স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, শেয়ারবার্তা ২৪ ডটকম, ঢাকা: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে বেশি লভ্যাংশ দিতে উৎসাহিত করতে নতুন করনীতি আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে কর-পরবর্তী নিট মুনাফার কমপক্ষে ৩০ শতাংশ লভ্যাংশ বিতরণের একটি নীতিগত বাধ্যবাধকতা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। এর কম লভ্যাংশ দিলে ঘাটতির অংশের ওপর ১০ শতাংশ হারে অতিরিক্ত কর আরোপের প্রস্তাব করা হতে পারে। তবে ব্যাংক, বিমা, লিজিং ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান এ বিধানের বাইরে থাকবে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, কোনো কোম্পানির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা যদি ১০০ কোটি টাকা হয়, তাহলে অন্তত ৩০ কোটি টাকা লভ্যাংশ দিতে হবে। যদি তারা ২০ কোটি টাকা লভ্যাংশ দেয়, তাহলে অবশিষ্ট ১০ কোটি টাকার ওপর ১০ শতাংশ অতিরিক্ত কর দিতে হবে। নির্ধারিত সময়ে এ কর পরিশোধ না করলে শুনানির সুযোগ দিয়ে কর নির্ধারণের ক্ষমতা থাকবে কর কর্তৃপক্ষের। বর্তমানে মুনাফা সংরক্ষণের ওপর কর আরোপের যে বিধান রয়েছে, নতুন ব্যবস্থায় তা সরাসরি লভ্যাংশ বিতরণের হারের সঙ্গে যুক্ত হবে।

এছাড়াও নগদ লভ্যাংশের তুলনায় বেশি স্টক লভ্যাংশ ঘোষণা করা হলে বা শুধু স্টক লভ্যাংশ দেওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে ১০ শতাংশ কর দিতে হবে। যদিও এ ক্ষেত্রেও ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। অন্য তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য বিদ্যমান করহার বহাল থাকবে।

আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে আয়কর আইনের সংশোধনী প্রস্তাবে এ বিধান অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করতে পারেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তবে ব্যাংক, বিমা, লিজিং ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান এ নতুন কর ব্যবস্থার আওতার বাইরে থাকবে। আগামী বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মুনাফার কমপক্ষে ৩০ শতাংশ লভ্যাংশ দেওয়ার বিধানটি কার্যকর হলে তা বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এ নিয়মের ফলে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর লভ্যাংশ নীতিতে পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে যেসব কোম্পানি দীর্ঘদিন ধরে মুনাফা জমা রেখে কম নগদ লভ্যাংশ দিচ্ছে, তাদের ওপর শেয়ারহোল্ডারবান্ধব নীতি গ্রহণের চাপ বাড়বে। একই সঙ্গে নগদ লভ্যাংশের পরিবর্তে অতিরিক্ত স্টক লভ্যাংশ দেওয়ার প্রবণতাও কমতে পারে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, আগামী অর্থবছরে কোনো তালিকাভুক্ত কোম্পানি যদি কর-পরবর্তী নিট আয়ের ৩০ শতাংশের কম লভ্যাংশ বিতরণ করে, তাহলে ৩০ শতাংশ লভ্যাংশের নির্ধারিত সীমা এবং প্রকৃত বিতরণ করা লভ্যাংশের মধ্যে যে পার্থক্য থাকবে, তার ওপর ১০ শতাংশ হারে অতিরিক্ত কর আরোপ করা হবে। নির্ধারিত সময়ে এ কর পরিশোধ না করলে উপকর কমিশনার নোটিশ দিয়ে শুনানির সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমে কর নির্ধারণ করতে পারবেন।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কোনো কোম্পানির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা ১০০ কোটি টাকা হলে অন্তত ৩০ কোটি টাকা লভ্যাংশ বিতরণ করতে হবে। যদি কোম্পানিটি ২০ কোটি টাকা লভ্যাংশ দেয়, তাহলে বাকি ১০ কোটি টাকার ওপর ১০ শতাংশ হারে অতিরিক্ত কর দিতে হবে।

বর্তমানে প্রচলিত বিধান অনুযায়ী, কোনো তালিকাভুক্ত কোম্পানি পূর্ববর্তী বছরের কর-পরিশোধিত নিট আয়ের ৭০ শতাংশের বেশি সংরক্ষিত আয়, তহবিল, সঞ্চিতি বা উদ্বৃত্তে স্থানান্তর করলে স্থানান্তরিত অর্থের ওপর ১০ শতাংশ হারে করারোপ করা হতো। অর্থাৎ কর আরোপের ভিত্তি ছিল মুনাফা সংরক্ষণের পরিমাণ। নতুন ব্যবস্থায় সেই ভিত্তি পরিবর্তন করে সরাসরি লভ্যাংশ বিতরণের হারের সঙ্গে করকে যুক্ত করা হয়েছে।

এদিকে, স্টক লভ্যাংশের ক্ষেত্রেও আগামী অর্থবছরে কিছুটা পরিবর্তন আনা হচ্ছে। বর্তমানে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত সব কোম্পানির ক্ষেত্রে নগদ লভ্যাংশের তুলনায় বেশি স্টক লভ্যাংশ ঘোষণা বা শুধু স্টক লভ্যাংশ বিতরণ করলে স্টক লভ্যাংশের ওপর ১০ শতাংশ কর আরোপ করা হয়। আগামী অর্থবছরে ব্যাংক, বিমা, লিজিং ও ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোকে এ করের আওতার বাইরে রাখা হবে। তবে অন্য তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর জন্য ১০ শতাংশ কর বহাল থাকবে।

ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো কোম্পানিকে নির্দিষ্ট হারে লভ্যাংশ দিতে বাধ্য করা আদর্শ নাও হতে পারে। সাধারণত একটি কোম্পানি কত লভ্যাংশ দেবে, সেটি কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ ও শেয়ারহোল্ডারদের সিদ্ধান্তের বিষয়। বিশেষ করে দ্রুত সম্প্রসারণশীল বা উচ্চ প্রবৃদ্ধির কোম্পানিগুলো প্রায়ই মুনাফার বড় অংশ পুনর্বিনিয়োগ করে, ফলে তারা তুলনামূলক কম লভ্যাংশ দেয়।

তবে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের বাস্তবতা ভিন্ন উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের অধিকাংশ বিনিয়োগকারী এখনো লভ্যাংশকে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ সূচক হিসেবে বিবেচনা করেন। তাই কোনো কোম্পানি ধারাবাহিকভাবে কম লভ্যাংশ দিলে বিনিয়োগকারীরা প্রত্যাশিত রিটার্ন থেকে বঞ্চিত হন, যা শেয়ারের বাজারদরেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।