সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক ভাঙার গুঞ্জন নাকচ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের
শেয়ারবার্তা ২৪ ডটকম, ঢাকা: দেশের সমস্যাগ্রস্ত দুর্বল একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংক আপাতত পৃথক হচ্ছে না। এই সম্মিলিত ব্যাংক ভেঙে আগের মতো পাঁচটি পৃথক ব্যাংক হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছেন খোদ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান। তবে গ্রাহকদের স্বার্থ সুরক্ষা, আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং পরিচালনাগত দক্ষতা বাড়ানোর লক্ষ্যেই বহাল রাখা হয়েছে এই সিদ্ধান্ত। তবে চাইলে এ সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারে সরকার।
রোববার একীভূত প্রক্রিয়ার অধীনে থাকা পাঁচটি ব্যাংক একীভূত হচ্ছে এমন গুঞ্জনের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. আরিফ হোসেন খান গুঞ্জন নাকচ করে দেন।
তার ভাষ্য, পাঁচ ব্যাংক কৌশলগত পার্টনার নিয়োগ করা হবে, একরকম ধোঁয়াশার মধ্যে সংশ্লিষ্ট ডিপার্টমেন্টের সঙ্গে আজকে কথা বলেছি আমি। বর্তমান অবস্থান থেকে আগের অবস্থান থেকে এখনো ফিরে আসার সংকেত বা প্রসেস তৈরি হয়নি। যদিও একটি ব্যাংক এরই মধ্যে পৃথক হতে আবেদন করেছে। হয়তো আবেদনের অপেক্ষা আছে আরেকটি ব্যাংক।
তিনি উল্লেখ করেন, একীভূতের মাধ্যমে পাঁচ ব্যাংকের মালিকানা রয়েছে সরকারের হাতে। এখন সরকার বলছে, আমরা স্থায়ীভাবে এর মালিকানা গ্রহণ করিনি। আমরা সাময়িকভাবে এই পাঁচটি ব্যাংকের যারা আমানতকারী, তাদের ব্রিথিং স্পেস দেওয়ার উদ্দেশ্যে এবং এর স্বাস্থ্য ভালো করার জন্য প্রকৃত ইনভেস্টরদের হাতে প্রাইভেট সেক্টরে আবারও একীভূত পাঁচ ব্যাংককে ছেড়ে দেব। এখন সরকারি মালিকানা আসার পর গুরুত্বপূর্ণ কোনো ডেভেলপমেন্ট দৃশ্যমান হয়নি। ফলে এখনই বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই। তারপরও যদি কোনো ইনভেস্টর আসেন, অবশ্যই সেটা বাংলাদেশ ব্যাংক দেখবে, সরকার দেখবে।
‘যে পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করা হলো স্বাভাবিকভাবেই ব্যাংকগুলোর যারা আগে উদ্যোক্তা পরিচালক ছিলেন তারা এটার মালিকানায় ফিরতে চাইবেন, এটা স্বাভাবিক। তার মানে সাড়ে ৭ শতাংশ শেয়ারের জন্য ডাউন পেমেন্ট দিয়ে তাদের আবারও মালিকানা ফেরত পাওয়ার দাবি করার সুযোগ রয়েছে।
এর অর্থ এই না যে, কেউ সাড়ে ৭ শতাংশ দেওয়া মাত্রই তার মালিকানা ফেরত পাবেন। এটা হলো তার সূচনা। তারপর পরিচালক হিসেবে অন্তর্ভুক্তির জন্য যে প্রসেস, বাংলাদেশ ব্যাংক ফলো করে তাদের সেসব ক্ষেত্রে উত্তীর্ণ হলেই শুধু তারা পরিচালক হিসেবে অন্তর্ভুক্তির সুযোগ রয়েছে।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রটি জানায়, একীভূতকরণের প্রক্রিয়ায় থাকা পাঁচ ব্যাংকে এরই মধ্যে ঘাটতি দেখা দিয়েছে বড় ধরনের মূলধন। এজন্য নতুন ব্যাংকের মূলধন হচ্ছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার দেবে ২০ হাজার কোটি টাকা।
এ ছাড়া ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের চাঁদার টাকায় গড়ে ওঠা বাংলাদেশ ব্যাংকের আমানত বীমা তহবিল থেকে সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকা শেয়ারে রূপান্তরিত হবে। বাকি সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকা ব্যাংকগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকে শেয়ারে রূপান্তর করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ ব্যাংকের সম্মিলিত আমানত ১ লাখ ৯৩ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা। সম্মিলিত খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা, যা ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় ৭৭ শতাংশ। বিপুল অঙ্কের এ খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকগুলোর নিরাপত্তা সঞ্চিতিতে ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৪ হাজার ৫০১ কোটি টাকা।
পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে শতাংশের হিসাবে সর্বোচ্চ ৯৮ শতাংশ ঋণ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে ইউনিয়ন ব্যাংকে। এই হার ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে ৯৬ শতাংশ, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে ৯৫ শতাংশ, সোশ্যাল ইসলামী শরিয়ায় ৬২ শতাংশ ও এক্সিম ব্যাংকে ৪৮ শতাংশ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, একীভূত অবস্থায় পরিচালনার ফলে ব্যয় সাশ্রয়, সম্পদের কার্যকর ব্যবহার এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সহজ হচ্ছে। পাশাপাশি গ্রাহকদের আমানত ও বিনিয়োগ সুরক্ষিত রাখতেও রাখছে সহায়ক ভূমিকা। তবে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছেন, দীর্ঘ মেয়াদে এই একীভূত কাঠামো কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে সুশাসন নিশ্চিত করা, স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার ওপর।
তথ্য বলছে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের মেয়াদে অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে সমস্যায় পড়া পাঁচটি ইসলামী ধারার ব্যাংক একীভূত করার উদ্যোগ নেয় সরকার। এই পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়। সেটির জন্য প্রাথমিকভাবে ২০ হাজার কোটি টাকা মূলধন জোগান দেয় সরকার। তবে নতুন এই ব্যাংকের মূলধন হবে ৩৫ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের সবচেয়ে বড় ব্যাংক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে।
বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন অর্থনীতি বিশ্লেষক মো. মাজেদুল হক। তিনি মনে করেন, সরকার এরই মধ্যে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে সহায়তায় বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ দিলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। তার মতে, আস্থা সংকট কাটাতে হলে স্বচ্ছ ও সক্ষম উদ্যোক্তাদের হাতে ব্যাংক পরিচালনার দায়িত্ব দিতে হবে এবং দ্রুত নীতিগত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো জরুরি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক একীভূত প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত একাধিক কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, একীভূত ইসলামী ব্যাংকগুলোর মালিকানা স্থায়ীভাবে সরকারের হাতে রাখার পরিকল্পনা নেই। তবে বেসরকারি খাতে হস্তান্তরের আগে ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থার উন্নতি নিশ্চিত করতে চায় কর্তৃপক্ষ। উপযুক্ত ও সক্ষম বিনিয়োগকারী না পাওয়া পর্যন্ত বহাল থাকবে একীভূত কাঠামো।

