স্পেশাল করেসপেন্ডেন্ট, শেয়ারবার্তা ২৪ ডটকম, ঢাকা: টানা দরপতনের বৃত্ত থেকে বের হতে পারছে না দেশের পুঁজিবাজার। তেমনি দিনের পর দিন ঢালাও দরপতন চলছে। এতে আবারও বাড়তে শুরু করেছে বিনিয়োগকারীদের লোকসানের পাল্লা। ঢালাও দরপতনের সঙ্গে লেনদেনের গতিও কমতে শুরু করেছে। ফলে কোনোভাবেই থামছে না ফের সূচকের পয়েন্ট হারানো ও দরপতন। বাড়ছে বিনিয়োগকারীদের আর্তনাদ আর ক্রন্দন।

প্রতিদিনই বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন। ভিটেবাড়ি ও সম্পদ বিক্রি করে এখানে বিনিয়োগ করে আজ পথে বসেছে। আশার আকাশে প্রতিদিনই নিরাশার কালো মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে। লোকসান দিতে হতে বিনিয়োগকারীরা আজ সর্বশান্ত হচ্ছেন। আর নিয়ন্ত্রক সংস্থা ব্যস্ত রয়েছেন জরিমানা ইস্যুতে। ফলে সূচকের টানা দরপতনে বিনিয়োগকারীদের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিনিয়োগকারীদের প্রশ্ন পুঁজিবাজারে টানা উত্থানের পর টানা দরপতনের রহস্য কী।

ইচ্ছাকৃত ভাবে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিক্রির চাপে সূচকের দরপতন হচ্ছে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বর্তমানে ডে ট্রেডারের ভুমিকায় অবর্তীন হয়েছে। এর মাধ্যমে টানা আট কার্যদিবস পুঁজিবাজারে দরপতনের মধ্যে দিয়ে লেনদেন শেষ হয়েছে।

ডিএসইতে গত আট কার্যদিবসে ৪১০ পয়েন্ট সূচকের দরপতন হয়েছে। ফলে গত দুই সপ্তাহে ১১ কার্যদিবসের মধ্যে ৮ কার্যদিবস দরপতন হলেও তিন কার্যদিবস কিছুটা সূচকের উত্থান রয়েছে। এদিকে টানা উত্থানের পর এখন টানা দরপতন দেখা দেওয়ায় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।

ফলে সেই পুরানো ধারায় ফিরছে পুঁজিবাজার। পতনের ধারা, যা থামার নামগন্ধ নেই। গত দুই সপ্তাহে একটানা দরপতনে অধিকাংশ শেয়ারের দাম নতুন করে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ দর হারিয়েছে।দিনের পর দিন পুঁজি হারিয়ে বিনিয়োগকারীরা চোখে দেখছেন আঁধার; ক্ষোভে ফুঁসছেন। অথচ স্টক এক্সচেঞ্জ, নিয়ন্ত্রক সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলরা কুম্ভকর্ণের ঘুমে! তাদের এমন নির্লিপ্ত আচরণে বোঝার উপায় নেই, গভীর সংকটের গ্যাঁড়াকলে পড়েছে ফের পুঁঁজিবাজার।

এদিকে একের পর এক কোম্পানিকে কারসাজির অভিযোগে জরিমানা করে বাজারকে অস্থিতিশীল করছেন। ফলে নতুন করে কেউ বিনিয়োগ করতে সাহস পাচ্ছেন না। বিনিয়োগকারীদের অভিমত এটা ২০১০ সালের বাজার পরিস্থিতিকে হার মানিয়েছেন। নিয়ন্ত্রক সংস্থা মধুর মধুর কথা বলে লাখ লাখ বিনিয়োগকারীর পরিবারকে সর্বশান্ত করছেন। এছাড়া দরপতন ঠেকাতে কোন কার্যকরী পদক্ষেপ নিচ্ছেন না নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

ফলে টানা দরপতনে পুঁজিবাজারে রক্তক্ষরণ হচ্ছে, বিনিয়োগকারীদের আর্তনাদে ফের মতিঝিলের বাতাস ভারী হয়ে উঠছে। ফলে মোটা দাগে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের অভাব এবং সব মিলিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতাকে এবং জরিমানা ইস্যুতে পুঁজিবাজারে টানা দরপতন হচ্ছে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

অভিজ্ঞ বিনিয়োগকারী কাজী হোসাইন আলী বলছেন, দেশের পুঁজিবাজার মানেই দর পতনের ইতিহাস। তবে যখন রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সংস্কার চলছে, অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে ওঠার আভাস মিলছে, তখন এমন দর পতন মেনে নেওয়া যায় না। অর্থনীতির বড় সংকটের মধ্যে থেকেও সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার সহায়তায় শ্রীলঙ্কার পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। পাকিস্তানের পুঁজিবাজার উঠেছে রেকর্ড উচ্চতায়। অথচ দেশের পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীরা পুঁজি রক্ষায় প্রতিদিন করছেন হাপিত্যেশ।

একাধিক বিনিয়োগকারীরা অভিযোগের শুরু বলেন, যে ভাবে পুঁজিবাজারে জরিমান চলছে এখানে কেউ সাহস করে বিনিয়োগ করবে না। ডিএসই অযাচিত হস্তক্ষেপ ও জরিমানা কারনে বর্তমান বাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ও মার্কেট মেইকাররা নিরব ভুমিকায় রয়েছেন। নিয়ন্ত্রক সংস্থা কারসাজি ইস্যুতে একের পর এক জরিমানা করে যাচ্ছেন। মুলত মার্কেট মেইকারদের জরিমানা না করে যে সকল কোম্পানির নো ডিভিডেন্ড দিচ্ছে তাদের পরিচালকদের বিরুদ্ধে জরিমানা করা উচিত বলে তারা মনে করেন।

এদিকে সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচকের বড় পতনে লেনদেন শেষ হয়েছে। এদিন কমেছে বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ার দর ও টাকার পরিমাণে লেনদেন। ডিএসই সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

জানা গেছে, দিনশেষে ডিএসই ব্রড ইনডেক্স আগের দিনের চেয়ে ৬৮ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ৫ হাজার ৩৮১ পয়েন্টে। আর ডিএসই শরিয়াহ সূচক ১৯ পয়েন্ট বেড়ে অবস্থান করছে ১ হাজার ১৫৮ পয়েন্টে এবং ডিএসই ৩০ সূচক ২৩ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ১ হাজার ৮৩ পয়েন্টে।

দিনভর লেনদেন হওয়া ৩৯৬ কোম্পানি ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মধ্যে দর বেড়েছে ৩৯ টির, দর কমেছে ৩০৭ টির এবং দর অপরিবর্তিত রয়েছে ৫০ টির। ডিএসইতে ৬২১ কোটি ৪৯ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। যা আগের কার্যদিবস থেকে ৩৩ কোটি ২৩ লাখ টাকা কম। এর আগের দিন লেনদেন হয়েছিল ৬৫৪ কোটি ৭২ লাখ টাকার ।

অপরদিকে, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ১৩৮ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ১৯৯ পয়েন্টে। সিএসইতে ২১৪ টি কোম্পানি লেনদেনে অংশ নিয়েছে। এসব কোম্পানির মধ্যে ৩২ টির দর বেড়েছে, কমেছে ১৬১ টির এবং ২১ টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। সিএসইতে ১৪ কোটি ৮৮ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে।