মার্জার ইস্যুতে পাঁচ ব্যাংকের শেয়ার এখন বিনিয়োগকারীদের গলার কাঁটা
শেয়ারবার্তা ২৪ ডটকম, ঢাকা: দেশের পুঁজিবাজারে নানান সংকট আর বিনিয়োগকারীদের চরম আস্থাহীনতা বিরাজ করছে। সব থেকে বেশি আস্থার সংকটে রয়েছে যেন ব্যাংক খাত। বর্তমানে পুঁজিবাজারে ১৭টি ব্যাংকের শেয়ার ফেস ভ্যালু বা ১০ টাকার নিচে লেনদেন হচ্ছে। এর মধ্যে ৮টির ব্যাংকের শেয়ারের দাম ৫ টাকার নিচে। অথচ বাজার থেকে এখন সাধারণ মানের একটি চকলেট কিনতে গেলেও ৫ টাকা গুনতে হয়। অর্থাৎ এক পিস চকলেটের দামেই এখন একাধিক ব্যাংকের শেয়ার কেনা যাচ্ছে।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশের ব্যাংকখাতে এক ধরনের বিশৃঙ্খল অবস্থা বিরাজ করছে। মালিকদের পারস্পরিক যোগসাজশে ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ লোপাট করা হয়েছে। ফলে অনেক ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। সুশাসনের অভাবে বেড়েছে ব্যাংকে খেলাপি ঋণ। সব মিলিয়ে ব্যাংকখাতের শেয়ারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের চরম আস্থার সংকট দেখা দিয়েছে। এ কারণে ব্যাংকের শেয়ার দামে এমন দৈন্যদশা।
তারা বলছেন, একসময় দেশের পুঁজিবাজারের প্রাণ হিসেবে বিবেচিত হতো ব্যাংকখাত। ভালো লভ্যাংশ পাওয়ার আশায় বিনিয়োগকারীরা ব্যাংকের শেয়ারে বিনিয়োগ করতেন। বিশেষ করে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের বড় অংশ থাকতো ব্যাংকের শেয়ারে।
কিন্তু ব্যাংক খাতের নানান অনিয়ম ও মার্জার ইস্যুতে অধিকাংশ ব্যাংকের শেয়ার দাম অস্বাভাবিক হারে কমে গেছে। এতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বড় ধরনের লোকসানের মধ্যে পড়েছেন। তাদের বিনিয়োগ সক্ষমতা কমে গেছে। ফলে সার্বিক পুঁজিবাজারেও তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে দেখা যাচ্ছে।
বর্তমানে দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকের সংখ্যা ৩৬টি। এর মধ্যে ফেস ভ্যালু বা ১০ টাকার নিচে বিক্রি হচ্ছে ১৭ ব্যাংকের শেয়ার। যার মধ্যে ৮টির শেয়ারের দাম ৫ টাকার নিচে। এ ৮টি ব্যাংকের মধ্যে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার ১ টাকা ৯০ পয়সা, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার ১ টাকা ৪০ পয়সা, আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার ২ টাকা ২০ পয়সা, ন্যাশনাল ব্যাংকের শেয়ার ৩ টাকা ৩০ পয়সা, ইউনিয়ন ব্যাংকের শেয়ার ১ টাকা ৫০ পয়সা, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার ৩ টাকা ১০ পয়সা, আইএফআইসি ব্যাংকের শেয়ার ৪ টাকা ৯০ পয়সা, এক্সিম ব্যাংকের শেয়ার ২ টাকা ৯০ পয়সা, এবি ব্যাংকের শেয়ার ৫ টাকায় অবস্থান করছে।
ফেস ভ্যালুর নিচে থাকা বাকি ব্যাংকগুলোর মধ্যে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের শেয়ার ৫ টাকা ৪০ পয়সা, সাউথইস্ট ব্যাংকের শেয়ার ৯ টাকা ৫০ পয়সা, সাউথ বাংলা অ্যাগ্রিকালচার ব্যাংকের শেয়ার ৭ টাকা ৫০ পয়সা, প্রিমিয়ার ব্যাংকের শেয়ার ৬ টাকা ৩০ পয়সা, ওয়ান ব্যাংকের শেয়ার ৭ টাকা ৩০ পয়সা, এনআরবিসি ব্যাংকের শেয়ার ৬ টাকা ২০ পয়সা, এনআরবি ব্যাংকের শেয়ার ৮ টাকা ২০ পয়সা, মার্কেন্টাইল ব্যাংকের শেয়ার ৯ টাকা ১০ পয়সা লেনদেন হচ্ছে।
তবে গত জুন ও জুলাই মাসে ব্যাংক খাতের শেয়ারে হঠাৎ একচেটিয়া প্রভাব থাকলেও আগস্ট মাসের ঘটে ব্যতিক্রম। মুলত আগস্টের শুরুতে মার্জার ইস্যুতে ব্যাংক খাতের শেয়ারে ধস নেমেছে। ফলে ব্যাংক খাতের শেয়ার আস্থা থেকে অনাস্থা সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত যে পাঁচ ব্যাংক একীভূতকরন হচ্ছে সে সব ব্যাংকের শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের অনাস্থা তৈরি হয়েছে। ফলে ব্যাংক খাতের শেয়ারের দরপতনে সূচকের দরপতন হচ্ছে।
এছাড়া পাঁচটি ইসলামিক ব্যাংক একীভূত হয়ে দেশের সবচেয়ে বড় ব্যাংক হিসেবে গড়ে উঠতে যাচ্ছে। তবে একীভূত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব ব্যাংক পুঁজিবাজার থেকে তালিকাচ্যুত হবে। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য এ ধাক্কা চরম, কারণ ব্যাংক কোম্পানি আইনে তাদের ক্ষতিপূরণের কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, এই পাঁচ ব্যাংকের মোট আমানত প্রায় এক লাখ ৫২ হাজার কোটি টাকা এবং ঋণের পরিমাণ দুই লাখ কোটি টাকার বেশি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যক্তি আমানতকারীদের প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা ফেরত নিশ্চিত করার বিশেষ পরিকল্পনা করেছে। প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীরাও নতুন ব্যাংকের শেয়ার পেতে পারেন। তবে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য এখনো কোনো সুরক্ষা নেই।
একীভূতকরণের খবরেই পুঁজিবাজারে বড় ধাক্কা লেগেছে। যেসব শেয়ার আগে ১০ টাকার বেশি ছিল, এখন ২ থেকে ৩ টাকায় নেমে গেছে। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ইতিমধ্যেই মূলধন হারিয়েছেন। যারা আরও বেশি দামে শেয়ার কিনেছিলেন, তাদের ক্ষতি আরও বড়। বিনিয়োগকারীরা অভিযোগ করছেন, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা নানা কৌশলে ক্ষতি সামাল দিতে পারলেও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া প্রায় অসম্ভব।
এক্সিম ব্যাংকের শেয়ারের ৩০ শতাংশ সাধারণ বিনিয়োগকারীর হাতে। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারের ৬৫ শতাংশ সাধারণ বিনিয়োগকারীর। গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংকেও যথাক্রমে ৩১, ১৭ ও ৩০ শতাংশ শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীর হাতে।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক শেয়ারহোল্ডারের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার বিষয়ে চিন্তাভাবনা করছে, তবে কোনো প্রস্তাব বা নিশ্চয়তা নেই। বিএসইসির সঙ্গে যৌথ বৈঠকের পরিকল্পনা থাকলেও ফলাফল অনিশ্চিত। বিনিয়োগকারীরা আশা করছেন, বিএসইসি কার্যকর ভূমিকা নেবে, কারণ ব্যাংকগুলোর বিপর্যয়ে তাদের কোন দোষ নেই। এ ব্যাংকগুলোর বেহাল দশা পুরো ব্যাংক খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

