আস্থা সংকটে পুঁজিবাজার, পুঁজির নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তা চায় বিনিয়োগকারীরা
হুমায়ন কবির, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, শেয়ারবার্তা ২৪ ডটকম, ঢাকা: দীর্ঘদিন অনাস্থায় থাকা নির্বাচিত সরকার ক্ষমতার আসার পর কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও আতঙ্ক কাটছে না বিনিয়োগকারীদের। কারণ এর আগেও কয়েক বার সূচকের উত্থানের আভাস দিলেও শেষ পর্যন্ত টিকেনি। ফলে মাঝে মধ্যে সূচকের উকি মারলেও আস্থা ফিরছে না পুঁজিবাজারে। এছাড়া শিগগিরই পুঁজিবাজারে সুদিন আসবে, এরকম অসংখ্য প্রতিশ্রুতি শুনেছেন বিনিয়োগকারীরা। কিন্তু সেই ‘শিগগির’ আর আসে না। শেষ হয়ে যায় বছরের পর বছর। শেষ হয় না অপেক্ষার পালা।
ঘটনা এখানে থামলে তেমন সমস্যা ছিল না। দিনদিন উধাও হয়ে যাচ্ছে পুঁজি। পথে বসে যাচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। দেখার কেউ নেই। কে শুনবে কথা, কার কাছে বিচার দেবে। একমাত্র উপরওয়ালা ছাড়া বলার মতো কেউ নেই। এভাবেই পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীরা অসহায়। তবে উপরের এই চিত্রের কোনো কিছুই প্রভাবশালীদের সঙ্গে মেলানো যাবে না। নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে একাকার হয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে তারা হাতিয়ে নিচ্ছেন পুঁজি। তবে পুঁজিবাজারের এই গল্প বহুদিনের পুরোনো। বাজারে দুর্যোগের জন্য আসছে একের পর এক ইস্যু।
মুলত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাবে পুঁজিবাজারে এখনও স্বস্তির পরিবেশ ফেরেনি। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ইতিবাচক ইঙ্গিত দেখা গেলেও তা স্থায়ী হয়নি। ফলে বাজারে দোলাচলের মধ্যেই দিন কাটাচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা, যাদের প্রত্যাশা এখন একটাই স্থিতিশীলতা আর সুদিনের প্রত্যাবর্তন।
এছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের গত দেড় বছরে পুঁজিবাজার খাদের কিনারে চলে যায়। সরকারের ঘোষিত সংস্কার পদক্ষেপগুলো আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে পড়ে। ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে পুঁজিবাজার আরও নিম্নগামী হয়, যার চরম মূল্য দিতে হয় বিনিয়োগকারী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে। ফলে দীর্ঘদিন পর দেশের মানুষ ভোটের অধিকার ফিরে পায়।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের ভোটের মাধ্যমে রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাজার-সংশ্লিষ্টরা আবারও আশাবাদী হয়ে উঠছেন। অবশ্য এর কারণও রয়েছে। বিশেষ করে বিএনপি যখন ক্ষমতায় থাকে তখন পুঁজিবাজার ভালো অবস্থানে থাকে। আর তাই এখন সব মহল থেকেই দাবি উঠছে বাজার সংস্কারের আগে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সংস্কার জরুরী।
যার ফলে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান পদ থেকে খন্দকার রাশেদ মাকসুদকে সরিয়ে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়ার লক্ষ্যে এরইমধ্যে আইনে সংশোধন এনেছে সরকার। ফলে আইনের সংশোধনীর গেজেট প্রকাশ করার পাশাপাশি বিএসইসিতে যে কোন সময় নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হতে পারে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যসহ বৈশ্বিক অস্থিরতা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। ফলে বড় অঙ্কের নতুন বিনিয়োগে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন অনেকে। তবে তারা মনে করেন, এটি দীর্ঘমেয়াদি কোনো নেতিবাচক প্রবণতা নয়। মৌলভিত্তিসম্পন্ন শেয়ারে ধৈর্য ধরে বিনিয়োগ করলে মাঝারি থেকে দীর্ঘমেয়াদে ভালো রিটার্নের সুযোগ এখনো রয়েছে।
এ বিষয় জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিন থেকে বিনিয়োগকারীদের আস্থা সংকট চলছে। এর সঙ্গে অর্থনৈতিক বিভিন্ন সংকট, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি যোগ হয়েছে। ফলে সবার আগে আস্থা সংকট দূর করতে পদক্ষেপ নিতে হবে।
এক্ষেত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আস্থা নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ বিনিয়োগকারীদের এই নিশ্চয়তা দিতে হবে, কারসাজির মাধ্যমে কেউ তার টাকা হাতিয়ে নিলে বিচার হবে। পাশাপাশি ভালো শেয়ারের সরবরাহ বাড়াতে হবে। এই দুই পদক্ষেপের মাধ্যমে বাজারের সমস্যা দূর করা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সপ্তাহের তৃতীয় কার্যদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচকের কিছুটা দরপতনে লেনদেন শেষ হয়েছে। এদিন ডিএসইতে লেনদেন শুরু হয় বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিটের দাম বাড়ার মাধ্যমে। ফলে লেনদেনের শুরুতে সূচকের ঊর্ধ্বমুখীতার দেখা মিললেও লেনদেনের প্রথম তিন ঘণ্টা সূচকের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত থাকে। কিন্তু শেষ আধাঘণ্টায় বাজারে এক প্রকার ঢালাও দরপতন হয়। ফলে দাম কমার তালিকা বড় হওয়ার পাশাপাশি মূল্য সূচক কমেই দিনের লেনদেন শেষ হয়। এদিন কমেছে টাকার পরিমানে লেনদেন ও বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ার দর। ডিএসই সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
জানা গেছে, দিনশেষে ডিএসই ব্রড ইনডেক্স আগের দিনের চেয়ে ১০ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ৫ হাজার ২৬৭ পয়েন্টে। আর ডিএসই শরিয়াহ সূচক ৫ পয়েন্ট বেড়ে অবস্থান করছে ১ হাজার ৬০ পয়েন্টে এবং ডিএসই ৩০ সূচক ৫ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ২ হাজার ১৭ পয়েন্টে।
দিনভর লেনদেন হওয়া ৩৯৩ কোম্পানি ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মধ্যে দর বেড়েছে ১০৭ টির, দর কমেছে ২২৭ টির এবং দর অপরিবর্তিত রয়েছে ৫৯ টির। ডিএসইতে ৮৩২ কোটি ২৯ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। যা আগের কার্যদিবস থেকে ৪৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকা কম। এর আগের দিন লেনদেন হয়েছিল ৮৭৬ কোটি ৯৫ লাখ টাকার।
অপরদিকে, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ৩১ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৮১৫ পয়েন্টে। সিএসইতে ১৯৮ টি কোম্পানি লেনদেনে অংশ নিয়েছে। এসব কোম্পানির মধ্যে ৭৬ টির দর বেড়েছে, কমেছে ৯৯ টির এবং ২৩ টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। সিএসইতে ১৫ কোটি ১৭ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে।

