স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, শেয়ারবার্তা ২৪ ডটকম, ঢাকা: একে তো ‘দুর্বল’ কোম্পানি। তার ওপরে আবার ‘মৌল ভিত্তি’ নেই শেয়ারের। এরপরও বাজারে উল্লম্ফনে রূপালী লাইফ ইন্সুরেন্সের শেয়ারের দর। পুঁজিবাজার থেকে অর্থ হাতিয়ে নিতে একটি ‘চিহ্নিত’ চক্র এ অপকর্ম করছে বলে শেয়ার বার্তা ২৪ ডটকমের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রূপালী লাইফ ইন্সুরেন্সের শেয়ার নিয়ে যে চক্রটি এর আগে ‘গ্যাম্বলিং’ করছে, ঠিক একই চক্র আবার কারসাজিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।। এই চক্রের কারসাজিতেই দুর্বল কোম্পানিটির শেয়ার মাত্র ৩ মাসের ব্যবধানে ৭৬ টাকা থেকে শেয়ার এখন ১২৬ টাকায় পৌঁছেছে। এমন প্রেক্ষাপটে যেসব শেয়ারের অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি হচ্ছে সেসব শেয়ারের ওপর নজর রাখছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন বিএসইসি।

উল্লম্ফনে থাকা কোম্পানিগুলোর শেয়ারের বিষয়ে কারসাজি পাওয়া গেলে তদন্ত করে ব্যবস্থার কথাও বলছে পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। মুলত সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অর্থ হাতিয়ে নিতে একটি চক্র রূপালী লাইফ ইন্সুরেন্সের শেয়ার নিয়ে কারসাজিতে নেমেছে। এরই মধ্যে দুর্বল কোম্পানিটির শেয়ার দর ৭৬ টাকা থেকে ১২৬ টাকায় পৌঁছেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলেছে, রূপালী লাইফ ইন্সুরেন্সের শেয়ারের কারসাজিতে এর আগেও যে চক্রটি জড়িত ছিলো একই চক্রই এবার টার্গেট করেছে। প্রতিষ্ঠানটির উল্লেখযোগ্য আয় না থাকলেও শেয়ারের দাম বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে।

তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত ৮ জুলাই রুপালী লাইফ ইন্সুরেন্সের প্রতিটি শেয়ারের দাম ছিল ৭৬ টাকা ২০ পয়সা। সেখান থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে ৭ অক্টোবর লেনদেন শেষে প্রতিটি শেয়ারের দাম দাঁড়িয়েছে ১২৬ টাকা ৩০ পয়সা। তবে দিনভর শেয়ারটির দাম ১২৫ টাকা থেকে ১৩২ টাকায় উঠানামা করে।

অর্থাৎ ৩ মাসের কম সময়ের ব্যবধানে প্রতিটি শেয়ারের দাম বেড়েছে ৫০ টাকা ৭৫ শতাংশের বেশি। শুধু গত ২০ কার্যদিবস নয়, চলতি বছরের ২২ সেপ্টম্বরের পর থেকেই কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ধারাবাহিক ভাবে বাড়ছে। গত ৭ সেপ্টম্বরের কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ারের দাম ছিল ১২৬ টাকা ৩০ পয়সা। অর্থাৎ এক মাসের কম ব্যবধানে প্রতিটি শেয়ারের দাম বেড়েছে ২৬ টাকা ৩০ পয়সা বা ২৬ শতাংশ।

বিনিয়োগকারীদের অনেকেই মনে করেন, বাজারে বড় ধরনের উত্থান-পতনের পেছনে একটি মহলের কারসাজি রয়েছে। বিনিয়োগকারী সেজে ছোট-বড় এসব চক্র দেশের পুঁজি বাজারে সক্রিয় রয়েছে। এসব কথিত বিনিয়োগকারীরা (গ্যাম্বলার) লোভের ফাঁদে ফেলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অর্থ হাতানোর ছক কষছেন। কৃত্রিমভাবে শেয়ারের দাম বাড়িয়ে আকৃষ্ট করা হচ্ছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের।

বিএসইসির সূত্র বলছে, অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির ফলে রূপালী লাইফ ইন্সুরেন্স ও প্রগতি লাইফ ইন্সুরেন্স সহ আরও কয়েকটি কোম্পানি সন্দেহের তালিকায় রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বৃদ্ধির তথ্য উপাত্ত পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এর পেছনে যৌক্তিক কোনো কারণ আছে কি না তাও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

এই মূল্য বৃদ্ধিকে অস্বাভাবিক ও সন্দেহজনক বলছেন পুঁজিবাজার বিশ্লেষকরাও। তারা বলছেন, এক শ্রেণির কথিত বিনিয়োগকারী পরিকল্পিতভাবে কৃত্রিম উপায়ে কিছু কোম্পানির শেয়ারের দর বাড়াচ্ছেন। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করে অর্থ হাতানোই তাদের মূল উদ্দেশ্য। শেয়ারবাজারে কারসাজি চক্র বেপরোয়া হয়ে ওঠায় এভাবে দুর্বল কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়ছে।

এদিকে রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. গোলাম কিবরিয়ার বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। তিনি অনিয়মকে নিয়ম বলে চালিয়ে যাচ্ছেন। কোন কিছু তোয়াক্কা করছেন না। তার অনিয়মগুলো যেন নিয়মে পরিনত হয়েছে। ফলে জাল-জালিয়াতি, অনিয়ম, দুর্নীতি ও ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের সিইও গোলাম কিবরিয়ার বিরুদ্ধে।

এর মধ্যে আইন লঙ্ঘন এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অনিয়মের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন তিনি। গোলাম কিবরিয়া অনিয়ম ও অনৈতিক পন্থায় অত্যন্ত সুক্ষ্ম এবং সুপরিকল্পিতভাবে আত্মসাত করেছেন কোম্পানির কোটি কোটি টাকা। যার ফলে হুমকির মুখে পড়েছে রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির ১২ লাখ গ্রাহকের শত শত কোটি টাকার আমানত। ফলে নানান সমস্যায় বিপদগ্রস্ত রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের আর্থিক হিসাবে বড় ধরনের অসঙ্গতি ধরা পড়েছে।

সর্বশেষ ২০২৪ সালের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে প্রায় ৬৯ কোটি টাকার গরমিলের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন নিরীক্ষক। কোম্পানিটির নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর কোম্পানিটি ব্যাংক বুক/লেজারে নগদ অর্থ দেখিয়েছে ৯১ কোটি ৫১ লাখ টাকা। তবে ব্যাংক স্টেটমেন্টে পাওয়া গেছে মাত্র ৪৭ কোটি ৫২ লাখ টাকা।

অর্থাৎ কোম্পানির হিসাবে ব্যাংক ব্যালেন্সের সঙ্গে প্রকৃত স্টেটমেন্টের পার্থক্য দাঁড়িয়েছে ৪৩ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে এজেন্টদের কাছে পাওনা হিসেবে ২৪ কোটি ৯৪ লাখ টাকা দেখিয়ে আসছে কোম্পানিটি টাকা দেখিয়ে আসছে কোম্পানিটি।