পুঁজিবাজারে দরপতন পরিকল্পিত, অভিযোগের তীর প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ও কারসাজি চক্রের বিরুদ্ধে
স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, শেয়ারবার্তা ২৪ ডটকম, ঢাকা: বছর তিনেক ধরেই দেশের পুঁজিবাজারের অবস্থা হতাশাজনক। এর ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে চলতি বছরেও। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর পুঁজিবাজারে কিছুটা চাঙ্গা ভাব দেখা গিয়েছিল, যদিও সেটি বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। তেমনি গত জুলাই ও আগস্ট মাসে কিছুটা সূচকের উত্থান দেখা মিললেও তা স্থায়ী হয়নি। মুলত ৩১ কার্যদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সার্বিক সূচক ডিএসইএক্স ৫৮৭ পয়েন্ট হারিয়েছে।
লেনদেনের পরিমাণ নেমে এসেছে ৪০০ কোটি টাকার ঘরে। সার্বিকভাবে বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতার কারণে যত দিন যাচ্ছে পুঁজিবাজারের দরপতন আরো তীব্র হচ্ছে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে পুঁজিবাজারে টানা দরপতন হলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিরব আচরনে বিনিয়োগকারীদের মাঝে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
মুলত আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ডিএসইএক্স সূচকের অবস্থান ছিল ৫ হাজার ৪২৬ পয়েন্টে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর গত বছরের ১১ আগস্ট সূচকটি বেড়ে ৬ হাজার ১৬ পয়েন্টে দাঁড়ায়। তবে এর পর থেকেই আবারো ছন্দপতন ঘটে পুঁজিবাজারে। কখনো কখনো সূচক বাড়লেও সার্বিকভাবে এ সময়ে নিম্নমুখী ছিল পুঁজিবাজার। সর্বশেষ সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে সূচক দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৪৪ পয়েন্টে। মুলত অন্তর্বর্তী সরকারের ১৩ মাসে সূচকটি ৯৭২ পয়েন্ট হারিয়েছে।
এদিকে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ কমিশনের ওপর আস্থা পাচ্ছে না বিনিয়োগকারীরা। গত বছরের ১৮ আগস্ট চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচক কমেছে ৭৩৪ পয়েন্ট। মুলত রাশেদ মাকসুদ কমিশন যখন দায়িত্ব নেয় তখন ডিএসই সূচক ছিলো ৫৭৭৮.৬৩ পয়েন্ট। সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে ডিএসইর সূচক এসে দাঁড়িয়েছে ৫০৪৪.৩৩ পয়েন্ট।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, বিগত সময়ে অনিয়ম ও কারসাজির মাধ্যমে দেশের পুঁজিবাজারের ভিত দুর্বল করে দেয়া হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর পুঁজিবাজারের অবস্থার পরিবর্তন হবে বলে মনে করেছিলেন বিনিয়োগকারীরা। কিন্তু এ সময়ে পুঁজিবাজারে দৃশ্যমান কোনো কাঠামোগত সংস্কার হয়নি। তার ওপর পুঁজিবাজারে বারবার আস্থার সংকট, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এছাড়া দেশের অর্থনীতিতে তেমন কোন অবদান রাখতে পারছে না পুঁজিবাজার। তেমনি বিএসইসির অদক্ষ্য ও অযোগ্য কমিশনের কারণে বেহাল দশা দেশের পুঁজিবাজারের। সার্বিকভাবে বর্তমানে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগে ভাটা চলছে। অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি হলেও চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।
তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আয় ও মুনাফা কমছে। নতুন করে কোনো কোম্পানির তালিকাভুক্তি হচ্ছে না। পুঁজিবাজারে বিদেশী বিনিয়োগের পরিমাণও কমছে। সব মিলিয়ে বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজার নিয়ে আশাবাদী হতে পারছেন না। ফলে পুঁজিবাজারের সংস্কারে সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টার পক্ষ থেকে নির্দেশনা আসার পরও বাজার পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত সপ্তাহে পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে তিন কার্যদিবস সূচকের বড় দরপতন হয়। আর বাকি দুই কার্যদিবস সূচক তেমন বাড়েনি। এর মধ্যে সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচকের বড় দরপতন হয়েছে। তাছাড়া পুঁজিবাজারে পরিকল্পিত ভাবে দরপতনের নেপথ্যে রয়েছেন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীসহ একটি চক্র। এরা সেল প্রেসার দিয়ে বাজারকে অস্থিতিশীল করছে। এছাড়া মার্জিন লোন ইস্যুতে গুজবে ছড়িয়ে ফায়দা লুটছে ঐ চক্রটি।
তেমনি শীর্ষ কয়েকটি ব্রোকারেজ হাউজের বিরুদ্ধে সেল প্রেসারের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া অনেক দিন ধরেই পুঁজিবাজারে লেনদেনের শুরুতে সূচকের উত্থান দেখা গেলেও লেনদেন শেষে তা বড় পতনে রূপ নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে লেনদেনের শুরু থেকেই ডিএসইএক্স সূচকের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দিলেও তা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। লেনদেন শুরুর এক ঘণ্টা পর থেকেই তা পতনমুখীতে রূপ নেয়। লেনদেন শেষ হওয়া পর্যন্ত সূচকের বড় পতনমুখী প্রবণতা বিরাজ করে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছিুক শীর্ষ এক ব্রোকারেজ হাউজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, বর্তমানে পুঁজিবাজারে যে পরিমাণ শেয়ার বিক্রির কার্যাদেশ আসছে, সে তুলনায় ক্রয়াদেশের পরিমাণ কম। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সূচক ও লেনদেনে। স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার কারণে বিদেশী বিনিয়োগকারীরাও এগিয়ে আসছে না। পুঁজিবাজারের মূল সমস্যা কোথায় সেটি আমরা এখনো চিহ্নিত করতে পারিনি। ফলে সমস্যার সমাধানও হচ্ছে না এবং পুঁজিবাজারও ঘুরে দাঁড়াচ্ছে না। সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তি ও নীতি নির্ধারক যারা রয়েছেন তাদেরকে বাজারের মূল সমস্যাগুলো খুঁজে বের করে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।
অভিজ্ঞ বিনিয়োগকারী কাজী হোসাইন আলী বলেন, টানা দরপতনের কারণে পুঁজিবাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একধরনের হতাশা তৈরি হয়েছে। এ কারণে প্রতিদিনই বাজারে নিস্কিয় বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বাড়ছে। লোকসান কমাতে শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছেন অনেকে। তাতে একদিকে কমেছে শেয়ারের দাম অন্যদিকে লেনদেনও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে গেছে।
নাম না প্রকাশ করার শর্তে শীর্ষস্থানীয় একটি ব্রোকারেজ হাউসের প্রধান নির্বাহী বলেন, বাজারে ছোট, মাঝারি ও বড় সব শ্রেণির বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একধরনের হতাশা ভর করেছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে কেউ বিনিয়োগে এগিয়ে আসছেন না। উল্টো অনেকে লোকসান মেনে নিয়ে শেয়ার বিক্রি করে নিস্কিয় হয়ে পড়ছেন। সরকার এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার দিক থেকে বাজারের পতন থামাতে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না থাকায় বিনিয়োগকারীদের হতাশা আরও বাড়ছে।
ডিএসই ও সিএসই সূত্রে জানা গেছে, দিন শেষে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের চেয়ে ৭৫.০৭ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ৫ হাজার ৪৪ পয়েন্টে। ডিএসই শরিয়াহ সূচক ২৩.৯৬ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ৬২ পয়েন্টে এবং ডিএস৩০ সূচক ২৯.৭৩ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ৯৩৮ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।
ডিএসইতে মোট ৩৯৮টি কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে শেয়ারের দাম বেড়েছে ৪৪টি কোম্পানির, কমেছে ৩১৪টির এবং অপরিবর্তিত আছে ৩৮টির। এদিন ডিএসইতে মোট ৪৪২ কোটি ৪০ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছিল ৪৪৪ কোটি ৫০ টাকার শেয়ার ও ইউনিট।
অপরদিকে, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) সিএসসিএক্স সূচক আগের দিনের চেয়ে ১১৩.৬১ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ৮ হাজার ৭৮৪ পয়েন্টে। সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ১৯৪.৯৯ পয়েন্ট কমে ১৪ হাজার ২৭৩ পয়েন্টে, শরিয়াহ সূচক ১৮.৪৭ পয়েন্ট কমে ৮৯৫ পয়েন্টে এবং সিএসই ৩০ সূচক ১২৪.০৩ পয়েন্ট কমে ১২ হাজার ৫৫৭ পয়েন্টে অবস্থান করছে।
সিএসইতে মোট ১৭৮টি কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে ৩১টি কোম্পানির, কমেছে ১৩৪টির এবং অপরিবর্তিত আছে ১৩টির। সিএসইতে ১০ কোটি ৭০ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছিল ৯ কোটি ৯৪ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট।

