ ব্রোকারেজ হাউজ ব্রেক-ইভেন্টে থাকতে পারে। অথচ কয়েক বছর ধরে দৈনিক লেনদেন তিনশ থেকে পাঁচশ কোটি টাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। মাঝেমধ্যে লেনদেন কিছুটা বাড়লেও তা স্থায়ী হচ্ছে না। বরং প্রায়ই লেনদেন নেমে আসে দুইশ কোটি টাকার ঘরে। এতে অনেক ব্রোকারেজ হাউজের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।

তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ডিএসইতে মাত্র ২১ কার্যদিবসে এক হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়েছে। বিপরীতে ১২৬ কার্যদিবসে লেনদেন ছিল তিনশ কোটি টাকা বা তারও কম। এদিকে ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ছিল ৬ হাজার ১৫ পয়েন্ট। চলতি বছরের ১১ জানুয়ারি লেনদেন শেষে সূচক নেমে এসেছে ৪ হাজার ৯৩৯ পয়েন্টে। অর্থাৎ দেড় বছরের ব্যবধানে প্রধান সূচক কমেছে ১ হাজার ৭৬ পয়েন্ট।

সম্প্রতি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক: ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক (এসআইবিএল), এক্সিম ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংকের শেয়ার শূন্য ঘোষণা করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ নামে নতুন একটি ব্যাংক গঠন করা হয়েছে। ফলে এসব ব্যাংকের শেয়ারে বিনিয়োগ করা বিনিয়োগকারীরা তাদের সম্পূর্ণ বিনিয়োগ হারিয়েছেন। কিন্তু সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখেনি।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিএসইর এক সদস্য বলেন, পাঁচ ব্যাংকের শেয়ার শূন্য করার মাধ্যমে যারা প্রকৃত অপরাধী তাদের এক ধরনের দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। বিপরীতে বলির পাঠা বানানো হয়েছে নিরপরাধ সাধারণ বিনিয়োগকারীদের। কারণ ৫ আগস্টের আগে এই পাঁচ ব্যাংকের প্রত্যেকটি নিয়মিত লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে এবং আর্থিক প্রতিবেদনে মুনাফা দেখানো হয়েছে।

কিন্তু এখন এই ব্যাংকগুলোর বড় লোকসান দেখানো হচ্ছে। এই লোকসান নিশ্চয় একদিনে হয়নি। তাহলে ধরেই নেওয়া যায় আগের আর্থিক প্রতিবেদনগুলো জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে। তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, যদি জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করা হয়, তাহলে এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হলো। যে অডিটর আর্থিক প্রতিবেদন অডিট করেছেন, তার বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?

দুই নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএসইসির যেসব কর্মকর্তাদের এগুলো দেখভালের দায়িত্বে ছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। যারা ব্যাংকের অর্থ লোপাট করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? আমরা দেখছি অনিয়মের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের নিঃস্ব করে দেওয়া হয়েছে। আর পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা এ বিষয়ে টু শব্দটিও করেনি। এ ঘটনা বিনিয়োগকারীদের আস্থা একেবারে নষ্ট করে দিয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শীর্ষ এক ব্রোকারেহ হাউজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, পুঁজিবাজারে সব সময় কিছু মার্কেট প্লেয়ার থাকে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বাজার এতটাই নিষ্প্রাণ যে মার্কেট প্লেয়ার সংকট তৈরি হয়েছে। বড় ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা প্রায় সবাই সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। সব মিলিয়ে পুঁজিবাজার অত্যন্ত কঠিন সময় পার করছে।