স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, শেয়ারবার্তা ২৪ ডটকম, ঢাকা: পুঁজিবাজারে কারসাজির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার প্রমাণ পাওয়ায় বহুল আলোচিত সরকারি কর্মকর্তা ও বিনিয়োগকারী আবুল খায়ের হিরুর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এ লক্ষ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। তবে এত কিছু পরও কারসাজি থামছে না আবুল খায়ের হিরু। তিনি এখন নামে বেনামে নতুন করে কারসাজিতে নেমেছেন।

বছর ছয়েক আগেও পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের কাছে আবুল খায়ের হিরুর নামটি খুব একটা পরিচিত ছিল না। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই পুঁজিবাজারে রীতিমতো অঘোষিত ‘হিরো’ বনে যান তিনি। শেয়ার কারসাজি করে শত শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন, গড়েছেন প্রভাবশালীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক। বিত্তশালী অনেকের তহবিল তিনি নিজে পরিচালনা করে টাকা বানিয়ে দিয়েছেন।

হিরু যে শেয়ারেই হাত দিয়েছেন, সেই শেয়ারের দাম বেড়ে গেছে রাতারাতি। শেয়ার কারসাজি নিয়ে করা তদন্তে আবুল খায়ের হিরুর সম্পৃক্ততার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলেও আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে তেমন কোন ব্যবস্থা না নিলেও বর্তমান কমিশন তার বিরুদ্ধে জোরালো পদক্ষেপ নিচ্ছে। তবে এত কিছুর পরও থামছে হিরুর পুঁজিবাজারে কারসাজি।

এবার তিনি নতুন করে বীমা খাতের শেয়ার প্রগতি ইন্সুরেন্সের শেয়ার নিয়ে কারসাজিতে মেতে উঠছেন। মাস খানেক আগেও তিনি ক্রিস্টাল ইন্সুরেন্স ও সেন্ট্রাল ইন্সুরেন্সের শেয়ার নিয়ে নতুন করে কারসাজিতে মেতে উঠছেন। সপ্তাহের তৃতীয় কার্যদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচকের বড় দরপতন হলেও প্রগতি ইন্সুরেন্সের শেয়ার নিয়ে হিরুর নতুন ক্যারিশম্যাটিক শুরু করছে। মুলত বিএনপি নেতা আবদুল আউয়াল মিন্টুর নাম বিক্রি করে নতুন করে কারসাজিতে নামছেন তিনি।

তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত ২২ সেপ্টেম্বর প্রগতি ইন্সুরেন্সের প্রতিটি শেয়ারের দাম ছিল ৫৭ টাকা ৩০ পয়সা। সেখান থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে ৭ অক্টোবর লেনদেন শেষে প্রতিটি শেয়ারের দাম দাঁড়িয়েছে ৮০ টাকা ৭০ পয়সা। তবে দিনভর শেয়ারটির দাম ৭৫ টাকা ২০ পয়সা থেকে ৮৪ টাকা ৪০ পয়সায় টাকায় উঠানামা করে।
অর্থাৎ এক মাসের কম সময়ের ব্যবধানে প্রতিটি শেয়ারের দাম বেড়েছে ২৩ টাকা ৭০ পয়সা অথাৎ ৪৪ শতাংশের বেশি। শুধু গত ২০ কার্যদিবস নয়, তিন মাসের ব্যবধানে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ধারাবাহিক ভাবে বাড়ছে। গত ৮ জুলাই কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ারের দাম ছিল ৪৭ টাকা ১০ পয়সা। অর্থাৎ তিন মাসের কম ব্যবধানে প্রতিটি শেয়ারের দাম বেড়েছে ৩৩ টাকা ৬০ পয়সা বা প্রায় ৮০ শতাংশ।

বিনিয়োগকারীদের অনেকেই মনে করেন, বাজারে বড় ধরনের উত্থান-পতনের পেছনে একটি মহলের কারসাজি রয়েছে। বিনিয়োগকারী সেজে ছোট-বড় এসব চক্র দেশের পুঁজি বাজারে সক্রিয় রয়েছে। এসব কথিত বিনিয়োগকারীরা (গ্যাম্বলার) লোভের ফাঁদে ফেলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অর্থ হাতানোর ছক কষছেন। কৃত্রিমভাবে শেয়ারের দাম বাড়িয়ে আকৃষ্ট করা হচ্ছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের। এর আগেও আবুল খায়ের হিরু শিবলী কমিশনের সময় বীমা খাতের শেয়ারগুলোতে চার গুন পাঁচ গুন করে দাম বাড়িয়ে বিনিয়োগকারীদের সর্বনাশ করেছেন।

জানা গেছে, ২০১০ সালে দেশের পুঁজিবাজারে ধসের পর ড. ইব্রাহীম খালেদের সুপারিশে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) পুনর্গঠন করে তৎকালীন সরকার। পুনর্গঠিত বিএসইসির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্সের অধ্যাপক ড. এম খায়রুল হোসেন। তিনি প্রায় দশ বছর দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু আলোচ্য সময়ে তিনি বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারেননি। পরে করোনা মহামারির কারণে ২০২০ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে শাটডাউনের সময় প্রায় দুই মাস পুঁজিবাজার বন্ধ থাকে।

এরপর রুগ্ন শেয়ারবাজার পুনরুদ্ধারে দায়িত্ব নেন অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলাম। তিনি দায়িত্ব নিয়েই দরকারি সব সংস্কার ও সুশাসনের প্রতিশ্রুতি দিলে সাময়িকভাবে শেয়ারদরের কিছুটা উত্থান হয়। ঢাকা এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ২০২১ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ১০০ শতাংশের বেশি বেড়ে ৭ হাজার ৩০০ পয়েন্ট ছাড়িয়ে যায়।

কিন্তু বিনিয়োগকারীরা এক সময় পরিষ্কার হয়ে যান যে, ছোট মূলধন সীমার খাতগুলোর অস্বাভাবিক উত্থানের পেছনে কাজ করছে শিবলীরই সমর্থিত একটি চক্র, তখনই উত্থান থেমে যায়। ওই সময়ে বাজারে সক্রিয় থাকা বিনিয়োগকারীদের অন্য জোটগুলোও দেখে যে, শিবলী শুধু তার ঘনিষ্ঠ চক্রগুলোকেই নানান সুবিধা ও ছাড় দেন। অর্থাৎ শিবলী নিজেই শেয়ারবাজারে জুয়াড়ি তৈরি করছেন এবং তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ও দিচ্ছেন।

ফলে যারা এর বাইরে ছিলেন তাদের বাজার প্রভাবিত করার ক্ষমতা একেবারেই কমে যায়। এ সময় আলাদিনের প্রদীপ নিয়ে হাজির হন পুঁজিবাজারের আলোচিত বিনিয়োগকারী হিরু ও তার সহযোগীরা। তারা পুঁজিবাজার থেকে কারসাজির মাধ্যমে বিশাল অংকের টাকা কামিয়ে নিয়েছেন। সরকারি কর্মকর্তা হিরুর কাছে অনেক প্রভাবশালীর পোর্টফোলিও ‘ম্যানেজের’ দায়িত্বও ছিল।

জানা গেছে, হিরু শেয়ার ব্যবসায় আসেন ২০০৬ সালে। তবে ২০১৯ সালের নভেম্বরে প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্সের শেয়ার দিয়ে কারসাজিতে তার হাতেখড়ি। আর ‘হিরো’ হয়েছেন মূলত ২০২০ সালের জুলাই থেকে একের পর এক বীমা কোম্পানির দর আকাশচুম্বী করে। কারসাজি করেই ২০২০ সালের জুলাই থেকে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত ১০৬ কোটি টাকা রিয়েলাইজড গেইন করেন তিনি।

সেই সময় এক দফায় বীমা খাতের, বিশেষ করে সাধারণ বীমা কোম্পানিগুলোর শেয়ারদরে উল্লম্ফন ঘটে। সেবারই প্রথম একজন বড় বিনিয়োগকারী হিসেবে তার নাম সামনে আসে। এর পর থেকে তাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। যে শেয়ারেই তিনি হাত দিয়েছেন, সেটিরই দাম বেড়েছে।