নর্দান ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের ৬৪ কোটি ৫২ লাখ টাকার বীমা দাবি পরিশোধ নিয়ে নয় ছয়!
শেয়ারবার্তা ২৪ ডটকম, ঢাকা: অসুস্থতা, দুর্ঘটনাসহ বিপদে-আপদে বিশ্বজুড়ে মানুষের ভরসার কেন্দ্র ‘বিমা’। বিমা পলিসি করা থাকলেই হাসপাতালের বিল পরিশোধ বা দুর্ঘটনার ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কোনো চিন্তা করতে হয় না গ্রাহককে। গ্রাহকের হয়ে বিমা কোম্পানিই সব শোধ করে দেয়। কিন্তু বাংলাদেশের বিমা খাত এখনো সেই ভরসার জায়গা হয়ে উঠতে পারেনি। বিপদগ্রস্ত গ্রাহক বিমা দাবি নিয়ে পায়ের জুতা ক্ষয় করে ফেললেও অর্থ পরিশোধ নিয়ে গড়িমসি শেষ হয় না সংশ্লিষ্ট বিমা কোম্পানির।
তবে বিমা দাবি পরিশোধ না করার ক্ষেত্রে শীর্ষে স্থানে রয়েছে নর্দান ইসলামী ইনস্যুরেন্স লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির কাছে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত দাবির পরিমাণ ছিল ৬৪ কোটি ৫২ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৬ কোটি ৮৭ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে তারা। টাকার হিসাবে কোম্পানিটির অনিষ্পন্ন বিমা দাবির হার ১ দশমিক ০৬ শতাংশ।
এদিকে নর্দার্ন ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের প্রতি বছরই গ্রস প্রিমিয়াম আয় বেড়েছে। কিন্তু সেই হারে বাড়েনি কোম্পানিটির আন্ডাররাইটিং প্রফিট বা মুনাফার হার। অথচ ব্যবস্থাপনা ব্যয় হয়েছে অনুমোদিত সীমার মধ্যে-ই। ফলে প্রশ্ন উঠেছে নর্দার্ন ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের আর্থিক প্রতিবেদনে প্রকাশিত আন্ডাররাইটিং প্রফিট হিসাবের স্বচ্ছতা নিয়ে। বীমা কোম্পানিটি বলছে, ব্যবসা বৃদ্ধির সাথে সাথে কোম্পানির ঝুঁকিও বেড়েছে। বেড়েছে বীমা দাবি পরিশোধের হার। আর এ কারণেই কোম্পানির আন্ডাররাইটিং প্রফিট বা মুনাফার হার কমে গেছে।
তবে নর্দার্ন ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের বীমা দাবি পরিশোধের তথ্য যাচাই করে এই দাবির সত্যতা মেলেনি আমার অনুসন্ধানে। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দক্ষতার সাথে যথাযথভাবে নন-লাইফ বীমা পলিসি আন্ডাররাইট করতে না পারলে কোম্পানির ঝুঁকি বাড়ে। এক্ষেত্রে বীমা দাবির পরিমাণ বেড়ে যায় এবং কোম্পানির আন্ডাররাইটিং প্রফিট কমে যায়। তবে তাদের মতে, নন-লাইফ বীমা খাতে আন্ডাররাইটিং প্রফিট হিসাবের ক্ষেত্রে গোঁজামিল দেয়ার অভিযোগ রয়েছে দীর্ঘ দিন ধরেই।
তাই বীমা কোম্পানিগুলোর এসব তথ্য যাচাই করার জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি বাড়ানো উচিত। এক্ষেত্রে প্রয়োজনে বিশেষ নিরীক্ষক নিয়োগ করা যেতে পারে বলে মনে করছেন বীমা খাত সংশ্লিষ্টরা।
নর্দার্ন ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে, ২০১৫ সালে বীমা কোম্পানিটি ৩৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা গ্রস প্রিমিয়াম আয়ের বিপরীতে আন্ডাররাইটিং প্রফিট বা মুনাফা করে ১৩ কোটি ১০ লাখ টাকা। অর্থাৎ গ্রস প্রিমিয়াম আয়ের ৩৭.২৭ শতাংশ আন্ডাররাইটিং প্রফিট করে।
ওই বছরে বীমা কোম্পানিটি নেট বীমা দাবি পরিশোধ করে ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা, যা গ্রস প্রিমিয়ামের ১০.০৫ শতাংশ। অপরদিকে ২০২৩ সালে এসে নর্দার্ন ইসলামী ইন্স্যুরেন্স ১০০ কোটি ৪০ লাখ টাকা গ্রস প্রিমিয়াম আয়ের বিপরীতে আন্ডাররাইটিং প্রফিট করেছে ১০ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ গ্রস প্রিমিয়াম আয়ের ১০.৮৩ শতাংশ আন্ডাররাইটিং প্রফিট বা মুনাফা করেছে। একই বছরে বীমা কোম্পানিটি নেট বীমা দাবি পরিশোধ করে ঋণাত্মক ২ কোটি ৫৫ লাখ টাকা, যা গ্রস প্রিমিয়ামের ঋণাত্মক (-) ২.৫৪ শতাংশ।
সেই হিসাবে ২০১৫ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে নর্দার্ন ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের আন্ডাররাইটিং প্রফিট বা মুনাফার হার কমেছে ৭০. ৯৪ শতাংশ। একইভাবে বীমা দাবি পরিশোধের হারও কমেছে ২৫.২৭ শতাংশ। আবার আর্থিক প্রতিবেদনের হিসাব অনুসারে ২০১৫ সাল থেকে ২০২৩ সাল- এই ৯ বছরে কোম্পানিটির আন্ডাররাইটিং প্রোফিট হয়েছে মোট ৬৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা। অথচ একই সময়ে কোম্পানিটির মোট সম্পদ বেড়েছে ১৫৩ কোটি ২৭ লাখ টাকা।
২০১৫ সালে ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের মোট সম্পদ ছিল ১১১ কোটি ৭ লাখ টাকা। যা ২০২৩ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ আন্ডাররাইটিং প্রফিট বা মুনাফার হার কমলেও গত এক দশকে কোম্পানিটির মোট সম্পদ বেড়েছে ১৩৭.১০ শতাংশ বা প্রায় দেড় গুণ। এ ছাড়াও ২০১৫ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ট্যাক্স প্রদানের পর নর্দার্ন ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের নেট প্রফিট হয়েছে মোট ৬০ কোটি ৭৮ লাখ টাকা।
এর আগে ২০১৪ সালে কোম্পানিটি ৩২ কোটি ৯১ লাখ টাকা আন্ডাররাইট করে প্রোফিট করেছিল ৯ কোটি ২৪ লাখ টাকা। নেট প্রোফিট আফটার ট্যাক্সের হিসাব না থাকায় ২০১৬ সালের ক্ষেত্রে নেট প্রফিট বিফোর ট্যাক্স এই হিসাবের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এ বিষয়ে নর্দান ইসলামী ইনস্যুরেন্স লিমিটেডের সিইও চৌধুরী গোলাম ফারুক কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে কোম্পানির এক কর্মকর্তা বলেন, এস আলম-কান্ডে কারণে কোম্পানির বিমা দাবির পরিমাণ বেড়েছে। এছাড়াপ বীমা কোম্পানির ব্যবসার ভলিউম বাড়লে লায়াবিলিটি বেড়ে যায়। এক্ষেত্রে বেশি পরিমাণে বীমা দাবি উত্থাপন হওয়ায় কোম্পানির আন্ডাররাইটিং প্রফিট কমে গেছে।
এদিকে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) এক অনিরীক্ষিত প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, দেশের ৪৬টি বিমা কোম্পানি গ্রাহকের বিমা দাবির প্রায় ২ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকা পরিশোধ করেনি। এ হিসাব গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত। নানারকম অজুহাতে গ্রাহকের দাবিকৃত পাওনা বিমার ২ হাজার ৬৩৫ টাকা আটকে রেখেছে, দেই-দিচ্ছি বলে দিচ্ছে না। ওরা ফ্যাস্টিস্টের দোসর। পাওনাদারদের এমনই ক্ষোভ ঝাড়তে দেখা গেছে।
বীমা খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দাবি পরিশোধে বিমা কোম্পানিগুলোর অনীহা, কাগজপত্র ও সার্ভে প্রতিবেদনের দোহাই এবং পুনর্বিমার নামে নানা বাহানা করেই বছরের পর বছর গ্রাহকের পাওনা টাকা দিচ্ছে না কোম্পানিগুলো। এ কারণে বিমা খাতের ওপর মানুষের আস্থা দিন দিন কমছে।এ বিষয়ে আইডিআরএ চেয়ারম্যান এম আসলাম আলম বলেন, বিমা খাতের প্রধান সমস্যা দাবি পরিশোধ না করা। এ কারণে বিমা খাত এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে।
আইডিআরএর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের ৪৬টি নন-লাইফ,অর্থাৎ সাধারণ বিমা কোম্পানির কাছে গ্রাহকের বিমা দাবি ছিল ৩ হাজার ৮৭১ কোটি ৯২ লাখ টাকা। এর মধ্যে পরিশোধ করা হয়েছে ১ হাজার ২৩৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা। ফলে অনিষ্পন্ন আছে ২ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকার বিমা দাবি। এ ক্ষেত্রে দাবি নিষ্পত্তির হার মাত্র ৩২ শতাংশ। সেই হিসাবে ৬৮ শতাংশ বিমা দাবি পরিশোধ করেনি কোম্পানিগুলো।
সম্প্রতি বিষয়টি নিয়ে বিমা কোম্পানিগুলোর এমডিদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনস্যুরেন্স ফোরামের জয়েন্ট সেক্রেটারি এস এম নুরুজ্জামান বলেন, বিমা দাবি পরিশোধ নিশ্চিত করার জন্য আইডিআরএ এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগকে আরও আন্তরিক হতে হবে। দ্রুত বিমা দাবি পরিশোধে আইনগত পদক্ষেপ নিতে হবে।
আইডিআরএ উপপরিচালক ও মুখপাত্র মো. সোলাইমান বলেন, প্রতিবেদনটি হাতে পেয়েছি। আইডিআরএ কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে। বিমা দাবির অধিকাংশ বিষয়টির সঙ্গে সাধারণ বিমা কোম্পানির সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। আইডিআরএ কর্তৃপক্ষ এসবিসির কথা বলে সমাধানের পথ বের করবে।
গ্রাহকদের করণীয়-বিমা দাবি আদায়ের জন্য গ্রাহককে কিছু পরামর্শ দিয়েছেন বিমা বিশেষজ্ঞেরা। তাঁদের পরামর্শ প্রথমত, দাবির সপক্ষে সব কাগজপত্র নির্ভুলভাবে জমা দিয়ে আবেদন করতে হবে। আবেদনের ৯০ দিনের মধ্যে দাবির অর্থ না পেলে আইডিআরএতে অভিযোগ করতে হবে। তাতেও যদি কাজ না হয়, তবে আইডিআরএর বিরোধ নিষ্পত্তি কমিটির কাছে আবেদন করতে হবে। এতেও ব্যর্থ হলে দ্রুত মামলার মাধ্যমে আদালতের শরণাপন্ন হতে হবে।

