বিশেষ প্রতিনিধি, শেয়ারবার্তা ২৪ ডটকম, ঢাকা: যমুনা ব্যাংক ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের বিরুদ্ধে শেয়ার পার্কিং, গ্রাহকদের অতিরিক্ত ক্রয়ক্ষমতা দেখানো, শেয়ার না কিনেই অর্থ উত্তোলন, মার্জিন হিসাবে নন-মার্জিন শেয়ার কেনা এবং লেনদেন ব্যবস্থার সফটওয়্যারে অনুমোদন ছাড়া পরিবর্তনের মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ফলে ব্রোকারেজ হাউজটির বিরুদ্ধে নানা ধরনের আর্থিক অনিয়মের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে কঠোর তদন্তের মুখে পড়েছে।

এমনকি একাধিক অনিয়মের অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। সম্প্রতি কমিশনের মার্কেট ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশন থেকে এ-সংক্রান্ত তদন্তের আদেশ জারি করা হয়েছে বলে জানা গেছে বিএসইসি সূত্রে।

সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষার্থে শেয়ারবাজারে মধ্যস্থতাকারী এই প্রতিষ্ঠানের সার্বিক কার্যক্রম খতিয়ে দেখতে এ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ১২ জুলাই ও ১৮ আগস্ট পৃথক দুটি অভিযোগ পায় কমিশন। সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অধ্যাদেশ ১৯৬৯-এর সেকশন ২১ এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন ১৯৯৩-এর ধারা ১৭(ক)-এর প্রদত্ত ক্ষমতাবলে ব্রোকারেজ হাউজটির বিরুদ্ধে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তিন কর্মকর্তাকে।

বিএসইসির নির্দেশনায় গঠিত এই তিন সদস্যের তদন্ত কমিটির সদস্যরা হলেন: কমিশনের অতিরিক্ত পরিচালক মুহাম্মদ আল মাসুম মৃধা, সহকারী পরিচালক সৌরভ মল্লিক এবং মো. মারুফ হাসান। নবগঠিত এই কমিটিকে তদন্তকাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করে ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে কমিশনের কাছে একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিএসইসি মনে করে, পুঁজিবাজারের সার্বিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বৃহত্তর স্বার্থ সুরক্ষায় যমুনা ব্যাংক ক্যাপিটালের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে একটি স্বচ্ছ তদন্ত পরিচালনা করা প্রয়োজন।
তদন্তের আদেশে বিস্তারিতভাবে বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। যমুনা ব্যাংক ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টের গ্রাহকদের মার্জিন ঋণসুবিধা প্রদান, ঋণ হিসাব পরিচালনা, গ্রাহক কোড ব্যবস্থাপনা এবং ঋণাত্মক গ্রাহক কোড ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন, বিধিবিধান, বিএসইসির নির্দেশনা ও নিজস্ব নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করবে কমিটি।

এ ছাড়া স্পনসর বা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিক্রয়ে নিষেধাজ্ঞায় থাকা শেয়ারের বিপরীতে গ্রাহকদের সুবিধা দেওয়া, গ্রাহকদের হিসাবের অতিরিক্ত ক্রয়ক্ষমতা দেখানো, বাজারদরের ভিত্তিতে সেই ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো এবং শেয়ার না কিনেই অর্থ উত্তোলনের মতো অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হবে। অন্যদিকে, ঋণাত্মক স্থিতিতে থাকা হিসাবে লেনদেন করা, এই সুবিধার আওতায় কেনার অনুপযোগী শেয়ার কেনা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অপব্যবহারের ধরন ও পরিধি নির্ধারণ করবে কমিটি।

বীচ হ্যাচারি, মিডল্যান্ড ব্যাংক, রাঙামাটি ফুড প্রোডাক্টস, ফরচুন সুজ, আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজ, আলিফ ম্যানুফ্যাকচারিং এবং সিমটেক্সসহ সংশ্লিষ্ট শেয়ার ও গ্রাহক কোডের লেনদেন তদন্তের আওতায় থাকবে। এসব লেনদেনে শেয়ার পার্কিং, সম্ভাব্য বাজার কারসাজি, উচ্চমূল্যে শেয়ার কেনা এবং প্লেসমেন্ট শেয়ার বরাদ্দ, বিপণন ও বিক্রয় প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। পাশাপাশি কমিশন গ্রহণ, অবৈধ আর্থিক সুবিধা অর্জন, অর্থ উত্তোলন এবং অতিরিক্ত ক্রয়ক্ষমতা ব্যবহারের মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও যাচাই করবে তদন্ত কমিটি। পরীক্ষা করা হবে সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের তথ্য-উপাত্ত।

প্রতিষ্ঠানটির সফটওয়্যার, তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থা, লেনদেন ব্যবস্থা বা অন্যান্য প্রযুক্তিগত ব্যবস্থায় অনুমোদন ছাড়া কোনো পরিবর্তন বা কারসাজি করা হয়েছিল কি না তাও তদন্তের আওতায় থাকবে। অনিয়মের মাধ্যমে গ্রাহকদের অতিরিক্ত সুবিধা, শেয়ার লেনদেন বা অর্থ উত্তোলনের সুযোগ তৈরি করা হয়েছিল কি না তা যাচাই করা হবে। অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা কর্তৃপক্ষের ভূমিকা, তদারকি ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং নিজস্ব তদন্তে কোনো দায় ছিল কি না, তা যাচাই করবে কমিটি।

পাশাপাশি এসব ঘটনায় প্রতিষ্ঠান, গ্রাহক বা শেয়ারবাজারের আর্থিক কিংবা নিয়ন্ত্রক ক্ষতি হয়েছে কি না এবং তদন্তে নতুন কোনো অনিয়ম সামনে এলে তার সত্যতা ও আইন লঙ্ঘনের বিষয়ও খতিয়ে দেখা হবে।