যমুনা অয়েলের ১০ বছরের পুরোনো আয়ে রহস্যজনক মুনাফা
শেয়ারবার্তা ২৪ ডটকম, ঢাকা: ব্যাংক আমানত থেকে সুদ আয় কমে যাওয়ায় বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে পুঁজিবাজারে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড। চলতি ২০২৫-২৬ হিসাব বছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) কোম্পানিটির নিট মুনাফা কমেছে প্রায় ১৮ শতাংশ। মূলত আমানতের সুদ আয় ৪৫ শতাংশের বেশি কমে যাওয়ায় মুনাফায় এই ধস নেমেছে।
তবে পুঁজিবাজারে আর্থিক প্রতিবেদনে কারসাজির মাধ্যমে মুনাফা বাড়িয়ে বা কমিয়ে দেখানো নতুন কিছু নয়। এবার সেই তালিকায় নাম লিখিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড। দীর্ঘদিন ধরে অনাদায়ী থাকা বিপুল অঙ্কের বকেয়া পাওনার বিপরীতে কোনো প্রভিশন না রেখেই তা নিট মুনাফার অংশ হিসেবে দেখিয়েছে কোম্পানিটি। ৩০ জুন সমাপ্ত হিসাববছরের আর্থিক প্রতিবেদনের ওপর নিরীক্ষকের মতামতে এমন গুরুতর তথ্য উঠে এসেছে।
নিরীক্ষকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যমুনা অয়েল বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) থেকে পাবে ১৩ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। এ ছাড়া বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কাছ থেকে যথাক্রমে ৫ কোটি টাকা ও ৫৭ লাখ ৭০ হাজার টাকা পাওনা রয়েছে। এই তিন প্রতিষ্ঠানের কাছে যমুনা অয়েলের মোট প্রাপ্য প্রায় ১৯ কোটি টাকা, যা দীর্ঘদিন ধরে অনাদায়ী অবস্থায় রয়েছে।
কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, এসব পাওনার অধিকাংশই প্রায় ১০ বছর ধরে আদায় করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও আলোচ্য সময় পর্যন্ত কোনো সন্তোষজনক অগ্রগতি হয়নি। নিরীক্ষকের মতে, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মান (আইএফআরএস-৯)-এর অনুচ্ছেদ ৫.৫.১৫ অনুযায়ী এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি অনাদায়ী পাওনাকে ‘আজীবন প্রত্যাশিত ঋণ ক্ষতি’ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রভিশন রাখার বাধ্যবাধকতা থাকলেও যমুনা অয়েল তা করেনি। বরং কোনো প্রভিশন ছাড়াই এই বকেয়া অর্থ নিট মুনাফার অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছে, যা কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক অবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে যমুনা অয়েল কোম্পানির সেক্রেটারি মাসুদুল ইসলাম বলেন, পিডিবিসহ যেসব প্রতিষ্ঠানের কাছে আমাদের পাওনা রয়েছে, সবগুলোই সরকারি প্রতিষ্ঠান। সে কারণে এসব বকেয়া টাকার বিপরীতে কোনো প্রভিশন রাখা হয়নি। যেহেতু সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছেই পাওনা, তাই এগুলো আদায়যোগ্য হিসেবেই বিবেচনা করা হয়েছে।
এমন বিতর্কিত আর্থিক প্রতিবেদনের মধ্যেই যমুনা অয়েল ধারাবাহিকভাবে উচ্চ লভ্যাংশ ঘোষণা করে আসছে। সর্বশেষ সমাপ্ত ২০২৪-২৫ হিসাববছরে বিনিয়োগকারীদের জন্য ১৮০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে কোম্পানিটি। আর ইপিএস দেখিয়েছে ৫৮ টাকা ৭০ পয়সা। তার আগের হিসাববছরে ১৫০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে কোম্পানি; ইপিএস ছিল ৪০ টাকা।
২০০৭ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত যমুনা অয়েলের অনুমোদিত মূলধন ৩০০ কোটি ও পরিশোধিত মূলধন ১১০ কোটি ৪২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। রিজার্ভে রয়েছে ২ হাজার ৪৫৬ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। মোট শেয়ার সংখ্যা ১১ কোটি ৪ লাখ ২৪ হাজার ৬০০। এর ৬০ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ রয়েছে সরকারের কাছে। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ৩০ দশমিক শূন্য ১, বিদেশি বিনিয়োগকারী দশমিক ৩১ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে বাকি ৯ দশমিক ৬০ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।
যমুনা অয়েলের আর্থিক প্রতিবেদনে মুনাফা বাড়িয়ে দেখানোর বিষয় তুলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে জানতে চাইলে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) মুখপাত্র ও পরিচালক মো. আবুল কালাম বলেন, যমুনা অয়েলের আর্থিক প্রতিবেদনে নিরীক্ষকের যে মতামত এসেছে, তার ভিত্তিতে আমরা কোম্পানি ও নিরীক্ষকের কাছে ব্যাখ্যা তলব করব। তাদের ব্যাখ্যা পর্যালোচনা করে কমিশন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।

