পুঁজিবাজারে তালিকা-বহির্ভূত কোম্পানিও বিএসইসির নজরদারিতে আনছে
স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, শেয়ারবার্তা ২৪ ডটকম, ঢাকা: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত নয়, অথচ জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট কোম্পানি হিসেবে দেশের বাজারে ব্যবসা করছে এমন কোম্পানিগুলোকে বিধি অনুসরণ করে তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এই লক্ষ্যে করা হচ্ছে পাবলিক ইন্টারেস্ট কোম্পানি বা পিআইসি বিধিমালা। এই বিধিমালায় পাবলিক কিংবা প্রাইভেট, কোম্পানির ধরন যেমনই হোক না কেন, একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির বাইরে এলেই সেটি পিআইসি হিসেবে গণ্য হবে। আর পিআইসিভুক্ত হলেই নিয়মিত কোম্পানির জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে। পাশাপাশি কোম্পানির মালিকানা দেশের জনসাধারণের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিতে হবে।
প্রস্তাবিত খসড়া বিধিমালায় কিছু প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট কোম্পানি হিসেবে চিহ্নিত করার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে: ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বীমা কোম্পানি, পুঁজিবাজারের ব্রোকার, ডিলার ও মার্চেন্ট ব্যাংক এবং পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত সব কোম্পানি। এ ছাড়া নির্দিষ্ট আর্থিক সীমা অতিক্রম করলে অন্যান্য প্রাইভেট ও পাবলিক কোম্পানিগুলোকেও পিআইসি হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
বিএসইসি সূত্রে জানা গেছে, কোনো পাবলিক কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন পাঁচ কোটি টাকার বেশি হলে অথবা প্রাইভেট কোম্পানির মূলধন ১৫ কোটি টাকার বেশি হলে কিংবা ওই কোম্পানির বার্ষিক আয় ১০০ কোটি টাকার বেশি হলে বা ব্যাংকসহ অন্যান্য উৎস থেকে ২০ কোটি টাকার বেশি ঋণ নিলে কোম্পানিটিকে পিআইসি হিসেবে গণ্য করা হতে পারে। বেসরকারি মালিকানাধীন কোম্পানিও এসব শর্ত পূরণ করলে নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আওতায় পিআইসিভুক্ত হবে। পরে অন্যান্য শর্ত পরিপালন করে জনসাধারণের কাছে শেয়ার ছেড়ে দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে হবে।
প্রস্তাবিত বিধিমালায় কোম্পানির আকার অনুযায়ী মূলধন সংগ্রহের পদ্ধতিও নির্ধারণ করা থাকবে। এতে বড় আকারের কোম্পানিগুলোকে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহে উৎসাহিত করা হবে। আর ছোট ও মাঝারি আকারের কোম্পানিগুলো যোগ্য বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে কোয়ালিফায়েড ইনভেস্টর অফারের (কিআইও) মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন করবে। এ ছাড়া শর্ত সাপেক্ষে ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের (সরাসরি তালিকাভুক্ত) ব্যবস্থাও থাকবে।
আর প্রাইভেট প্লেসমেন্টের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা সর্বোচ্চ ২০ জনে সীমাবদ্ধ রাখার প্রস্তাব রয়েছে, যাতে অনানুষ্ঠানিকভাবে জনসাধারণের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের প্রবণতা বন্ধ হয়। খসড়া অনুযায়ী, কোনো কোম্পানি পিআইসিভুক্ত হলে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার আগে তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রেও পিআইসি বিধিমালা অনুসরণ করতে। এক্ষেত্রে পিআইসি হিসেবে চিহ্নিত কোম্পানিগুলোকে নিয়মিতভাবে আর্থিক প্রতিবেদন, পরিচালনা পর্ষদের তথ্য ও বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে।
প্রতিটি কোম্পানিকে নিজস্ব ওয়েবসাইট চালু রাখতে হবে এবং সেখানে প্রয়োজনীয় তথ্য হালনাগাদ রাখতে হবে। ওই ওয়েবসাইটকে আরজেএসসির ডাটাবেজের সঙ্গে সংযুক্ত করার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখছে কমিশন। এ ছাড়া পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়াকে সহজ ও দ্রুত করতে ডিজিটাল অনুমোদন ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করছে বিএসইসি। এতে কোম্পানিগুলো অনলাইনে আবেদন করে দ্রুত অনুমোদন পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কমিশন মনে করছে, কোম্পানিগুলো যদি ব্যাংক থেকে অর্থ নেয়, সেটিও অনানুষ্ঠানিকভাবে জনসাধারণের থেকেই নেওয়া হচ্ছে। নতুন বিধিমালা কার্যকর হলে ব্যাংক ঋণ কমে আসবে এবং পিআইসিভক্ত হলে জনসাধারণের থেকে আনুষ্ঠিকভাবে অর্থ নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করতে হবে। এক্ষেত্রে কোম্পানির সক্ষমতা যাচাই করেই শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার অনুমোদন দেবে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।
এদিকে নতুন বিধিমালার আওতায় তালিকাবহির্ভূত কোম্পানিগুলো শুধু রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মস (আরজেএসসি)-এর অনুমোদন সাপেক্ষে মূলধন বাড়াতে পারবে না। কোনো তালিকা-বহির্ভূত কোম্পানি তার পরিশোধিত মূলধন বাড়াতে চাইলে আরজেএসসির পাশাপাশি বিএসইসিরও অনুমোদন নিতে হবে। বর্তমানে ২০১৯ সালে দেওয়া একটি বিশেষ ছাড়ের ফলে তালিকাভুক্ত নয় এমন কোম্পানিগুলো কমিশনের অনুমোদন ছাড়াই মূলধন সংগ্রহ করতে পারছে। এতে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত নয় এমন কোম্পানিগুলো নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির সরাসরি তদারকির বাইরে চলে যাচ্ছে।
কমিশন নতুন এই বিধিমালায় ২০১৯ সালের ওই বিশেষ ছাড় রহিত করে পুনরায় মূলধন সংগ্রহে আরজেএসসির পাশাপাশি বিএসইসির অনুমোদন নেওয়ার বিধান যুক্ত করতে যাচ্ছে। এতে মূলধন কাঠামো ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানোর প্রবণতা কমার পাশাপাশি অর্থ ছাড়া প্লেসমেন্ট শেয়ার ইস্যুর ঘটনার পুনরাবৃত্তি বন্ধ হবে বলে মনে করছে কমিশন।
বিধিমালার বিষয়ে বিএসইসির একজন পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বহুজাতিক কোম্পানি, সরকারি কোম্পানি এবং দেশীয় প্রাইভেট-পাবলিক ভালো কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্ত করতে আমরা আমাদের ইশতেহার অনুযায়ী কাজ করে যাচ্ছি। এরই ধারাবাহিকতায় জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে আনতে পিআইসি সংক্রান্ত একটি বিধিমালা করতে কাজ করছে কমিশন। এই বিধিমালায় তালিকা-বহির্ভূত কোম্পানিগুলো একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আসলেই বিধি অনুসরণ করে জনগণের সঙ্গে মালিকানা ভাগাভাগি করতে হবে।
এক্ষেত্রে আইপিও কিংবা যোগ্য বিনিয়োগকারীদের কাছে শেয়ার ইস্যু করতে হবে অথবা ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ে আসতে হবে। তিনি আরো বলেন, নতুন বিধিমালা কার্যকর হলে কোম্পানির মূলধন, এর বার্ষিক আয় এবং ঋণের পরিমাণ মূল্যায়নে বাধ্যতামূলক পিআইসির কলস অনুসরণ করতে হবে। কোম্পানির মূলধন বাড়াতে আরজেএসসির পাশাপাশি বিএসইসিরও অনুমোদন নিতে হবে।
এ ছাড়া বোর্ডে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দিতে হবে। নিয়মিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে। নিজস্ব ওয়েবসাইট থাকতে হবে, যেখানে পাবিলিক ইন্টারেস্ট বিষয়গুলো জানাতে হবে। আর ওই ওয়েবসাইট আরজেএসসির সঙ্গে লিংক আকারে যুক্ত থাকতে হবে। নতুন বিধিমালায় এমনসব গভর্নেন্স মানতে হবে তালিকা-বহির্ভূত কোম্পানিগুলোকে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে পুঁজিবাজারে ভালো কোম্পানির সংখ্যা বাড়বে এবং বাজারে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি কোম্পানিগুলোর দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নে এটি ব্যাংক নির্ভরতা কমিয়ে পুঁজিবাজারের গুরুত্ব বাড়াতে সহয়তা করবে
এ বিষয়ে পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. আল-আমিন বলেন, পিআইসি বিধিমালা নিঃসন্দেহে একটি ভালো উদ্যোগ। বিভিন্ন দেশে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন পুঁজিবাজারের মাধ্যমে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি উভয় অর্থায়নই ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে হয়। পিআইসি বিধিমালাটি বাস্তবায়ন হলে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নে ব্যাংক নির্ভরতা কমে আসবে।
তিনি আরও বলেন, কোম্পানি পিআইসিভুক্ত হলেই পুঁজিবাজারে বাধ্যতামূলক তালিকাভুক্ত করা যাবে না। কোম্পানিটি কত বছর ধরে ব্যবসা করছে? আর্থিক ভিত্তি কতটা শক্তিশালী? সবকিছু মূল্যায়ন করেই বাজারে আনতে হবে। যেহেতু, অনেক ভালো কোম্পানি পুঁজিবাজারে আসতে চায় না, সেগুলোকে আনতে পিআইসি বিধিমালাটি ভালো কাজ করতে পারে।
তবে বিধিমালাটি চূড়ান্ত করার আগে ইস্যুয়ার কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে নিলে ভালো ফল দিবে বলে মনে করেন বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) সাধারণ সম্পাদক ও এমটিবি ক্যাপিটাল লিমিটেডের সিইও সুমিত পোদ্দার। তিনি বলেন, পিআইসিভুক্ত মৌলভিত্তি সম্পন্ন কোম্পানিগুলোকে যদি পুঁজিবাজার থেকে অর্থ নিতে উৎসাহিত করা যায়, সেটি অবশ্যই বাজারে দীর্ঘমেয়াদে ভালো ফল বয়ে আনবে।
এক্ষেত্রে বিধিমালা করার আগে দেখতে হবে যে সেটি ইস্যুয়ারবান্ধব (তালিকাভুক্ত হতে আগ্রহী কোম্পানির জন্য উপযুক্ত) হচ্ছে কীনা? প্রয়োজনে বড় ইস্যুয়ার কোম্পানিগুলোর সঙ্গে ডায়লগ (আলোচনা) করে বিধিমালাটি চূড়ান্ত করা উচিত। যেহেতু ইস্যুয়ার কোম্পানির জন্য বিধিমালাটি করা হচ্ছে, সেহেতু তাদের কোন কোন বিষয়গুলোতে সমস্যা হতে পারে, এসব বিষয় পূর্বে আলোচনা করে নিলে ভালো ফল পাওয়া যাবে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম বলেন, পিআইসি বিধিমালাটি এরই মধ্যে কমিশন সভায় প্রস্তাব আকারে উত্থাপিত হয়েছে। এটি চূড়ান্ত করতে এখনো কিছু কাজ বাকি আছে। বিভিন্ন পক্ষের মতামত নিয়ে বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে। শিগগিরই জনমত আহ্বানের জন্য বিএসইসির ওয়েবসাইট ও পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হবে। আশা করছি, সবার মতামত নিয়ে বিধিমালাটি চূড়ান্ত করা হলে তালিকাবহির্ভূত কোম্পানিগুলো একটি কাঠামোর মধ্য দিয়ে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে আগ্রহী হবেন।

