শেয়ারবার্তা ২৪ ডটকম, ঢাকা: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক খাতের কোম্পানি ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) পিএলসি বড় পরিসরে খেলাপি ঋণের ভারে ধুঁকছে। গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। যার বিপরীতে বড় অঙ্কে সঞ্চিতি গঠনের প্রয়োজন।

কিন্তু ব্যাংকটি নগদ অর্থের অভাবে সেই সঞ্চিতি গঠন করতে পারছে না। উল্টো ব্যবসা পরিচালনায় ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি রয়েছে প্রায় ৯৭৩ কোটি টাকা। সঞ্চিতি ঘাটতি ধরে হিসাব করলে ব্যাংকের মোট ঘাটতি দাঁড়ায় ৪ হাজার ৮৬৯ কোটি টাকার বেশি।

অভিযোগ রয়েছে, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ ও তার পরিবারের সদস্যরা ঋণের নামে ব্যাংকটি থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা লুট করায় এই দুরবস্থায় পড়েছে ইউসিবি। এছাড়া ব্যাংকটির কয়েকজন পরিচালককের বিরুদ্ধে ঋণের নামে লুটপাট করার অভিযোগ রয়েছে। তবে এ বিষয় ব্যাংক কর্র্তৃপক্ষ মুখ খুলছে না।

ফলে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) ২০২৪ সালে প্রকৃতপক্ষে ৩ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকার বেশি বা শেয়ারপ্রতি ২৫.০৮ টাকা লোকসান হয়েছে। তবে এ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ওই বছরের ব্যবসায় প্রায় ৮ কোটি টাকা বা শেয়ারপ্রতি ০.০৫ টাকা মুনাফা দেখিয়েছে। ব্যাংকটির ২০২৪ সালের আর্থিক হিসাব নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। ব্যাংকটির ২০২৪ সালে শেয়ারপ্রতি ০.০৫ টাকা করে নিট মুনাফা দেখানো হয়েছে ৭ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। আর ব্যাংকটির নিট সম্পদ ৪ হাজার ৯৬ কোটি ৯ লাখ টাকা বা শেয়ারপ্রতি নিট ২৬.৪২ টাকা সম্পদ দেখানো হয়েছে।

তবে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, এ ব্যাংকটির বিনিয়োগ, লিজিং কোম্পানিতে এফডিআর ও অন্যসব সম্পদের বিপরীতে ২০২৪ সালে ৩ হাজার ৮৯৬ কোটি ২৬ লাখ টাকার প্রভিশন বা সঞ্চিতি ঘাটতি রয়েছে। যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনের মাধ্যমে পরবর্তীতে গঠন করার সুযোগ পেয়েছে ব্যাংকটি। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সুযোগ আন্তর্জাতিক হিসাব মানের সঙ্গে সামঞ্জসূপূর্ণ না।

কারন ব্যাংকটিকে এখন সঞ্চিতি গঠন থেকে বিরত থাকার সুযোগ দিলেও ভবিষ্যতে ঠিকই করতে হবে। সেটার প্রভাব এখন না দেখিয়ে ভবিষ্যতে দেখানো হবে। এটা একধরনের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রতারণা। এ ব্যাংকটির ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর প্রদত্ত ঋণ বা বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫৭ হাজার ২৮২ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। এরমধ্যে ৮ হাজার ৫৩৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা খেলাপি হয়ে গেছে। ওই খেলাপির বিপরীতে ৬ হাজার ৫৫ কোটি ১২ লাখ টাকা সঞ্চিতি গঠন করা দরকার হলেও ইউসিবি কর্তৃপক্ষ করেছে ২ হাজার ৭০৫ কোটি ৬২ লাখ টাকা।

এক্ষেত্রে সঞ্চিতি ঘাটতি ৩ হাজার ৩৪৯ কোটি ৫১ লাখ টাকা। এদিকে ব্যাংকটি থেকে কিছু লিজিং কোম্পানিতে ১৫৫ কোটি ৪৮ লাখ টাকা এফডিআর করা হয়েছে। যেগুলোর মেয়াদ অনেক আগেই পূর্ণ হয়েছে। তবে সেই টাকা আদায় করা যাচ্ছে না লিজিং কোম্পানির দ্বৈণদশার কারনে। যা আদায় নিয়ে শঙ্কা জানিয়েছেন নিরীক্ষক।

এজন্য কোম্পানিটির ১৫৫ কোটি ৪৮ লাখ টাকা সঞ্চিতি গঠন দরকার হলেও ইউসিবি কর্তৃপক্ষ তা করেনি। এর বাহিরে ব্যাংকটির অন্যান্য সম্পদের উপর ৩৯১ কোটি ২৭ লাখ টাকার সঞ্চিতি গঠন করা দরকার বলে জানিয়েছেন নিরীক্ষক। কিন্তু ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তা করেনি।

ব্যাংকটিতে হিসাব মান অনুযায়ি ২০২৪ সালেই ঘাটতির ৩ হাজার ৮৯৬ কোটি ২৬ লাখ সঞ্চিতি গঠন করা দরকার ছিল। যা করা হলে ব্যাংকটির ওই বছরে ৩ হাজার ৮৮৮ কোটি ৫১ লাখ টাকা বা শেয়ারপ্রতি (২৫.০৮) টাকা লোকসান হতো বলে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এদিকে ওই প্রয়োজনীয় সঞ্চিতি ২০২৪ সালে গঠন করা হলে ব্যাংকটির নিট সম্পদ ৪ হাজার ৯৬ কোটি ৯ লাখ টাকা থেকে ১৯৯ কোটি ৮৩ লাখ টাকায় বা শেয়ারপ্রতি সম্পদ ২৬.৪২ টাকা থেকে কমে ১.২৯ টাকায় নেমে আসতো।

ব্যাংকটির নিরীক্ষক জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ইউসিবি মোট ৫৭ হাজার ২৮২ কোটি ৮৯ লাখ টাকা ঋণ ও অগ্রিম বাবদ বিতরণ করেছে। এর মধ্যে ৮ হাজার ৫৩৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা শ্রেণিকৃত (মন্দ ঋণ) হিসেবে পরিণত হয়েছে। নিয়ম অনুসারে এই ঋণ ও অগ্রিমের বিপরীতে ব্যাংকটিকে ৬ হাজার ৫৫ কোটি ১২ লাখ টাকা সঞ্চিতি গঠন করতে হতো। কিন্তু আলোচিত সময়ে ব্যাংকটি এর বিপরীতে মাত্র ২ হাজার ৭০৫ কোটি ৬২ লাখ টাকা সঞ্চিতি গঠনে সক্ষম হয়েছে। অর্থাৎ খেলাপি ঋণ ও অগ্রিমের বিপরীতে প্রয়োজনীয় ৩ হাজার ৩৪৯ কোটি ৫১ লাখ টাকা সঞ্চিতি গঠনে ব্যর্থ হয়েছে ব্যাংকটি।

এদিকে ব্যাংকটি কয়েকটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে (এনবিএফআই) ১৫৫ কোটি ৪৮ লাখ টাকা ফিক্সড ডিপোজিট করে রেখেছিল, যার মেয়াদ কয়েক বছর আগেই শেষ হলেও উত্তোলন সম্ভব হয়নি। এই অর্থ কখনো উত্তোলন করা সম্ভব হবে কী-না তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। নিয়ম অনুসারে এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ আমানতের বিপরীতে সঞ্চিতি গঠন করতে হয়।

কিন্তু ইউসিবি কর্তৃপক্ষ গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এই ১৫৫ কোটি ৪৮ লাখ টাকার বিপরীতে কোনো ধরনের সঞ্চিতি গঠন করেনি। এর বাইরেও ব্যাংকটি ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩৯১ কোটি ২৭ লাখ টাকা সঞ্চিতি গঠনে ব্যর্থ হয়েছে। এর মধ্যে ইউসিবির একটি সাবসিডিয়ারি কোম্পানির ৩৮৯ কোটি ৪০ লাখ টাকা লোকসান রয়েছে, যে সাবসিডিয়ারি কোম্পানিতে ব্যাংকটির মালিকানা ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ। নিয়ম অনুসারে ওই লোকসানের বিপরীতে সঞ্চিতি গঠন বাধ্যতামূলক থাকলেও ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তা গঠন করেনি।

নিরীক্ষক জানিয়েছে, গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকটি খারাপ ঋণ ও অগ্রিমের বিপরীতে, এনবিএফআইগুলোতে ঝুঁকিপূর্ণ ফিক্সড ডিপোজিটের বিপরীতে এবং অন্যান্য সম্পদের বিপরীতে মোট ৩ হাজার ৮৯৬ কোটি ২৬ লাখ টাকা সঞ্চিতি গঠনে ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের চলতি বছরের ২১ মে ইস্যু করা একটি চিঠিতেও ইউসিবিকে ৩ হাজার ৮৯৬ কোটি ২৬ লাখ টাকার সঞ্চিতি গঠনে ব্যর্থ কোম্পানি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

২০২৪ হিসাব বছরে যদি ব্যাংকটি এই বড় অঙ্কের সঞ্চিতি গঠন করত, তাহলে ব্যাংকের নিট লোকসান গিয়ে দাঁড়াত ৩ হাজার ৮৮৮ কোটি ২০ লাখ টাকা। এতে ব্যাংকের শেয়ারপ্রতি লোকসান হতো ২৫ টাকা ৮ পয়সা। কিন্তু আলোচিত হিসাব বছরে ব্যাংকটি এই সঞ্চিতি গঠন না করে আর্থিক প্রতিবেদনে শেয়ারপ্রতি ৫ পয়সা হারে ৮ কোটি ৬ লাখ টাকা নিট মুনাফা দেখিয়েছে। অর্থাৎ ব্যাংকটি সঞ্চিতি গঠন না করে লোকসানকে মুনাফায় রূপান্তর করে দেখিয়েছে।

এদিকে ব্যাসেল-৩ মানদণ্ড অনুসারে ব্যবসা পরিচালনার জন্য ইউসিবির প্রয়োজন ৬ হাজার ৩৫৮ কোটি ৭৮ লাখ টাকার মূলধন। অথচ গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকের এই মূলধন ছিল মাত্র ৫ হাজার ৩৮৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা। অর্থাৎ ব্যবসা পরিচালনায় ইউসিবির মূলধন ঘাটতি রয়েছে ৯৭২ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। এর সঙ্গে ব্যাংকের সঞ্চিতি ঘাটতি যোগ করলে গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকের মোট ঘাটতি দাঁড়ায় ৪ হাজার ৮৬৯ কোটি ১৩ লাখ টাকা।

নিরীক্ষকের মতে, ব্যাসেল-৩ অনুযায়ী ইউসিবির মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত (সিআরএআর) থাকা উচিত ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ। কিন্তু বাস্তবে তা রয়েছে ১০ দশমিক ৫৯ শতাংশ। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সঞ্চিতি ঘাটতি বিবেচনায় নিলে ব্যাংকটির সিআরএআর নেমে আসে মাত্র ৫ দশমিক ৪০ শতাংশে, যা রেগুলেটরি মানদণ্ডের তুলনায় অনেক কম।

অভিযোগ রয়েছে, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ ও তার পরিবারের সদস্যরা এই ব্যাংকটি থেকে ঋণের নামে লুটপাট করে অন্তত ২ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। সেই অর্থের বড় একটা অংশ দেশের বাইরে পাচার করা হয়েছে। সাইফুজ্জামান চৌধুরী ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের সাবেক চেয়ারম্যান। তিনি তার রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে ২০১৮ সালে ব্যাংকটির পূর্ববর্তী পর্ষদের সদস্যদের পদত্যাগ করতে বাধ্য করেন এবং নিজ পরিবার ও সহযোগীদের ব্যাংকের পর্ষদে অন্তর্ভুক্ত করেন।

স্ত্রী রুখমিলা জামানকে চেয়ারম্যান এবং ভাই আনিসুজ্জামানকে নির্বাহী কমিটির প্রধান নিযুক্ত করেন। এর মাধ্যমে ব্যাংকটিতে তার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর থেকে শুরু হয় লুটপাট। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ব্যাংকটির আগের পর্ষদ ভেঙে দিয়ে নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন পর্ষদ দায়িত্ব নিয়ে আগের পরিচালকদের অনিয়মের অনুসন্ধান শুরু করে।

একই সঙ্গে ব্যাংকটিতে লুটপাটের তথ্য পেতে ফরেনসিক অডিট করা হয়। সম্প্রতি অডিট প্রতিবেদন পর্ষদের হাতে এসেছে। ওই প্রতিবেদনের তথ্যউপাত্ত দুদককে জানান হয়েছে। দুদক এ সংক্রান্ত অভিযোগ তদন্ত করে পদক্ষেপ নিবে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৭ আগস্ট ইউসিবি জুবিলী রোড শাখা থেকে নামসর্বস্ব কাগুজে প্রতিষ্ঠানের নামে ২৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আত্মসাতের অভিযোগে সাইফুজ্জামান চৌধুরীসহ ২৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক। এর আগে গত ৩১ জুলাই কর্মচারীর নামে নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান খুলে ১৫ কোটি টাকা তুলে আত্মসাতের অভিযোগে সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক।

ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের অন্ধকার অতীত: বেসরকারি খাতের ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) পুরোনো পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে নতুন করে পর্ষদ গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে এই ব্যাংকটির আরও অন্ধকারাচ্ছন্ন একটি অতীত আছে। প্রায় ২৫ বছর আগে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী পরিবার বন্দুকের মুখে এই ব্যাংকটির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল। ১৯৯৩ সালে এই ব্যাংকের পরিচালক হুমায়ুন জহিরকে তার ধানমন্ডির বাড়িতে গুলি করে হত্যা করা হয়। এর পর থেকে ব্যাংকটির ওপর সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর পরিবারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়।

এর সঙ্গে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর প্রয়াত বাবা আখতারুজ্জামান চৌধুরীর নামও জড়িয়ে আছে। চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের নেতা আখতারুজ্জামান ও তার ছেলের ওপর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আশীর্বাদপুষ্ট ছিলেন। হুমায়ুন জহির হত্যার পর ইউসিবির তৎকালীন চেয়ারম্যান আখতারুজ্জামান চৌধুরী গ্রেপ্তার হন। জামিনে মুক্তি পেয়ে দেশ থেকে পালিয়ে যান তিনি। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দেশে ফিরে আসেন তিনি।

১৯৯৯ সালে ব্যাংকটির হেড অফিসে পরিচালনা পর্ষদের বৈঠক চলার সময় অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের সঙ্গে নিয়ে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর পরিবারের লোকজন হানা দেন। তারা ব্যাংকটির পরিচালকদের পদত্যাগে বাধ্য করেন। এর প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক তখন ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয়। ২০১০ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর আখতারুজ্জামান চৌধুরী ব্যাংকটির বোর্ডে ফিরে আসেন।

অস্ত্রের মুখে ব্যাংক দখলের ওই ঘটনার সঙ্গে ওয়াকিবহাল ব্যক্তিরা জানান, বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে সেটা ছিল অন্যতম কালো অধ্যায় যা শুরু হয়েছিল ১৯৯১ সালে। ওই বছর ইউসিবির পরিচালনা পর্ষদ থেকে আখতারুজ্জামানকে বরখাস্ত করে বাংলাদেশ ব্যাংক। নিজের কোম্পানির নামে ব্যাংক থেকে ২৫০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে পরিশোধ না করায় তার বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয় তখন।

আখতারুজ্জামান ইউসিবির চেয়ারম্যান হয়েও ঋণ পরিশোধ না করায় প্রতিবাদ করেছিলেন হুমায়ুন জহির। বাংলাদেশের ইতিহাসে খেলাপি ঋণের সেটাই ছিল প্রথম বড় ঘটনা। হুমায়ুন জহিরের ছেলে শরিফ জহির বলেন, যখন আমার বাবা প্রতিবাদ জানিয়ে বাবুকে (আখতারুজ্জামান চৌধুরী) ঋণের টাকা পরিশোধ করতে বলেন তখন থেকেই তিনি আমার বাবার শত্রু হয়ে ওঠেন।

শরিফ জহির বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ গার্মেন্টস রপ্তানিকারী ও ব্যবসায়ী গ্রুপ অনন্তের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। শরিফ বলেন, আখতারুজ্জামান তার ভাইপো ও এস আলম গ্রুপের মালিক মোহাম্মদ সাইফুল আলমকে সঙ্গে নিয়ে ব্যাংকটি দখল করেন। ১৯৯৩ সাল থেকে শরিফ ইউসিবির বড় অংশের শেয়ারের মালিক ছিলেন। তার পরিবার ২০১৮ সাল পর্যন্ত ব্যাংকটির শেয়ার ধরে রেখেছিলেন। ২০১৩ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত তিনি ব্যাংকটির ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

তবে ২০১৮ সালে প্রথম প্রজন্মের এই বেসরকারি ব্যাংকটিকে আরেক দফায় বলপূর্বক দখল করা হয়। এবার এই কাজটি করেন আখতারুজ্জামান চৌধুরীর ছেলে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী। গত মঙ্গলবার সাইফুজ্জামান চৌধুরীর পরিবারের নিয়ন্ত্রণ থেকে ব্যাংকটিকে মুক্ত করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক এদিন ব্যাংকটির ১৮ সদস্যের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেন। এই ১৮ জনের মধ্যে ছিলেন সাইফুজ্জামান চৌধুরীর বোন রোক্সানা জামান চৌধুরী এবং তাদের আত্মীয় আনিসুজ্জামান চৌধুরী ও আসিফুজ্জামান চৌধুরী।

১৬ আগস্ট পর্যন্ত সাইফুজ্জামান চৌধুরীর স্ত্রী রুখমিলা জামান ইউসিবির চেয়ারম্যান ছিলেন। ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, সেদিন ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়। তবে পুনর্গঠন করা পর্ষদেও সাইফুজ্জামান চৌধুরীর পরিবারের সদস্যদের রাখা হয়েছিল। শরীফ জানান তিনি এখন বিদেশে অবস্থান করছেন। তিনি আগামী দু-এক দিনের মধ্যে বাংলাদেশে ফিরে আসবেন এবং ইউসিবির পরিচালনা পর্ষদে নবনিযুক্ত পরিচালকদের সঙ্গে বৈঠক করার কথা পরিকল্পনা করছেন।

১৯৮৪ সালে চট্টগ্রাম ভিত্তিক ব্যবসায়ীদের একটি গ্রুপের হাতে ইউসিবি ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়। শুরুতে সুনামের সঙ্গে গ্রাহক সেবা দিলেও সাইফুজ্জামানের পরিবার দখলে নেওয়ার পর পরিস্থিতির অবনতি হতে শুরু করে। একের পর এক ঋণ কেলেঙ্কারিতে যুক্ত হতে থাকে ব্যাংকটির নাম। ২০২৩ সালে ইউসিবির খেলাপি ঋণের পরিমাণ আড়াই হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। ২০১৬ সালে এর পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৭৯২ কোটি টাকা। তবে এই খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বেশি।

এর মধ্যেই সাইফুজ্জামান চৌধুরী যুক্তরাজ্যে প্রায় ২০০ মিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের ৩৫০টিরও বেশি সম্পত্তি নিয়ে গড়ে তুলেছেন রিয়েল এস্টেট সাম্রাজ্য। তিন বারের এই এমপির সম্পত্তির মধ্যে রয়েছে সেন্ট্রাল লন্ডনের বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট থেকে শুরু করে টাওয়ার হ্যামলেটসে আবাসনযেখানে ইংল্যান্ডের বৃহত্তম বাংলাদেশি কমিউনিটির আবাসস্থল এবং লিভারপুলে শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসিক ভবন। বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী সাইফুজ্জামান ও রুখমিলা যুক্তরাষ্ট্র ও দুবাইতেও বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন।