পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে বাজেটে অর্থমন্ত্রীর একগুচ্ছ আশ্বাস
স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, শেয়ারবার্তা ২৪ ডটকম, ঢাকা: দীর্ঘ ১৯ বছর পর ক্ষমতায় এসে একটি দুর্বল ও চাপগ্রস্ত এবং নানা সংকটে জর্জরিত অর্থনীতি পেয়েছে বর্তমান বিএনপি সরকার। এ অবস্থায় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পেশ করছে দলটি। জানা যায়, বাজেটে উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও কল্যাণ রাষ্ট্র গঠনের নানা প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এটিই হবে গত ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বর্তমান বিএনপি সরকারের প্রথম এই বাজেট উপস্থাপন করবেন। মুলত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত এই মেগা বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের ইতিহাসের ৫৫তম এবং বর্তমান সরকারের চলতি মেয়াদের প্রথম বাজেট। তবে এবারের বাজেটে পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি ও সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে।
তবে পুঁজিবাজারকে আরও গভীর, স্বচ্ছ, বহুমাত্রিক ও আস্থাভিত্তিক করতে একগুচ্ছ সংস্কার উদ্যোগের প্রস্তাব করেছে সরকার। মূলধন সংগ্রহের প্রক্রিয়া সহজ করা, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বাড়ানো, বন্ড বাজার সম্প্রসারণ এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য অর্থ প্রত্যাবাসন সহজ করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে। প্রস্তাবিত পদক্ষেপ অনুযায়ী, ভালো ও সম্ভাবনাময় কোম্পানির শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে বিদ্যমান অপ্রয়োজনীয় জটিলতা, দীর্ঘসূত্রতা, অতিরিক্ত ব্যয় এবং অনুমোদনসংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতা কমানো হবে। একই সঙ্গে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) প্রক্রিয়াকে সময়নির্ধারিত ও প্রযুক্তিনির্ভর করা হবে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আইপিও আবেদন জমা, প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাই, ফি পরিশোধ, সংশোধন এবং অনুমোদনের মতো পুরো প্রক্রিয়া অনলাইনে সম্পন্ন করা হবে। এ লক্ষ্যে ইস্যুকারী কোম্পানি, ইস্যু ম্যানেজার, স্টক এক্সচেঞ্জ, সিডিবিএল এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের জন্য একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা হবে। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বাড়াতে পেনশন তহবিল, বীমা প্রতিষ্ঠান, অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (এএমসি), মিউচুয়াল ফান্ডসহ অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হবে।
পুঁজিবাজারে বিকল্প অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণে করপোরেট বন্ড বাজার শক্তিশালী করার পাশাপাশি স্থানীয় সরকার ও নগর অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য ‘মিউনিসিপ্যাল বন্ড’ চালুর ব্যবস্থা করা হবে। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য বন্ড, সুকুক এবং অবকাঠামো তহবিলের ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
বাজারের অবকাঠামো ও তদারকি ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে বিএসইসি, স্টক এক্সচেঞ্জ, সিডিবিএল, ব্যাংক, ব্রোকার এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর তথ্যব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা হবে। এছাড়া দেশীয় কোম্পানিগুলোর জন্য আঞ্চলিক স্টক এক্সচেঞ্জে রিজিওনাল ডুয়াল লিস্টিংয়ের সম্ভাবনাও যাচাই করা হবে। পুঁজিবাজারে জবাবদিহি ও পেশাগত মান উন্নয়নের লক্ষ্যে নিরীক্ষক, মূল্যায়নকারী এবং ইস্যু ম্যানেজারসহ সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের জন্য প্রফেশনাল লাইয়াবিলিটি ফ্রেমওয়ার্ক ও লাইয়াবিলিটি ইন্স্যুরেন্স চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
লেনদেন নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া আরও দ্রুত করতে বর্তমানে টি+২ (ঞ+২) ভিত্তিক সেটেলমেন্ট ব্যবস্থা ধাপে ধাপে কমিয়ে টি+০ (ঞ+০) পর্যায়ে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ ছাড়া বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে তাদের মুনাফা এবং নন-রেসিডেন্ট ইনভেস্টরস টাকা অ্যাকাউন্ট (এনআইটিএ) দিয়ে কেনা শেয়ার বা সিকিউরিটিজ বিক্রির অর্থ দেশে ফেরত নেওয়া (রিপ্যাট্রিয়েশন) ও পুনর্বিনিয়োগের প্রক্রিয়া এক কর্মদিবসের মধ্যে সম্পন্ন করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ফলে বাজেট বক্তৃতায় বলা হয়েছে, পূর্ববর্তী সরকারের সময় লুটপাট, অব্যবস্থাপনা, স্ক্যাম ও ভুল নীতির কারণে পুঁজিবাজার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট হয়েছে। তবে বিএনপি সরকারের আশা এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে পুঁজিবাজারে নতুন কোম্পানির তালিকাভুক্তি বাড়বে, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ উৎসাহিত হবে এবং অর্থনীতির জন্য একটি শক্তিশালী ও টেকসই মূলধন বাজার গড়ে উঠবে।

