প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্সের বিরুদ্ধে ১৭ প্রতিষ্ঠানের বীমা দাবির অর্থ আত্মসাত
শেয়ারবার্তা ২৪ ডটকম, ঢাকা: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বীমা খাতের কোম্পানি প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্সের এক অভিনব ও চাঞ্চল্যকর জালিয়াতির ঘটনা প্রকাশ পেয়েছে। কোম্পানির তহবিল থেকে অর্থ আত্মসাৎ করতে ভুয়া সার্ভে রিপোর্টের মাধ্যমে ১৪টি গার্মেন্টসসহ ১৭টি প্রতিষ্ঠানের নামে জাল বীমা দাবি (ক্লেম) নিষ্পত্তি দেখানো হয়েছে। জালিয়াতির এমন ভয়াবহ চিত্রে খোদ বীমা গ্রাহকরাই বিস্ময় প্রকাশ করেছে। তাদের সাফ কথা, আমরা তো কোনো ক্লেমই করিনি।
অন্যদিকে যে ৫টি সার্ভেয়ার প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে এই ক্ষয়ক্ষতির ভুয়া রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে। তারা জানিয়েছে, আমরা কোনো নিয়োগই পাইনি, রিপোর্ট দেব কোথা থেকে। বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ (বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ) ইতোমধ্যেই পুরো জালিয়াতির ঘটনাটি খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করেছে।
বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের সদস্য (নন-লাইফ) মোহাম্মদ আবু বকর সিদ্দিক বলেন, ভুয়া সার্ভে রিপোর্টের বিষয়টি খতিয়ে দেখছে আইডিআরএ। এ বিষয়ে আইন বিভাগ কাজ করছে। আইন বিভাগের প্রতিবেদন পাওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। ১৭ ভুয়া বীমা দাবি নিষ্পত্তির মাধ্যমে কত টাকা আত্মসাৎ করেছে তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
কোম্পানির তহবিল থেকে অর্থ আত্মসাৎ করতে ১৭টি বীমা দাবি পরিশোধ দেখানো হয়েছে। এসব বীমা দাবি পরিশোধে জালিয়াতি করে তৈরি করা হয়েছে জরিপ প্রতিবেদন। আবার সব জরিপ প্রতিবেদনেই ব্যবহার করা হয়েছে ক্ষয়ক্ষতির একই রকমের একটি ছবি। অন্যদিকে গ্রাহকরাও জানেন না তাদের নামে বীমা দাবি পরিশোধ দেখানো হয়েছে।
জানা গেছে, প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্সের ২০২২ সালের বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বীমা দাবি পরিশোধে জাল-জালিয়াতির বিষয়টি উঠে আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্স ১৭টি প্রতিষ্ঠানকে ১৭টি বীমা দাবি পরিশোধ করেছে। আর এসব বীমা দাবির ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করেছে ৫টি সার্ভে প্রতিষ্ঠান। এ ৫টি সার্ভে প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি সার্ভে রিপোর্টে ক্ষয়ক্ষতির একই রকমের একটি ছবি ব্যবহার করা হয়েছে।
নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের এই তথ্যের ভিত্তিতে পৃথকভাবে ৫টি সার্ভে প্রতিষ্ঠানকেই একই রকমের ছবি ব্যবহারের কারণ জানতে চেয়ে পত্র দেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ। এর পরিপ্রেক্ষিতে সার্ভে প্রতিষ্ঠানগুলো জানায়, প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্সের এই ১৭টি বীমা দাবি পরিশোধে তাদের যেমন নিয়োগ দেওয়া হয়নি তেমনি তারা কোনো সার্ভে রিপোর্টও দাখিল করেনি। নিরীক্ষা প্রতিবেদন, সার্ভেয়ারদের চিঠিপত্রসহ এ সংক্রান্ত সব তথ্য ঘেঁটে জালিয়াতির তথ্য উঠে এসেছে।
১৭টি প্রতিষ্ঠানের নামে এসব বীমা দাবি পরিশোধ দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে ১৪টি গার্মেন্টস শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই বিজিএমইএর সদস্য। গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানগুলো হলো: এবি ফ্যাশন মেকার; রাতুল অ্যাপারেলস লিমিটেড; ফিন বাংলা অ্যাপারেলস লিমিটেড; ইন্টারলিঙ্ক ড্রেসেস; আমট্রানেট লিমিটেড;
এস-২১ অ্যাপারেলস লিমিটেড; সার ইন্টারন্যাশনাল ক্লোথিং; স্টাফেক্স ফ্যাশনস লিমিটেড; আনাম ক্লোথিং লিমিটেড; স্কাইলার্ক নিট কম লিমিটেড; আরএন টেক্সটাইল; রেনেসাঁ অ্যাপারেলস লিমিটেড; বিসিএল পেপার মিলস লিমিটেড এবং ইন্টারস্টফ ক্লোথিং লিমিটেড। অন্য তিনটি প্রতিষ্ঠান হলো- এমএএ সিস্টেম কম্পিউটার প্রিন্টার্স অ্যান্ড প্যাকেজিং; গিস সিটি প্রকাশনী এবং কুতুববাগ পেপার প্রোডাক্টস লিমিটেড।
একাধিক প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, তারা প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্সের গ্রাহক। তবে এসব বীমা দাবির বিষয়ে তারা কেউ কিছুই জানেন না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক জানিয়েছেন, প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্সের এমন জালিয়াতি দেখে আমি অবাক হয়েছি। আমাদের প্রতিষ্ঠানের ফাইলপত্র যাচাই করে দেখেছি, আমরা এমন কোনো ক্লেইম করিনি। আমাদের নামে তারা যে ইন্স্যুরেন্স ক্লেইম দেখিয়েছে; তা সম্পূর্ণ জাল-জালিয়াতি।
অন্যদিকে কর্তৃপক্ষের কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাবে ৫টি সার্ভেয়ার প্রতিষ্ঠানই স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, ওসব বীমা দাবির বিষয়ে তারা কোনো জরিপ করেনি এবং কোনো রিপোর্টও জমা দেয়নি। প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্স তাদের নাম ভাঙিয়ে সম্পূর্ণ ভুয়া রিপোর্ট তৈরি করেছে।
সোনালী সার্ভে অ্যান্ড ইন্সপেকশন কোং এ বিষয়ে জানিয়েছে, ২০২২ সালে ফিন বাংলা অ্যাপারেলস লিমিটেডের পলিসির বিপরীতে যে জরিপ রিপোর্ট দেখানো হয়েছে সেটি তারা প্রদান করেনি। সার্ভে প্রতিষ্ঠানটি আরও বলছে, প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্স তাদের কোনো নিয়োগই দেয়নি। সুতরাং তাদের পক্ষে রিপোর্ট দেওয়ার কোনো সুযোগই নেই।

