স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, শেয়ারবার্তা ২৪ ডটকম, ঢাকা: দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিনিয়োগ স্থবিরতার মধ্য দিয়ে দেশের পুঁজিবাজার কয়েক বছর ধরেই এক ধরনের ‘স্থবির স্রোতে’ আটকে আছে। মুলত ছাত্র-জনতার বিপ্লবে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের অর্থনীতির অন্যান্য খাতে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও ব্যতিক্রম শুধু পুঁজিবাজার। গত ১৭ মাসে পুঁজিবাজারের বৃদ্ধি তো দূরের কথা, উল্টো প্রতিদিনই কমছে মূল্যসূচক ও বাজার মূলধন।  ফলে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতা ফিরে আসার ইঙ্গিত মিললেও পুঁজিবাজার চলছে সেই পুরানো উল্টো পথে।

ফলে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে এ পর্যন্ত ১৮ মাস পুঁজিবাজারের কোন উন্নতি দেখা যাচ্ছে না। মুলত নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদসহ শীর্ষ ব্যক্তিদের খামখেয়ালীপনা, বাজার সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানের অভাব, নানা হঠকারী সিদ্বান্ত, ব্যক্তিগত অভিপ্রয়াস, পুঁজিবাজারের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ব্যক্তিবর্গকে অবমূল্যায়ন, কমিশনের অভ্যন্তরীণ কোন্দলসহ নানাবিধ কারণে দেশের পুঁজিবাজার বর্তমানে ধ্বংসের দারপ্রান্তে।

এছাড়া পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদি আস্থা ফিরিয়ে আনতে নীতি, আইন ও বিধিমালায় ঘন ঘন পরিবর্তন বা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা উচিত নয়। সরকারের উচিত বিনিয়োগ সম্পর্কিত নীতিমালাগুলো স্থিতিশীল রাখা ও কোনো বিষয়ে পরিবর্তন আনা হবে না তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা। নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় থাকলেই বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তাদের আস্থা পুনরুদ্ধার সম্ভব।

তবে দেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিন ধরে চলা আস্থাহীনতা আজ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ফলে প্রতিদিন কমছে বাজার মূলধন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার বিনিয়োগকারীর হিসাব। অথচ নীতিনির্ধারকদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে একধরনের আত্মতুষ্টি যেন সবকিছুই স্বাভাবিকভাবে চলছে। প্রশ্ন উঠেছে, আর কত মানুষ নিঃস্ব হলে তারা বুঝবেন বর্তমান কমিশনের নীতিতে গভীর ত্রুটি আছে?

কারণ বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) চেয়ারম্যান হিসেবে খন্দকার রাশেদ মাকসুদ যোগ দেওয়ার পর থেকেই পুঁজিবাজারে টানা দরপতন চলছে। ফলে টানা দরপতনে পুঁজিবাজারে ৯৫ শতাংশ বিনিয়োগকারী পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন। যার ফলে যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ খন্দকার রাশেদ মাকসুদ বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পাওয়ার পর ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) মূল্যসূচক ৫ হাজারের নিচে নেমে গেছে।

তারপরেও এই অযোগ্য রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বাধীন কমিশনকে অপসারন করছে না সরকার। এছাড়া নিজেও পদত্যাগ না করে নির্লজ্জভাবে চেয়ার আঁকড়ে ধরে রেখেছে রাশেদ মাকসুদ কমিশন। যাতে প্রতিনিয়ত ধ্বংস হতে হতে অতল গহ্বরের দিকে ধাবিত হচ্ছে পুঁজিবাজার।

তবে রাশেদ মাকসুদ কমিশনের উপর বিনিয়োগকারীদের আস্থা নেই বললেই চলে। ফলে বর্তমান কমিশনের পদত্যাগের মাধ্যমে যে পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াবে, তা কয়েক দফায় প্রমাণ পাওয়া গেছে। যার অপসারন হচ্ছে বলে পুঁজিবাজারে কয়েকবার গুজব উঠে। যার উপর ভিত্তি করে প্রতিবারই বিনিয়োগকারীরা আশাবাদী হয়ে উঠেছিল এবং পুঁজিবাজার ইতিবাচক হয়েছিল। কিন্তু তার অপসারন বাস্তবে রুপ না পাওয়ায়, পুঁজিবাজার আবারও পতনের ধারায় ফিরে গেছে।

মুলত বর্তমান পুঁজিবাজার ৯৬ ও ২০১০ সালের দরপতনকে হার মানিয়েছে। টানা দরপতনে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছেন বিনিয়োগকারীরা। অন্তবর্তী সরকারের গত ১৭ মাসে যে ভাবে বিনিয়োগকারীরা পুঁজি হারিয়েছে তা ২০১০ সালের ধসকে হার মানিয়েছে। ফলে দিন দিন পুঁজি নিয়ে শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। বর্তমান পুঁজিবাজারের যে অবস্থা চলছে তাতে ৯৬ ও ২০১০ সালের চেয়ে বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত বলে অভিযোগ করছেন একাধিক বিনিয়োগকারীরা।

ফলে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বারবার আস্থার সংকট, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এছাড়া দেশের অর্থনীতিতে তেমন কোন অবদান রাখতে পারছে না পুঁজিবাজার। বিনিয়োগকারীরা মনে করে বিএসইসির অদক্ষ্য ও অযোগ্য কমিশনের কারণে বেহাল দশা দেশের পুঁজিবাজারের।

ফলে গত বছরের ১৮ আগস্ট পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচক কমেছে ১০৭৮ পয়েন্ট।

মুলত রাশেদ মাকসুদ কমিশন যখন দায়িত্ব নেয় তখন ডিএসই সূচক ছিলো ৫৭৭৮.৬৩ পয়েন্ট। তবে গত সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে ডিএসইর সূচক এসে দাঁড়িয়েছে ৪৯৫৮.৯৮ পয়েন্ট। তবে নভেম্বর মাসের ১৩ তারিখ ১২২ পয়েন্ট সূচকের বড় দরপতনে ডিএসইর সূচক এসে দাঁড়িয়ে ছিলো ৪৭০২ পয়েন্ট।

অভিজ্ঞ বিনিয়োগকারী কাজী হোসাইন আলীর মতে, নির্বাচনের পর পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ নির্বাচিত সরকারের সময় বিনিয়োগকারীরা আস্থা নিয়ে বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগমুখী হবে। তেমনি বিএসইসির চেয়ারম্যান পরিবর্তন হলে নতুন চেয়ারম্যানের প্রতি আস্থা বাড়বে বিনিয়োগকারীদের। ফলে বিনিয়োগ স্বভাবতই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। ফলে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা এমন একটি সরকার চান, যাদের মেয়াদ আছে, নীতিগত ধারাবাহিকতা আছে এবং যাদের সময় বিনিয়োগ নিরাপদ।

ফলে আস্থা সংকটে গত সপ্তাহে ডিএসইর সূচকের পতনে টাকার পরিমাণে লেনদেন কমেছে। সপ্তাহটিতে অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিট দরও কমেছে। তবে টাকার পরিমানে লেনদেন কমলেও সপ্তাহে ১ হাজার ২৬০ কোটি টাকার বাজার মূলধন বেড়েছে। ডিএসই সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

জানা গেছে, বিদায়ী সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবস লেনদেন শুরুর আগে ডিএসইতে বাজার মূলধন ছিল ৬ লাখ ৮৩ হাজার ১৮০ কোটি টাকা। যা সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস লেনদেন শেষে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৮৪ হাজার ৪৪০ কোটি টাকায়। অর্থাৎ সপ্তাহের ব্যবধানে বাজার মূলধন ১ হাজার ২৬০ কোটি টাকা বা দশমিক ১৮ শতাংশ বেড়েছে। বিদায়ী সপ্তাহে ডিএসইতে ১ হাজার ৯০০ কোটি ৬০ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। আগের সপ্তাহে হয়েছিল ২ হাজার ৩৭২ কোটি ৭২ লাখ টাকার। অর্থাৎ সপ্তাহের ব্যবধানে ডিএসইতে লেনদেন ৪৭২ কোটি ১২ লাখ টাকা কমেছে।

সপ্তাহের ব্যবধানে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৩৯ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৯৫৮ পয়েন্টে। অপর সূচকগুলোর মধ্যে ডিএসই শরিয়াহ সূচক ১৪ পয়েন্ট এবং ডিএসই-৩০ সূচক ২ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ১ হাজার ৯১২ পয়েন্টে এবং ১ হাজার ৯৯৫ পয়েন্টে। বিদায়ী সপ্তাহে ডিএসইতে মোট ৩৮৬ টি প্রতিষ্ঠান শেয়ার ও ইউনিট লেনদেনে অংশ নিয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দর বেড়েছে ৯৩ টির, কমেছে ২৬৮ টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ২৫ টির শতাংশের শেয়ার ও ইউনিট দর।

অপর পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) বিদায়ী সপ্তাহে সিএসইর সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ০.৫১ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৯২১ পয়েন্টে। সিএসইর অপর সূচকগুলোর মধ্যে সিএসই-৩০ সূচক ০.০৮ শতাংশ কমে ১২ হাজার ৪৭৭ পয়েন্টে, সিএসসিএক্স সূচক ০.৩৫ শতাংশ কমে ৮ হাজার ৬২২ পয়েন্টে, সিএসআই সূচক ০.৯৫ শতাংশ কমে ৮৫২ পয়েন্টে এবং এসইএসএমইএক্স (এসএমই ইনডেক্স) ০.২৫ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৮০০ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।

বিদায়ী সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৯১ হাজার ৩৪৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা। আর বিদায়ী সপ্তাহের আগের সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে সিএসইর বাজার মূলধন ছিল ৬ লাখ ৯১ হাজার ৩৪৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা। টাকায়। অর্থাৎ সপ্তাহের ব্যবধানে বাজার মূলধন কমেছে ৬৮৩ কোটি ২৪ লাখ টাকা। বিদায়ী সপ্তাহে

চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেন হয়েছে ৩২ কোটি ৮১ লাখ টাকা। আর বিদায়ী সপ্তাহের আগের সপ্তাহে লেনদেন হয়েছিল ৭২ কোটি ৮০ লাখ টাকা। অর্থাৎ সপ্তাহের ব্যবধানে সিএসইতে লেনদেন কমেছে ৩৯ কোটি ৯৯ লাখ টাকা।বিদায়ী সপ্তাহে সিএসইতে মোট ২৭৪টি কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিট লেনদেনে অংশ নিয়েছে। কোম্পানিগুলোর মধ্যে দর বেড়েছে ৮৫টির, দর কমেছে ১৬৯টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ২০টির শেয়ার ও ইউনিট দর।