শেয়ারবার্তা ২৪ ডটকম, ঢাকা: পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা (বিএসইসি) নেতৃত্বের পরিবর্তন নতুন কোনো ঘটনা নয়। গত দেড় দশকে বারবার চেয়ারম্যান ও কমিশন বদলেছে, বদলেছে প্রতিশ্রুতির ভাষা, পরিবর্তনের অঙ্গীকার এবং সংস্কারের রূপরেখা। কিন্তু বাস্তবতা হলো পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা আসেনি, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরেনি বরং দীর্ঘ সময় ধরে অনিয়ম, কারসাজি, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক প্রভাব এবং নীতিগত অস্থিরতার কারণে দেশের পুঁজিবাজার এক গভীর আস্থাহীনতার সংকটে নিমজ্জিত হয়েছে।

এমন বাস্তবতার মধ্যেই নতুন চেয়ারম্যান মাসুদ খানের নেতৃত্বে কমিশন দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। তবে দায়িত্ব গ্রহনের চার মান হলেও স্থিতিশীলতায় ফেরেনি পুঁজিবাজার। বরং গত চার মাসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচক উধাও ৪৫২ পয়েন্ট। এমন পরিস্থিতিতে আস্থা ও তারল্য সংকটে বিপর্যস্ত পুঁজিবাজার। ফলে বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের মাঝে আস্থা ফিরিয়ে আনাই নিয়ন্ত্রক সংস্থার মুল চ্যালেঞ্জ। এক্ষেত্রে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি নয়, আগে দরপতন ঠেকানোর দাবি বিনিয়োগকারীদের। কারণ পুঁজিবাজারে টানা দরপতন হলে সংস্কার করে কী লাভ।

কারণ যেখানে বিনিয়োগকারীদের পুঁজি থাকবে না। সেখানে সংস্কার নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এছাড়া পুঁজিবাজারকে আরও স্থিতিশীল করতে নতুন কমিশন গঠন করা হয়। কিন্তু সেই কমিশন বাজারকে স্থিতিশীল তো দূরের কথা, স্বাভাবিক রাখতেও ব্যর্থ হয়েছে। বরং ধারাবাহিক দরপতনে বাজার এখন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।

পুঁজিবাজারে যেন ধস থামছে না। আগস্ট মাসের মাঝামাঝিতে দরপতন শুরু হলেও এখনও টানা দরপতন চলছে। ফলে বাজারের এই পরিস্থিতিকে নীরব ‘রক্তক্ষরণ’র সঙ্গে তুলনা করছে বিনিয়োগকারীরা। ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পড়েছে পুঁজিবাজার। সরকার পরিবর্তন হলে ডিএসইর উচ্চ পর্যায়ে পরিবর্তন হলেও কোন প্রভাব পড়েনি পুঁজিবাজারে। বরং দিন যতই যাচ্ছে বিনিয়োগকারীদের লোকসানের পাল্লা ততই ভারী হচ্ছে। আর নিয়ন্ত্রক সংস্থা পুঁজিবাজার স্থিতিশীল না করে বাজার সংস্কার করছেন।

ফলে তলানিতে ঠেকেছে লেনদেন। মনে হচ্ছে পুঁজিবাজার আর কোরামিন দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব নয়। কারন শিবলী কমিশন ও রাশেদ মাকসুদ কমিশন কোরামিন নিয়ে বাজার বাঁচিয়ে রেখে বিনিয়োগকারীদের নি:স্ব করেছেন। আর যেটুকু পুঁজি ছিল গত দুই মাসে মাসুদ কমিশন বিনিয়োগকারীদের পথে বসিয়ে দিয়েছেন। ফলে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের মাঝে চলছে হাহাকার আর নীরব ‘রক্তক্ষরণ’। এ যেন দেখার কেউ নেই।

বাজার সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ২০১০ সালে ধসের চেয়েও ভয়াবহ অবস্থা দেশের পুঁজিবাজারের। গত ২ মাসে ৮৫ শতাংশ পোর্টফোলিও পুঁজি ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ উধাও হয়ে গেছে। এছাড়া পুঁজিবাজারের এমন খারাপ সময় বিগত ২৫ বছরের ইতিহাসে দেখা যায়নি। ক্রমাগত সূচক ও শেয়ারের দরপতনে বিনিয়োগকারীদের উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটছে। পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিনিয়োগকারীদের স্বস্তির খবর দিতে পারেনি।

তাদের মতে, বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ পালনের আগে নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত ছিল পুঁজিবাজারের ধারাবাহিক পতন ঠেকিয়ে একটি স্থিতিশীল বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি করা। কিন্তু তা না করে ভবিষ্যতের পুঁজিবাজার উন্নয়ন ও সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে। অথচ টানা দরপতনে একদিকে বিনিয়োগকারীদের লোকসানের পরিমাণ বাড়ছে, অন্যদিকে বাজারের সূচকও ক্রমেই নিচের দিকে নামছে। এর প্রভাবে লেনদেনে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণও কমে যাচ্ছে।

পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা ফেরানোর প্রত্যাশায় চেয়ারম্যানসহ নতুন কমিশন গঠন করা হলেও তাদের কাছে বিনিয়োগকারীদের যে প্রত্যাশা ছিল, তা পূরণ হয়নি বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। তাদের ভাষ্য, বর্তমান কমিশনের সময়ে বাজার উন্নয়ন ও সংস্কারের নানা বক্তব্য শোনা গেলেও বাস্তবে দৃশ্যমান সাফল্য খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। এমনকি বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেকের মনে হচ্ছে, আগের কমিশনই তুলনামূলকভাবে ভালো ছিল।

ফলে বিনিয়োগকারী থেকে পুঁজিবাজার স্টেকহোল্ডার সবার মনেই একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে পুঁজিবাজারে রক্ষক্ষরণ আর কতদিন চলবে, এর শেষ কোথায়? ফলে দিন যতই যাচ্ছে পুঁজিবাজারে পতনের মাত্রা তত বাড়ছে। ফলে প্রতিনিয়ত বিনিয়োগ করা পুঁজি হারাচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা।

এদিকে বিগত সময়ে বিএসইসির চেয়ারম্যান হিসেবে খাইরুল হোসেন, শিবলী রুবাইয়াত, রাশেদ মাকসুদসহ সবারই পতন চেয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। সর্বশেষ পুঁজিবাজারে ভয়াবহ দরপতনে বর্তমান মাসুদ কমিশনেরও পরিবর্তনের দাবি উঠেছে। কারণ টানা দরপতন হলেও বিএসইসি চেয়ারম্যান মুখ খুলছে না।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, আগস্টের মাঝামাঝি সময় থেকেই সূচকের টানা দরপতন ঘটে। গত ১১ আগস্ট ডিএসইর প্রধান সূচক ৫ হাজার ৯০৩ পয়েন্টের ওপরে থাকলেও সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবস ১১ নভেম্বর এসে দাঁিড়য়েছে ৫ হাজার ৪৫১ পয়েন্ট। এর ফলে গত দুই মাসে ডিএসইতে ৪৫২ পয়েন্ট সূচকের দরপতন ঘটে।