ন্যাশনাল লাইফ ইন্সুরেন্সের সিইও কাজিম উদ্দিনের বিরুদ্ধে ভুয়া সনদ ও অনিয়মের ফিরিস্তি!
স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, শেয়ারবার্তা ২৪ ডটকম, ঢাকা: শুরুটা যখন জালিয়াতির হাত ধরে, ধারাবাহিকতাও একই পথে। ভুয়া সার্টিফিকেট দিয়ে কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে নির্বিঘ্নে বছরের পর বছর কাটিয়ে দিলেন মো: কাজিম উদ্দিন। শুধু তাই নয় নিয়োগপত্র নবায়নও করেছেন একই পন্থায়। নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ’র হাত দিয়েই পাচ্ছে এসব অনুমোদন। তবুও যেন দেখার কেউ নেই।
বিমা খাতে সংকটের শেষ নেই, তার উপর বড় পদ ধারীদের অনিয়মে আরও বিতর্কিত হচ্ছে এই খাত। কোন কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তা যদি জালিয়াতি করে পদে বসেন, সেখানে সাধারণ গ্রাহকদের অনেক শঙ্কা থেকেই যায়। তাছাড়া বিমা খাতে বড় সংকট এখন গ্রাহকের টাকা না পাওয়া।
জানা যায়, কাজিম উদ্দিনের শিক্ষা সনদ নিয়ে জোড়ালো প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও নিয়োগ প্রক্রিয়ার অনুমোদন দিয়েছে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। আইডিআরএ’র নিয়োগ অনুমোদনপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে কাজিম উদ্দিনকে নিয়োগ প্রদানের জন্য প্রথমবার ২০২০ সালের নভেম্বর মাসে আইডিআরএ আবেদন করে ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স কর্তৃপক্ষ।
তাদের এ আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০২০ সালের ১ নভেম্বর থেকে পরবর্তী তিন বছরের জন্য প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে তাকে নিয়োগ প্রদান করে আইডিআরএ। এরপর থেকে তিনি ধারাবাহিক ভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। এ নিয়োগের পেছনে নেপথ্যে ছিলেন ন্যাশনাল লাইফ ইন্সুরেন্সের চেয়ারম্যান মোরশেদ আলম।
মুলত মোরশেদ আলমের শত শত কোটি টাকা আত্মসাতের মুল কারিগর কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) কাজিম উদ্দিন। এখন তিনি ধরাকে সরা জ্ঞান করে চলছেন। ফলে গ্রাহকের আমানতের টাকা ইচ্ছে মতো হরিলুট করেন ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির চেয়ারম্যান মোরশেদ আলম। এ কাজে সহযোগিতা করছেন খোদ কোম্পানিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো: কাজিম উদ্দিন। আওয়ামী টিকিটে এমপি হয়ে পেয়ে যান হরিলুটের ব্ল্যাঙ্ক চেক।
এদিকে এজেন্ট কমিশন, ইনসেন্টিভ ও অ্যালাউন্সের নামে ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স’র তহবিল থেকে ৭শ’ ১৮ কোটি টাকার বেশি আত্মসাৎ করা হয়েছে। আর এ আত্মসাতে ব্যবহার করা হয়েছে অন্তত ২ হাজার ১০০ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট। শেখ হাসিনার শাসনামলের শেষ ৬ বছরে আর্থিক খাতে নৈরাজ্যের সুযোগে হাতিয়ে নেয়া হয়েছে এ অর্থ। এর মধ্যে ২০১২-২০১৪ সালে ৩শ’ কোটি টাকা এবং ২০১৮-২০২০ সালে ৪১৭ কোটি টাকা নগদ হাতিয়ে নেয়া হয়। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক)র তদন্তে উদঘাটিত হয়েছে এসব তথ্য।
তদন্তকালীন রেকর্ডপত্র বলছে, বেতন-ভাতাসহ কমিশনের টাকা নগদ লেনদেনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ২০১২ সালে-ই সার্কুলার জারি করে বীমা উন্নয়ন নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ। কর্তৃপক্ষের এ নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে বছরের পর বছর এজেন্ট কমিশনসহ ইনসেন্টিভ ও অ্যালাউয়েন্সের অর্থ নগদ লেনদেন করে ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্সের কোম্পানি (এনএলআইসি) তৎকালিন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ।
তবে প্রতিষ্ঠানটির দাবি, দেশের প্রান্তিক পর্যায়ে স্বল্প আয়ের বীমা এজেন্টরা ব্যাংক হিসাব খুলে ন্যূনতম কমিশন গ্রহণে আগ্রহী নন। তাই কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ছিল না। কোম্পানির ব্যবসা সচল রাখার জন্য এজেন্ট কমিশনসহ ইনসেনটিভ ও অ্যালাউয়েন্সের টাকা সংশ্লিষ্ট জোন অফিস থেকে মাঠকর্মীদের নগদে পরিশোধ করা হয়েছে।
ভুয়া ভাউচারে ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্সের শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ ও অবৈধ স্থানান্তর, হস্তান্তর তথা মানিলন্ডারিংয়ের এ চিত্র ধরা পড়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি মামলার তদন্তে। গত ৪ মে সংস্থাটির উপ-পরিচালক শেখ গোলাম মাওলা মামলাটি দায়ের করেন। মামলায় আওয়ামী সরকারের সাবেক এমপি মোরশেদ আলম, তার ভাই ও এফবিসিসিআই’র সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ জসিমউদ্দিন, মোরশেদ আলমের ছেলে ‘বেঙ্গল কনসেপ্ট অ্যান্ড হোল্ডিংস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুল আলমকে আসামি করা হয়।
গ্রাহকের অর্থে প্রকৃত মূল্য গোপন করে অস্বাভাবিক মূল্যে ন্যাশনাল লাইফের নামে সম্পত্তি ক্রয়ের মাধ্যমে ২ কোটি ৮৬ লাখ ৬ হাজার ১৪৫ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয় মামলা। তবে মামলাটির তদন্তে বেরিয়ে আসছে কেঁচো খুড়তে সাপ। তবে এসব ঘটনায় ন্যাশনাল লাইফ ইন্সুরেন্সে কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) কাজিম উদ্দিন জড়িত বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। কাজিম উদ্দিন দায়িত্বভার গ্রহণ করে কোম্পানির ভিতরে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট ও নিজস্ব বলয় সৃষ্টি করেন।
এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তিনি বহু জাল-জালিয়াতি, বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে নানাবিধ খাত থেকে বছরের পর বছর কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করে আসছেন বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে। এছাড়া তিনি আওয়ামী সরকারের সাবেক এমপি ও কোম্পানিটির চেয়ারম্যান মোরশেদ আলমের ঘনিষ্ট লোক বলে পরিচিত ছিলেন। এদিকে তদন্তে প্রাপ্ত নথিতে দেখা যায়, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির ওপর একটি বিশেষ অডিট পরিচালনা করে।
২০১২-২০১৪ সালের ব্যবসার ওপর ‘হাওলাদার ইউনুস অ্যান্ড কোং’ এবং ২০১৮-২০২০ সালে ওপর ‘একনাবিন চার্টার্ড একাউন্ট্যান্টস’ এ অডিট পরিচালনা করে। অডিট রিপোর্টে দেখা যায়, কোম্পানিটি মাত্র তিন বছরে কমিশন, ইনসেন্টিভ ও অ্যালাউন্স বাবদ উত্তোলন করে ৪শ’ ১৭ কোটি ৩২ লাখ টাকা। এটি শুধু বীমা আইনেরই লঙ্ঘন নয়-সুষ্পষ্টই জালিয়াতি, প্রতারণা, আত্মসাৎ এবং মানিলন্ডারিং আইনেরও গুরুতর লঙ্ঘন।
অডিটের তথ্য মতে, ২০২০ সালে কোম্পানিটি প্রিমিয়াম সংগ্রহের জন্য ১৫৪ কোটি ৭৩ লাখ টাকা নগদ পরিশোধ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম বছর কমিশন বাবদ কথিত এজেন্টদের শোধ করা হয়েছে ৮৪ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। ব্রাঞ্চ কো-অডিনেটর ও ডিস্ট্রিক্ট কো-অর্ডিনেটরদের কমিশন ও অ্যালাউয়েন্স ‘পরিশোধ’ দেখানো হয়েছে ৭০ কোটি টাকা।
এর আগে ২০১৯ সালে প্রিমিয়াম সংগ্রহের জন্য কমিশন বাবদ ১৪৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা নগদ পরিশোধ করে কোম্পানিটি। এর মধ্যে প্রথম বছর কমিশন ও ইনসেন্টিভ পরিশোধ দেখানো হয় ৬৬ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। ব্রাঞ্চ কো-অডিনেটর, ডিস্ট্রিক্ট কো-অর্ডিনেটরদের কমিশন ও অ্যালাউন্স দেয়া হয় ৮০ কোটি ৭২ লাখ টাকা।
একইভাবে ২০১৮ সালে ‘এজেন্ট কমিশনৎ বাবদ ‘নগদে পরিশোধ’ দেখানো হয় ১শ’ ১৫ কোটি ৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে প্রথম বছর কমিশন ও ইনসেন্টিভ দেয়া হয়েছে ৬২ কোটি ৫১ লাখ টাকা। ব্রাঞ্চ কো-অডিনেটর, ডিস্ট্রিক্ট কো-অর্ডিনেটরদের কমিশন ও অ্যালাউয়ন্স পরিশোধ দেখানো হয় ৫২ কোটি ৫২ লাখ টাকা।
‘হাওলাদার ইউনুস অ্যান্ড কোং’ অডিট হয় ২০১২ থেকে ২০১৪ সালের ওপর। এ তিন বছর ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স ব্যবসা সংগ্রহের জন্য এজেন্ট কমিশন, অ্যালাউন্স, কমিশন ও ইনসেন্টিভ বাবদ নগদে পরিশোধ করেছে ৩শ’ কোটি টাকার বেশি। প্রতিষ্ঠানটি ২০১৪ সালে নগদের পরিশোধ করেছে ১০১ কোটি ৯৬ লাখ টাকা।
এর মধ্যে প্রথম বর্ষ কমিশন ও ইনসেন্টিভ দেয়া হয় ৮৭ কোটি ৫ লাখ টাকা এবং ইউএম, বিএম ও ডিসি’দের কমিশন ও অ্যালউয়ন্স নগদ পরিশোধ করা হয় ১৪ কোটি ৯১ লাখ টাকা। এর আগে ২০১৩ সালে এনএলআইসি নগদ লেনদেন করে ১০৬ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে প্রথম বছর কমিশন ও ইনসেন্টিভ দেয়া হয় ৯২ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। ইউএম, বিএম ও ডিসি’দের কমিশন ও অ্যালাউন্স বাবদ নগদে পরিশোধ করা হয ১৪ কোটি ৫১ লাখ টাকা।
একইভাবে ২০১২ সালে কোম্পানিটি এজেন্ট কমিশন ও অ্যালাউন্স বাবদ ‘নগদ পরিশোধ’ করা হয় ৯১ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে প্রথম বর্ষ কমিশন ও ইনসেন্টিভ দেয়া হয়েছে ৭৬ কোটি ৪২ লাখ টাকা। ব্রাঞ্চ কো-অডিনেটর ও ডিস্ট্রিক্ট কো-অর্ডিনেটরদের দেয়া হয়েছে ১৫ কোটি ৩৭ লাখ টাকা।
এ অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় লেনদেনের কারণে এনএলআইসিকে তেমন কোনো শাস্তি পেতে হয়নি। আইডিআর’র তার বীমা আইন-২০১০ এর ১৩০ ধারা অনুযায়ী নামমাত্র অর্থদণ্ড করেছে মাত্র। আর মধ্য দিয়ে এনএলআইসি’র কর্তাব্যক্তিদের শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ,জালিয়াতি, প্রতারণা ও অর্থ পাচারের অপরাধকে আড়াল করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে সংঘঠিত অনিয়মের বিষয়ে জানতে ন্যাশনাল লাইফ ইন্সুরেন্সের মুখনির্বাহী কর্মকর্তা কাজী কাজিম উদ্দিনকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
অপরাধ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মহাপরিচালক (লিগ্যাল) মো: মঈদুল ইসলাম বলেন, যত বড় অর্থ আত্মসাৎ কিংবা পাচারের ঘটনাই ঘটুক, বীমা আইনে এর প্রতিকার নেই। প্রতিকার রয়েছে প্যানাল কোড, দুদক আইন-২০০৪ এবং মানিলন্ডারিং আইনে। ফলে সংশ্লিষ্ট আইনেই এ ঘটনার মামলা দায়ের, তদন্ত এবং চার্জশিট দিতে হবে। মূল অপরাধ ধামাচাপা দিতে কৌশলে অনেক সময় দুর্বল প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে দুর্বল আইনে মামলা করা। এনএলআইসি’র ক্ষেত্রে সে চাতুর্য লক্ষ্য করা যায়।
দুদকের মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) মো: আকতার হোসেন বলেন, অস্বাভাবিক মূল্যে সম্পত্তি ক্রয়, বিভিন্ন ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে ন্যাশনাল লাইফ থেকে শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ এবং পাচারের প্রমাণাদি মিলছে তদন্তে। তদন্ত কর্মকর্তা ইতোমধ্যেই প্রতিষ্ঠানটির বহু রেকর্ডপত্র সংগ্রহ করেছেন। প্রাথমিক এজাহারে তিন জনের সম্পৃক্ততার উল্লেখ থাকলেও রেকর্ডপত্রে মোরশেদ আলম নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক, পরিচালনা পরিষদের অন্যান্য সদস্যের সম্পৃক্ততা মিলছে। ফলে তদন্ত প্রতিবেদনে আরও কিছু ধারা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
এদিকে আইডিআরএর কাছে নিয়োগপত্রের অনুমোদনের জন্য দাখিল করা কাজিম উদ্দিনের জীবন বৃত্তান্তসহ সংশ্লিষ্ট সব কাগজপত্রাদি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ১৯৮৪ সালে কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার কাকৈরতলা উচ্চবিদ্যালয় থেকে ব্যবসায় শিক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগ পেয়ে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি। এরপর জেলা শহরের নবাব ফয়জুন্নেসা সরকারি মহাবিদ্যালয় থেকে ১৯৮৬ সালে ব্যবসায় শিক্ষা থেকে দ্বিতীয় বিভাগ পেয়ে উচ্চ মাধ্যমিক উত্তীর্ণ হন।
কাজিম উদ্দিন ১৯৮৬ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর দীর্ঘ ৩২ বছরের ব্যবধানে বন্ধ থাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আলাদিনের চেরাগের মত ২০১৮ সালে বিবিএ এবং ২০১৯ সালে এমবিএ পাসের সার্টিফিকেট আবিষ্কার করেন! কোম্পানির সিইও পদে নিয়োগ লাভের সময় আইডিআরএতে উচ্চশিক্ষার সনদপত্র হিসেবেও তিনি দাখিল করেছেন অনুমোদনহীন কথিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাওয়া এই বিবিএ ও এমবিএর সনদ।
দৈনিক দেশ প্রতিক্ষণের এর হাতে আসা কাজিম উদ্দিনের সনদ অনুযায়ী, ২০১৮ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় দ্য ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লা থেকে সিজিপিএ ৩.৩৫ পেয়ে চার বছর মেয়াদি বিবিএ সম্পন্ন করেন। এছাড়া একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরের বছর ২০১৯ সালে সিজিপিএ ৩.৪৩ পেয়ে একবছর মেয়াদি এমবিএ সম্পন্ন করেন। তার সবকটি সনদ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, উচ্চমাধ্যমিক পাসের পর কথিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ সনদ প্রাপ্তির মধ্যে সময়ের ব্যবধান দীর্ঘ ৩২ বছর।
বিশ্ববিদ্যালয়টির অনুমোদন আছে কি না এমন তথ্য অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা যায়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন অমান্য, প্রাশসনিক অব্যস্থাপনা, অর্থনৈতিক অস্বচ্ছতা এবং মানহীন শিক্ষাব্যবস্থার কারণে ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষাকার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করে ইউজিসি। পরবর্তীতে সরকার কর্তৃক বন্ধ আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। যার রিট পিটিশন নং- ১৬৭১/২০১৪। এরও প্রায় একদশক পর আদালতের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি পেলেও নানান জটিলতার কারণে এখনো অনুমতি মেলেনি ইউজিসির। যার দরুণ অদ্যাবধি স্থগিত রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষা কার্যক্রম।
জানা যায়, দ্যা ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লা (ইউএনআইসি) সরকারের অনুমোদন লাভ করে ১৯৯৫ সালে। তবে নানা অনিয়মের কারণে ২০০৬ সালের ২২ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়টির কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করে সরকার। দ্যা ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লা থেকে নেয়া কাজিম উদ্দিনের বিবিএ ও এমবিএ’র সনদটির বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগের উপ-পরিচালক ড. মো. মহিবুল আহসান বলেন, দ্যা ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লার একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হয়নি। আর যে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হয়নি তার সনদ কেমন হবে সেটাতো বোঝাই যাচ্ছে।
বিমা খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ন্যাশনাল লাইফ দেশের শীর্ষস্থানীয় লাইফ বীমা কোম্পানি। যেখানে দেশের লাখ লাখ মানুষের আমানত রক্ষিত। এ ধরণের একটি কোম্পানির মুখ্য নির্বাহীর পদে ভুয়া সনদ দিয়ে নিয়োগ কোন ভাবেই কাম্য নয়। এ ধরণের কর্মকান্ডে সরকারের উচিত বিষয়টি সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া। অন্যথায় তা হবে বীমাখাতে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নের অন্তরায়। সূত্র: দৈনিক দেশ প্রতিক্ষণ

