নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে ফাঁকি দিয়ে প্রগতি লাইফ ইন্সুরেন্স ও প্রগতি ইন্সুরেন্সের ‘গোপন খেলা’
শেয়ারবার্তা ২৪ ডটকম, ঢাকা: বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বেশ কিছু কোম্পানি পরিকল্পিতভাবে তথ্য গোপন করে কৃত্রিমভাবে শেয়ারের দাম বাড়াচ্ছে। পরে সেই বাড়তি দরে নিজেদের শেয়ার বিক্রি করে অবৈধ সুবিধা নিচ্ছে। এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা নিয়মিতভাবে বড় লোকসানের শিকার হচ্ছেন। এর জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বলতাকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তেমনি পুঁজিবাজারে রূপকথার আলাদিনের চেরাগের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে বীমা খাতের কোম্পানি প্রগতি লাইফ ইন্সুরেন্স। মাত্র ৩ মাসের ব্যবধানে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম বেড়ে তিনগুণের বেশি হয়েছে। অবশ্য শুধু শেষ ১ মাসের কম সময়ের ব্যবধানে শেয়ারের দাম বেড়েছে ৪০ শতাংশ।
অস্বাভাবিক হারে দাম বাড়ায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) থেকে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করে সতর্কবার্তাও প্রকাশ করা হয়েছে। এরপরও দাম বাড়ার প্রবণতা থামেনি। বরং লাফিয়ে লাফিয়ে দাম বেড়েই চলছে। মাত্র তিন মাসের মধ্যে কোম্পানির শেয়ারের দাম বেড়ে প্রায় তিনগুণ হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের এমন দাম বাড়াকে অস্বাভাবিক বলছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, প্রগতি লাইফ ইন্সুরেন্স শেয়ারটি নিয়ে কারসাজি হচ্ছে। এক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে ফাঁকি দিয়ে বীমা খাতের প্রগতি লাইফ ইন্সুরেন্স ও প্রগতি ইন্সুরেন্স কোম্পানিটি ‘গোপন খেলায়’ মেতে উঠছে।
এদিকে প্রগতি লাইফ ইন্সুরেন্স কোম্পানিটির শেয়ারের এমন অস্বাভাবিক দাম বাড়ার কারণ ক্ষতিয়ে দেখতে এরই মধ্যে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) থেকে ডিএসইকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ডিএসই থেকেও সম্প্রতি কোম্পানিটির শেয়ারের দাম বাড়াকে অস্বাভাবিক বলে অভিহিত করা হয়েছে।
শেয়ারের অস্বাভাবিক দাম বাড়ার পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি ডিএসই থেকে কোম্পানিটির কর্তৃপক্ষকে নোটিশ দেওয়া হয়। নোটিশের জবাবে কোম্পানিটির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সম্প্রতি শেয়ারের দাম যে অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে তার পেছনে কোনো অপ্রকাশিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য নেই।
তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত ৭ জুলাই প্রগতি লাইফ ইন্সুরেন্সের প্রতিটি শেয়ারের দাম ছিল ৮৭ টাকা । সেখান থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে ৬ অক্টোবর লেনদেন শেষে প্রতিটি শেয়ারের দাম দাঁড়িয়েছে ২৬৩ টাকা ৫০ পয়সা। অর্থাৎ ৩ মাসের ব্যবধানে প্রতিটি শেয়ারের দাম বেড়েছে ১৭৬ টাকা ৫০ পয়সা বা ৩০০ শতাংশের বেশি। শুধু গত ২০ কার্যদিবস নয়, চলতি বছরের ৭ সেপ্টম্বরের পর থেকেই কোম্পানিটির শেয়ারের দাম বাড়ছে। গত ৭ সেপ্টম্বরের কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ারের দাম ছিল ১৮৮ টাকা ৩০ পয়সা। অর্থাৎ এক মাসের কম ব্যবধানে প্রতিটি শেয়ারের দাম বেড়েছে ৭৫ টাকা ৫০ পয়সা বা ৪০ শতাংশ।
এদিকে প্রগতি ইন্সুরেন্স গত এক মাসের কম সময়ের মধ্যে ৩৫ শতাংশ শেয়ারের দাম বেড়েছে। গত ২২ সেপ্টেম্বর প্রগতি ইন্সুরেন্সের প্রতিটি শেয়ারের দাম ছিল ৫৭ টাকা । সেখান থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে ৬ অক্টোবর লেনদেন শেষে প্রতিটি শেয়ারের দাম দাঁড়িয়েছে ৭৭ টাকা ৭০ পয়সা। অর্থাৎ ১ মাসের কম ব্যবধানে প্রতিটি শেয়ারের দাম বেড়েছে ২০ টাকা ৭০ পয়সা বা ৩৫ শতাংশের বেশি।
শুধু প্রগতি লাইফ ইন্সুরেন্স কিংবা প্রগতি ইন্সুরেন্স নয়, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এমন অনেক কোম্পানি রয়েছে, যারা নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি এবং স্টক এক্সচেঞ্জের চোখে ধুলা দিয়ে নিয়মিত প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে যাচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় তথ্য গোপনের মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে শেয়ারের দাম বাড়িয়ে নেয় কোম্পানি।
কিছু কিছু ক্ষেত্রে কোম্পানির উদ্যোক্তা ও পরিচালকরা শেয়ার বিক্রি করার আগ মুহূর্তে এমনটা করে থাকেন। এতে অল্প মালিকানা বিক্রি করেই বড় অঙ্কের টাকা কোম্পানি থেকে সরিয়ে নিতে পারেন তারা। এছাড়া প্রগতি লাইফ ইন্সুরেন্সের শেয়ার কারসাজিতে শীর্ষ এক কারসাজি চক্রের জড়িত থাকায় অভিযোগ উঠছে। তার ইশরায় একটি ব্রোকারেজ হাউজ থেকে ইনসাইডার ভাবে শেয়ারের দাম বাড়াচ্ছে।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, কিছু কোম্পানি উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে এই কাজগুলো করছে। কোম্পানির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা এক শ্রেণির বিনিয়োগকারীদের কাছে অনেক আগেই জানিয়ে দেন তারা। ওই চক্রটি প্রথমে নিজেরা অল্প দামে শেয়ার কিনে নেয়। পরে কিছু ব্রোকারেজ হাউসের মাধ্যমে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে বার্তা পৌঁছে দেয়। এতে শেয়ারটির দর হুহু করে বৃদ্ধি পায়। কিন্তু এই কৃত্রিম দরবৃদ্ধি একটি পর্যায়ে গিয়ে স্থায়ী হয় না। এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের একটা শ্রেণির বড় লোকসান হয়। অনেক ক্ষেত্রে কোম্পানির কর্তাব্যক্তিরাও নিজেদের মালিকানার কিছু অংশ বিক্রি করে সুযোগ নিয়ে নেন।
ডিএসইর এক সদস্য বলেন, প্রগতি লাইফ ইন্সুরেন্সের মত শেয়ার ২৬৩ টাকা হওয়ার কথা নয়। এটা মুলত কারসাজির কারণে হচ্ছে। প্রগতি লাইফ ইন্সুরেন্সের কারসাজি সাথে একটি চক্র জড়িত রয়েছে। এছাড়া খোলা চোখেই বোঝা যায়, এই দাম বাড়ার পেছনে কোনো বিশেষ চক্র আছে। বিনিয়োগকারীদের কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।
তিনি আরও বলেন, অতীতে আমরা অনেক কোম্পানির শেয়ারের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়তে দেখেছি। এরপর সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বড় ধরনের লোকসানের মধ্যেও পড়তে দেখেছি। কারণ অস্বাভাবিক দম বাড়ার পর অস্বাভাবিক দরপতনও হয়। কোন বিশেষ চক্র এই দাম বাড়ানোর পেছনে রয়েছে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচিত তা ক্ষতিয়ে দেখে বের করা। যদি কেউ আইন লঙ্ঘন করে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে হবে।
ডিএসইর দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, প্রগতি লাইফ ইন্সুরেন্সের শেয়ারের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়ার বিষয়টি নজরদারি করা হচ্ছে। শেয়ারের দাম বাড়ার ক্ষেত্রে কোনো অসংগতি থাকলে সে অনুযায়ী প্রতিবেদন তৈরি করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসিকে দেওয়া হবে।

