শেয়ারবার্তা ২৪ ডটকম, ঢাকা: দেশ ছেড়ে পলাতক পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক খাতের কোম্পানি প্রিমিয়ার ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য এইচ বি এম ইকবাল এখনও অদৃশ্যভাবে ব্যাংকটির কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করছেন। নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও তিনি বিভিন্ন উপায়ে প্রিমিয়ার ব্যাংক থেকে ২৮৭ কোটি টাকা উত্তোলনের চেষ্টা করেন। তবে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) সেই উদ্যোগ ঠেকিয়ে দেয়।

ব্যাংক সূত্র জানায়, বনানী শাখায় ইকবাল ও তার পরিবারের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান প্রিমিয়ার প্রপার্টি ডেভেলপমেন্ট, প্রিমিয়ার হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট, ইকবাল সেন্টার, প্রিমিয়ার হোটেল ম্যানেজমেন্ট ও বুখারা রেস্টুরেন্টের নামে বিভিন্ন হিসাবে অর্থ জমা রয়েছে।

এসব হিসাব থেকে অর্থ তুলতে প্রায় সাড়ে ৩০০টি চেক ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক ও মার্কেন্টাইল ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়। প্রতিটি চেকের মাধ্যমে ৮০ লাখ টাকা করে তোলার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু কম্পিউটার সিস্টেমে ফ্ল্যাগ ওঠার পরই বিএফআইইউ তা আটকে দেয়।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বনানী শাখা ইকবালকে বিধিবহির্ভূতভাবে ভল্ট সুবিধা দেয়। সেখানে তিনি প্রায় ৬০ লাখ টাকা নগদ ও বিভিন্ন নথি রেখেছিলেন। এর আগেই, গত বছরের নভেম্বরে বিএফআইইউ ইকবাল, তার স্ত্রী-সন্তান ও তাদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের সব হিসাব জব্দ করে। তারপরও গত এপ্রিলে তিনি নিজের হিসাব থেকে ১ কোটি ১১ লাখ টাকা ও ৩০ হাজার মার্কিন ডলার তুলতে সক্ষম হন। এ কারণে অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইনের আওতায় প্রিমিয়ার ব্যাংককে সমপরিমাণ টাকা ও ডলার জরিমানা করে বিএফআইইউ।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গত জানুয়ারিতে ইকবাল চেয়ারম্যানের পদ ছাড়েন। ১৯৯৯ সালে ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পর থেকে টানা তিনি চেয়ারম্যান ছিলেন। তার পদত্যাগের পর ছেলে ইমরান ইকবালকে চেয়ারম্যান করা হয়। তবে গত আগস্টে বাংলাদেশ ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে নতুন বোর্ড গঠন করে।

এদিকে আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি ডা. এইচ বি এম ইকবাল গত ১৪ বছরে নানা অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে দেশে-বিদেশে শত শত কোটি টাকার সম্পদ অর্জন করেছেন। তাঁর ও পরিবারের সদস্যদের নামে রয়েছে ১৮টি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্য দেশে পাচার করেছেন তিনি। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) গোয়েন্দা ইউনিটের গোপন প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়।

ইকবাল ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে শত শত কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে এই ইউনিটের গোপন অনুসন্ধানে। এরই মধ্যে গোয়েন্দা ইউনিট কমিশনে তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। সম্পদের সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অভিযোগটির প্রকাশ্যে অনুসন্ধানও শুরু হয়েছে। এ পর্যায়ের অনুসন্ধান শেষে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এইচ বি এম ইকবাল প্রিমিয়ার গ্রুপের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছেন। এটি একটি বহুমাত্রিক করপোরেট সংস্থা, যা ব্যাংকিং, বীমা, লিজিং, ম্যানুফ্যাকচারিং, সিমেন্ট, পেট্রোলিয়াম ও লুব্রিকেন্টস, প্রশিক্ষণ, ডিস্ট্রিবিউশন হাউস, ভ্রমণ ও পর্যটন, বিমান চালনা, মেডিকেল সেন্টার, স্টিল ও সুপারমার্কেট, এইচআরডি,

সেবা খাত, হোটেল-রেস্তোরাঁ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তিনি পাঁচতারকা রেনেসাঁ বাই ম্যারিয়ট ইন্টারন্যাশনাল হোটেল ও হিলটন ইন্টারন্যাশনাল ঢাকার প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রিমিয়ার ব্যাংক লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান। ডা. ইকবাল পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডেরও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। বাংলাদেশে বেসরকারি খাতের প্রথম বিমান পরিবহন সংস্থা অ্যারো বেঙ্গল এয়ারলাইন্সের প্রতিষ্ঠাতা তিনি।

দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়, ইকবাল প্রিমিয়ার ব্যাংকের গুলশান-১ শাখা থেকে ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। ব্যাংকে নিজ নামে, প্রয়াত স্ত্রী মমতাজ বেগম, ছেলে মঈন ইকবালের নামে ফিক্সড ডিপোজিট করে নির্দিষ্ট মুনাফার চেয়ে বেশি টাকা মুনাফা উত্তোলন করেছেন। প্রভাব খাটিয়ে ব্যাংক থেকে গ্রাহকের জমানো টাকা তুলে ঢাকার গুলশানে অত্যাধুনিক রেনেসাঁ হোটেলের নির্মাণকাজ সম্পন্ন করেছেন। ব্যাংক কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে ভুয়া ঋণ দেখিয়ে উত্তোলন করেছেন বিপুল অঙ্কের টাকা।

গুলশান-২-এ বানিয়েছেন ৩৪ তলাবিশিষ্ট পাঁচতারকা হিলটন হোটেল ও রিসোর্ট। উচ্চতার দিক থেকে যা দেশের সর্বোচ্চ হোটেল। ইকবাল তাঁর প্রয়াত স্ত্রী ডা. মমতাজ বেগমের নামে ঢাকার তেজগাঁওয়ে নির্মাণ করেছেন রয়েল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকা। বনানীতে তাঁর মালিকানাধীন ২৩ তলাবিশিষ্ট ইকবাল সেন্টারে প্রভাব খাটিয়ে ভাড়ায় প্রিমিয়ার ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় স্থাপন করেন। অথচ এই ভবনটি নির্মাণের ক্ষেত্রে রাজউক ছয়তলার অনুমোদন দিয়েছিল।

এতে আরও বলা হয়, ইকবাল সেন্টারে প্রিমিয়ার ব্যাংকের অফিস ভাড়া দিয়ে অগ্রিম ও অতিরিক্ত হারে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। পদ্মা সিমেন্টের মালিক প্রিমিয়ার ব্যাংকের একজন গ্রাহক হওয়ার পরও সিমেন্ট কারখানাটির দুঃসময়ে ব্যাংকটির সহায়তা পাননি। ইকবালের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে মূলধনের অভাবে বন্ধ হয়ে যায় সেটি। নিলাম ডেকে প্রতিষ্ঠানটি ২০ কোটি টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হন মালিক। পরে ইকবাল প্রতারণা করে ব্যাংকের টাকায় ক্রেতার কাছ থেকে পদ্মা সিমেন্ট কারখানা কিনে মালিক হয়ে যান।

এ ছাড়া ইকবাল প্রভাব খাটিয়ে প্রয়োজন ছাড়াই প্রিমিয়ার ব্যাংকের নতুন নতুন শাখা খোলেন। মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ওই সব শাখায় উচ্চ পদে কর্মকর্তা নিয়োগ দেন। শাখা খোলার নামে অতিরিক্ত সাজসজ্জার খরচ দেখিয়ে হাতিয়ে নেন কয়েক কোটি টাকা। এসব কারণে ব্যাংকটি এখন নাজুক অবস্থায়। তাঁর বিরুদ্ধে বেশ কিছু ভুয়া প্রকল্পের নামে ঋণ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। বাস্তবে ওই সব প্রকল্পের কোনো অস্তিত্ব নেই।

জানা গেছে, ডা. ইকবালের প্রথম স্ত্রী মমতাজ বেগম ২০২২ সালে সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে মারা যান। তিনি প্রিমিয়ার গ্রুপ ও হোটেল হিলটন, রেনেসাঁ হোটেলের ভাইস চেয়ারম্যান, প্রিমিয়ার ফাউন্ডেশনের গভর্নিং বডির সদস্য এবং রয়েল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকার প্রতিষ্ঠাতাদের একজন ও বোর্ড অব ট্রাস্টির চেয়ারপারসন ছিলেন।

এ ছাড়া তিনি গালফ মেডিকেল সেন্টার এবং বুখারা রেস্টুরেন্ট লিমিটেডের ম্যানেজিং ডিরেক্টর, নওরীন ইলেকট্রনিকস লিমিটেড, বেঙ্গল টাইগার সিমেন্ট ইন্ডাস্ট্রিজ, এয়ার কনসার্ন ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের পরিচালক এবং বিকন ট্রাভেলস ইন্টারন্যাশনালের চেয়ারম্যান ছিলেন। মমতাজের মৃত্যুর পর ইকবাল এবং তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী ও সন্তানরা ওই সব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।