শেয়ারবার্তা ২৪ ডটকম, ঢাকা: পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত বীমা খাতের কোম্পানি রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডে সিন্ডিকেট করে শত কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করেছেন কোম্পানিটির নিরীক্ষা বিভাগের ডেপুটি ম্যানেজার মো. জহিরুল ইসলাম। সম্প্রতি তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এবং বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) প্রেসিডেন্টের কাছে এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন।

অভিযোগে এই কর্মকর্তা দাবি করেছেন, কোম্পানির চেয়ারম্যান, সাবেক সংসদ সদস্য মাহফুজুর রহমান মিতা এবং মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. গোলাম কিবরিয়ার নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট বছরের পর বছর ধরে আইন লঙ্ঘন, অনিয়ম, জালিয়াতি ও তহবিল তছরুপ করে আসছে। এই সিন্ডিকেট ১২ লাখ গ্রাহকের শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। মুলত রূপালী লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানির চেয়ারম্যান চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের সাবেক এমপি মাহফুজুর রহমান। তিনি পলাতক থাকায় সিইও গোলাম কিবরিয়া কয়েকজন পরিচালকের সঙ্গে মিলে বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া কোম্পানিটিতে একাধিক গ্রুপ তৈরি হয়েছে।

এদিকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের পতন হলেও রুপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যান পদে বহাল তবিয়তেই রয়ে গেছেন হাসিনার ঘনিষ্ঠ দোসর সাবেক সংসদ সদস্য মাহফুজুর রহমান মিতা। মুলত মাহফুজুর রহমান মিতা কমিশনের নামে পাচারের মাধ্যমে লুটে নিয়েছে বিপুল অংকের অর্থ। যার প্রধান সহযোগী কোম্পানির বিতর্কিত সিইও ও আওয়ামী লীগের অর্থদাতা কোম্পানিটির সিইও গোলাম কিবরিয়া।

মুলত আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে ১৫ আগস্ট ও বিভিন্ন দিবসে কোম্পানিটির কোটি কোটি টাকা তসরুপ হয়েছে। আর নানা উপায়ে অর্থ বের করত ফ্যাসিস্টের অর্থায়নকারী গোলাম কিবরিয়া। যে কারণে প্রতিষ্ঠানটির অনিয়মে খাদের কিনারে এসে পড়েছে। ঝুঁকির মুখে পড়েছে বীমা গ্রাহকদের আমানত। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) তদন্তেও উঠে এসেছে কোম্পানিটির নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের চিত্র।

তবে অনুমোদনহীন বীমা পরিকল্পনা বিক্রি, আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয়, পলিসি তামাদির উচ্চহার, ক্যাশ ইন হ্যান্ডের নামে অর্থ আত্মসাত, একক প্রিমিয়ামকে মেয়াদি বীমা দেখিয়ে ব্যাপক তহবিল লোপাট, সম্পদ বিনিয়োগে অনিয়মসহ নানা দুর্নীতি আর কেলেঙ্কারির বোঝা নিয়ে রুপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের সিইও পদে বহাল তবিয়তেই আছেন গোলাম কিবরিয়া। অথচ তার বিরুদ্ধে সবগুলো অভিযোগের সত্যতা উঠে এসেছে খোদ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের তদন্ত প্রতিবেদনে। ফলে গোলাম কিবরিয়া অনিয়মকে নিয়ম বলে চালিয়ে যাচ্ছেন।

কোন কিছু তোয়াক্কা করছেন না। তার অনিয়মগুলো যেন নিয়মে পরিনত হয়েছে। ফলে জাল-জালিয়াতি, অনিয়ম, দুর্নীতি ও ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠলেও তিনি নিরবে দাফিয়ে বেড়াচ্ছেন। এর মধ্যে আইন লঙ্ঘন এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অনিয়মের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন তিনি। গোলাম কিবরিয়া অনিয়ম ও অনৈতিক পন্থায় অত্যন্ত সুক্ষ্ম এবং সুপরিকল্পিতভাবে আত্মসাত করেছেন কোম্পানির কোটি কোটি টাকা। যার ফলে হুমকির মুখে পড়েছে রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির ১২ লাখ গ্রাহকের শত শত কোটি টাকার আমানত।

জানা যায়, কোম্পানির টাকা আত্মসাত করে বহুতল ভবন নির্মাণ, ফ্ল্যাটসহ নামে-বেনামে অবৈধভাবে গড়েছেন বিপুল সম্পদ। এছাড়া কোম্পানিতে সিন্ডিকেট তৈরি করে কর্মকর্তাদের অবণ্টনকৃত কমিশন বিল আত্মসাৎ, পারিবারিক ভ্রমণ ব্যয় দেখিয়ে কোম্পানির তহবিল থেকে অর্থ আত্মসাৎ, আপ্যায়ন বিল উত্তোলন করে আত্মসাৎ, উন্নয়ন সভার নামে অর্থ আত্মসাতসহ বিভিন্ন দিবস ও প্রচারণা বিল উত্তোলন করে আত্মসাৎ এবং কোম্পানির ভবিষ্যত তহবিল থেকে টাকা তছরুপের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত একটি চিঠি আইডিআরএ চেয়ারম্যান বরাবর পাঠানো হয়েছে। চিঠির সঙ্গে মো. গোলাম কিবরিয়ার বিরুদ্ধে জমা পড়া অভিযোগের কপি সংযুক্ত করে বিধি মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

রূপালী লাইফের ডেপুটি ম্যানেজার (নিরীক্ষা বিভাগ) মো. জহিরুল ইসলাম এ অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগের কপি অর্থ উপদেষ্টাকে দেওয়ার পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশনকেও দেওয়া হয়েছে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, মো. গোলাম কিবরিয়া ২০০০ সালে ভুয়া অভিজ্ঞতার সনদ দেখিয়ে রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে এজিএম হিসেবে যোগ দেন। পরে ভুয়া এমবিএ সনদ দেখিয়ে ২০১৪ সালে সিইওর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

কোম্পানির উন্নয়ন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নামে বছর শেষে অবণ্টনকৃত বিভিন্ন কমিশন বিল, ইনসেনটিভ বিল, বেতন ভাতার ৯৯ হাজার তিনশ ৭৯ টাকা অবৈধভাবে আত্মসাৎ করেন। আর এই কাজে তাকে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করেন কোম্পানির কমিশন ইনচার্জ আকতার হোসেন এভিপি ও সাবেক ইনচার্জ জাহাঙ্গীর হোসেন -ডিভিপি। নিয়ম অনুযায়ী কমিশন সংক্রান্ত যেকোন বিল সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন কর্মকর্তার ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে পরিশোধের নিয়ম থাকলেও এই ক্ষেত্রে সেটা মানা হয়নি। এই খাতে এভাবে বছরের পর বছর জাল জালিয়াতির মাধ্যমে লুট করা হয়েছে বিপুল অংকের অর্থ।

ওই অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, গোলাম কিবরিয়া রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ হওয়া সত্ত্বেও ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিভিন্ন জাল জালিয়াতির মাধ্যমে কোম্পানির ভবিষ্যত তহবিল থেকে ৬০ লাখ টাকা উত্তোলন করেছেন। যা সম্পূর্ণ অনৈতিক ও নিয়ম বর্হিভূত কাজ। এ বিষয়ে অর্থ ও হিসাব বিভাগের কর্মকর্তা আকতার হোসেন এভিপিকে জিজ্ঞাসা করা হলে বিস্তারিত তথ্য বেরিয়ে আসবে বলেও জানানো হয়। গোলাম কিবরিয়া পারিবারিক ভ্রমণের খরচও জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে কোম্পানি থেকে হাতিয়ে নেন।

তিনি পরিবার-পরিজন নিয়ে দেশ-বিদেশে ভ্রমণ করে সেই বিলও কোম্পানির তহবিল থেকে আদায় করেন। গত ২০ থেকে ২২ ডিসেম্বর পারিবারিক ভ্রমণে ঢাকা থেকে চট্রগ্রাম যান। সেই বাবদ তিনি কোম্পানি থেকে ৩৫ হাজার নয় শত ৯৯ টাকা উত্তোলন করেন। যা সম্পূর্ণ নিয়ম বহির্ভূত কাজ। এভাবে তিনি দীর্ঘদিন যাবত কোম্পানির টাকা আত্মসাত করে আসছেন। এখানেই শেষ নয়, ব্যবসা বৃদ্ধির নামে কানাডাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রমোদ করেন তিনি।

এভাবে কোম্পানির লাখ লাখ টাকা তছরুপ করছেন বলেও উল্লেখ করা হয় ওই অভিযোগপত্রে। সিইও গোলাম কিবরিয়া বিভিন্ন সময়ে তার দপ্তরে আসা উন্নয়ন কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের আগমন দেখিয়ে সেই কর্মীদের নামে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে, আপ্যায়ন বিল হিসেবে তা আত্মসাৎ করেন। এভাবে বছরের পর বছর ভুয়া বিল ভাউচার তৈরি করে কোম্পানির লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে আসছেন তিনি।

অভিযোগপত্রে বলা হয়, গোলাম কিবরিয়া কোম্পানির ব্যবসা বৃদ্ধি ও সম্প্রসারণ এবং উন্নয়নের নামে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ভুয়া বিল ভাউচার তৈরি করে লাখ লাখ টাকা উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেন। গত ডিসেম্বরের ভাউচার অনুযায়ী, তিনি ভুয়া বিল তৈরি করে এক মাসে ৮২ হাজার আটশত টাকা আত্মসাৎ করেন। অনুরূপভাবে বছরের পর বছর বিভিন্ন কায়দায় তিনি কোম্পানির টাকা আত্মসাৎ করে আসছেন।

বিমা খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, চেয়ারম্যান ও পরিচালকেরা মাসের পর মাস অনুপস্থিত থাকায় কোম্পানি ও গ্রাহকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কোম্পানির কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। অনিয়ম ও দলাদলি জেঁকে বসেছে। বর্তমান পরিচালক, নির্বাহীসহ প্রভাবশালী ব্যক্তিরা বিভিন্ন খাতে খরচের নামে অর্থ লোপাটের ছক কষছেন। এতে গ্রাহকদের বিমার অর্থের দাবি পূরণ না হওয়ার শঙ্কা বাড়ছে।

শেয়ারহোল্ডাররা বঞ্চিত হচ্ছেন মুনাফা থেকে। বিমা খাতের পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, সংশ্লিষ্ট কোম্পানির নিরীক্ষকেরা এসব অসংগতি তুলে ধরছেন না। নিয়ন্ত্রক সংস্থাও দায়িত্বশীল আচরণ করছে না। যথাযথ নজরদারি না থাকায় কোম্পানিগুলোর শীর্ষ নির্বাহীরা লাগামছাড়া হয়ে উঠছেন।

একাধিক কর্মকর্তারা বলছেন, কোম্পানিগুলোতে চেয়ারম্যানরা সশরীর উপস্থিত না হলেও তাঁদের গাড়ির খরচ, জ্বালানি খরচ এমনকি চালকের বেতন দেওয়া হচ্ছে প্রতিষ্ঠান থেকে। নেওয়া হচ্ছে মোবাইল ফোনের বিলও। একই অবস্থা পরিচালকদের ক্ষেত্রেও।

এ বিষয়ে রূপালী লাইফ ইনস্যুরেন্সের সচিব আমিরুল ইসলাম বলেন, চেয়ারম্যান নিয়মিত অফিস করেন না, প্রয়োজনে আসেন, আবার চলে যান। তবে ডিএমডি জহিরুল ইসলাম বলেন, চেয়ারম্যান পলাতক। তিনি পর্ষদ সভা করেন জুমে। মিটিংয়ের নামে টাকা নিচ্ছেন। তিনি অফিসে না আসায় মিটিংয়ের নামে গ্রাহকদের অর্থ লোপাট চলছে।

এ অভিযোগের বিষয়ে জানতে রুপালী লাইফ ইন্সুরেন্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা গোলাম কিবরিয়ার মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এমনকি বিষয়টি উল্লেখ করে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দিলেও কোনো উত্তর দেননি।