লোকসান আড়াল করে লাভ দেখাল ইসলামী ব্যাংক, ঋণের নামে ৭০ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার
শেয়ারবার্তা ২৪ ডটকম, ঢাকা: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক খাতের কোম্পানি ইসলামী ব্যাংক পিএলসি থেকে গ্রাহকদের আমানতের হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণের নামে আত্মসাৎ করেছে এস আলম চক্র। যেসব ঋণ এখন খেলাপি হয়ে গেছে। যাতে আদায় অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় গ্রাহকদের আমানত ঝুঁকিতে পড়েছে। ফলে ইসলামী ব্যাংক পিএলসির খেলাপি ঋণের ব্যাপক বৃদ্ধির কারণে চরম আর্থিক চাপে পড়েছে।
ফলে জালিয়াতির মাধ্যমে বিতরণ করা বড় অঙ্কের সব ঋণই এখন খেলাপি হচ্ছে। এ কারণে অপরিশোধিত ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। যা ব্যাংকের খেলাপি ঋণের বোঝা বাড়িয়ে দিচ্ছে। মুলত মাত্রাতিরিক্ত খেলাপি ঋণের কারণে জালিয়াতির শিকার হওয়ায় বর্তমানে ব্যাংকটি দুর্বল অবস্থানে পড়েছে। এছাড়া ইসলামী ব্যাংত ২০২৪ সালের সমাপ্ত হিসাব বছরে কাগজে-কলমে লাভ দেখালেও বাস্তবে লোকসানে ডুবে আছে এমনই তথ্য উঠে এসেছে নিরীক্ষকদের প্রতিবেদনে।
ব্যাংকটির প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ঋণের নামে টাকা আত্মসাতের কারনে ব্যাংকটির ২০২৪ সালে ৬৯ হাজার ৮১৬ কোটি টাকা বা শেয়ারপ্রতি (৪৩৩) টাকা লোকসান হয়েছে। তবে এ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ওই বছরের ব্যবসায় ১০৯ কোটি টাকা বা শেয়ারপ্রতি ০.৬৮ টাকা মুনাফা দেখিয়েছে। ইসলামী ব্যাংকের ২০২৪ সালে শেয়ার প্রতি ০.৬৮ টাকা করে নিট মুনাফা দেখানো হয়েছে ১০৯ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। আর নিট সম্পদ ৭ হাজার ১৪১ কোটি ৯২ লাখ টাকা বা শেয়ারপ্রতি নিট ৪৪.৩৬ টাকা সম্পদ দেখানো হয়েছে।
তবে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, এ ব্যাংকটির ২০২৪ সালে মোট ৭৬ হাজার ৭১৫ কোটি ৮৮ টাকা প্রভিশন বা সঞ্চিতি দরকার ছিল। তবে এ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সঞ্চিতি করেছে মাত্র ৬ হাজার ৯৪৪ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। এক্ষেত্রে সঞ্চিতি ঘাটতি ৬৯ হাজার ৭৭০ কোটি ৯০ লাখ টাকা। যা গঠন না করে অতিরঞ্জিত সম্পদ, মুনাফা ও ইক্যুইটি দেখানো হয়েছে। একইসঙ্গে দায় কম দেখানো হয়েছে।
মুলত আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে ব্যাংক খাতে নজিরবিহীন লুটপাট হয়েছে। লুটপাট করতে ১১টি ব্যাংক দখল করা হয়েছে। এরই মধ্যে ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’র ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যাংকে রাখা আমানতকারীদের টাকা যেমন আত্মসাৎ করা হয়েছে, তেমনি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে।
পাচার করা টাকায় বিদেশে গড়ে তোলা হয়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিলাসবহুল প্রতিষ্ঠান। পাচারের টাকায় জালিয়াতরা এখন দেশ থেকে পালিয়ে বিদেশে বিলাসবহুল জীবন যাপন করছেন। যার ফলে ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’র ঋণ খেলাপি বাড়ায় ব্যাংকটির আমানতকারীরা পড়েছেন চরম ঝুঁকিতে। নতুন করে ব্যাংকটিতে আমানত রাখতেও ভয় পাচ্ছেন গ্রাহকরা।
এছাড়া ইসলামী ব্যাংক অর্থ এতোটাই আত্মসাত করা হয়েছে যে, যাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহযোগিতা ছাড়া ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই হুমকিতে পড়েছে। ফলে ইসলামী ব্যাংকে ঋণের বিপরীতে প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণে বড় অঙ্কের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৬৯ হাজার ৮১৬ কোটি টাকা।
প্রভিশন সংরক্ষণের জন্য ব্যাংকটি ২০ বছর সময় চেয়ে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন করেছে। অর্থাৎ আগামী ২০ বছরে ধাপে ধাপে তারা ঘাটতি পূরণ করতে চায়। দেশের ইতিহাসে কোনো ব্যাংক এত বড় অঙ্কের প্রভিশন ঘাটতিতে পড়েনি। ইসলামী ব্যাংক নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৪ সালের পরিদর্শন প্রতিবেদনে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
দেখা গেছে, ঋণের নামে টাকা আত্মসাতের কারনে ব্যাংকটির ২০২৪ সালে ৬৯ হাজার ৮১৬ কোটি টাকা বা শেয়ারপ্রতি (৪৩৩) টাকা লোকসান হয়েছে। তবে এ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ওই বছরের ব্যবসায় ১০৯ কোটি টাকা বা শেয়ারপ্রতি ০.৬৮ টাকা মুনাফা দেখিয়েছে। ব্যাংকটির ২০২৪ সালের আর্থিক হিসাব নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশে গ্রাহকদের স্বল্পমেয়াদি আমানতকে ব্যাংকগুলো দীর্ঘমেয়াদে ঋণ দিয়ে থাকে। এটা খুবই বাজে সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। এর উপরে আবার রাজনৈতিক প্রভাবে ব্যাংক দখল করে এস আলমদের মতো চক্র অস্তিত্বহীন ও অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে ঋণের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। যার মাধ্যমে গ্রাহকদের আমানতকে ঝুঁকিতে ফেলেছে। এদের কারনে এখন অনেক ব্যাংক গ্রাহকদের আমানত দিতে পারছে না। যাতে আমানতকারীরা এখন অসহায়ের মতো ঘুরছে।
তবে ব্যাংকটির অপর্যাপ্ত মুনাফার কারনে বাংলাদেশ ব্যাংক ওই সঞ্চিতি পরবর্তীতে গঠন করার সুযোগ দিয়েছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সুযোগ আন্তর্জাতিক হিসাব মানের সঙ্গে সামঞ্জসূপূর্ণ না। কারন ব্যাংকটিকে এখন সঞ্চিতি গঠন থেকে বিরত থাকার সুযোগ দিলেও ভবিষ্যতে ঠিকই এই বিশাল পরিমাণের সঞ্চিতি করতে হবে। সেটার প্রভাব এখন না দেখিয়ে ভবিষ্যতে দেখানো হবে। এটা এক ধরনের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রতারণা।
হিসাব মান অনুযায়ি ব্যাংকটির ২০২৪ সালেই আরও ৬৯ হাজার ৭৭০ কোটি ৯০ লাখ টাকা সঞ্চিতি গঠন করা দরকার ছিল। যা করা হলে ব্যাংকটির ওই বছরে ৬৯ হাজার ৬৬১ কোটি ৪২ লাখ টাকা বা শেয়ারপ্রতি (৪৩৩) টাকা লোকসান হতো। এদিকে ওই প্রয়োজনীয় সঞ্চিতি ২০২৪ সালে গঠন করা হলে ব্যাংকটির নিট সম্পদ ৭ হাজার ১৪১ কোটি ৯২ লাখ টাকা থেকে কমে ঋণাত্মক ৬২ হাজার ৬২৮ কোটি ৯৮ লাখ টাকায় বা শেয়ারপ্রতি সম্পদ ৪৪.৩৬ টাকা থেকে কমে ঋণাত্মক (৩৮৯) টাকায় নেমে আসতো।
এই মন্দাবস্থার মধ্যে ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ ব্যাংকের আনুকূল্য বিবেচনায় ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারবে বলে মনে করছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহযোগিতা ছাড়া ইসলামী ব্যাংকের ব্যবসা পরিচালনা করা হুমকির মুখে পড়তে হবে বলে জানিয়েছে নিরীক্ষক।
এসব বিষয়ে ইসলামী ব্যাংকের দাবি, এই ঋণগুলির মধ্যে অনেকগুলি আসলে আগেই খেলাপি হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু নিরীক্ষক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন দল ২০২৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে খেলাপি হিসাবে শ্রেণীবদ্ধ করেছে। আর তারা প্রায় ২০,০০০ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ উদ্ধার করেছে। অতএব, বর্তমানে ব্যাংকের ব্যবসা পরিচালনায় কোনও হুমকি নেই।
১৯৮৫ সালে তালিকাভুক্ত ইসলামী ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন ২ হাজার কোটি ও পরিশোধিত মূলধন ১ হাজার ৬০৯ কোটি ৯৯ লাখ ১০ হাজার টাকা। রিজার্ভে রয়েছে ৫ হাজার ৬৭৪ কোটি ৭ লাখ টাকা। মোট শেয়ার সংখ্যা ১৬০ কোটি ৯৯ লাখ ৯০ হাজার ৬৬৮। এর মধ্যে উদ্যোক্তা পরিচালকের হাতে রয়েছে দশমিক ১৯ শতাংশ শেয়ার। এছাড়া ৭৪ দশমিক ৯৪ শতাংশ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী, ১৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ বিদেশী বিনিয়োগকারী ও বাকি ৬ দশমিক ৯৮ শতাংশ শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শীর্ষ এক ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, ইসলামী ব্যাংকের অবস্থা যে খারাপ, এটা সবাই জানে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা স্পষ্ট লাভ বা লোকসানের বিপরীতে প্রভিশন রাখতে হবে। আজ তারা লাভ দেখালেও কাল তা ফাঁস হয়ে যাবে। বিনিয়োগকারীরা সাময়িকভাবে মুনাফা দেখে হয়তো ঝুঁকবেন,
কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন নিশ্চিত। এমন অনিশ্চিত পরিস্থিতিই বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আমাদের বাজার থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। অর্থাৎ কাগজে লাভ দেখালেও, বাস্তবে ইসলামী ব্যাংকের লোকসানের ভেতরে ডুবে আছে। লোকসান আড়াল করে লাভ দেখানোর এ চর্চাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

