ডিএসইর অযাচিত হস্তক্ষেপে পুঁজিবাজারে আবারও লেনদেনের গতি হারাচ্ছে
শেয়ারবার্তা ২৪ ডটকম, ঢাকা: দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতা ফিরে আসার ইঙ্গিত মিলছে, যার ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে পুঁজিবাজারে। বিশেষ করে দীর্ঘদিনের মন্দা কাটিয়ে স্থিতিশীলতার পথে হাঁটছে পুঁজিবাজার। এরই পরিপ্রেক্ষিতে পুঁজিবাজারে তেজিভাব লক্ষ করা গেছে। এছাড়া অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর তাদের অন্যতম চ্যালেঞ্জ ছিল লুটপাট হওয়া পুঁজিবাজারে সংস্কারের মাধ্যমে স্বচ্ছতা, সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। গত এক বছরে সরকারের সদিচ্ছা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) উদ্যোগে পুঁজিবাজার থেকে হারানো আস্থা ফিরতে শুরু করেছে। একই সঙ্গে বাজারে যে অস্বস্তিকর অবস্থা বিরাজ করছিল, সেটা স্বস্তিকর অবস্থায় আসছে।
এছাড়া বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিন পর প্রথমবারের মতো শেয়ার কেনাবেচায় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) আর ফোনে হস্তক্ষেপ করছে না। গত এক বছরে এই উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন বাজার সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। তারা মনে করছেন, এটি বাজারে স্বাভাবিক শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনার বড় পদক্ষেপ। অতীতে কারসাজি ও অনিয়মের কারণে বাজারে আস্থা সংকট ও অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল।
তবে বিএসইসির কাঠামোগত সংস্কার, কঠোর নজরদারি, জোরালো এনফোর্সমেন্ট অ্যাকশন এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ফলে অনিয়ম অনেকটাই কমে এসেছে। বাজার উন্নয়নে গঠিত বিএসইসির টাস্কফোর্স বেশ কিছু দীর্ঘমেয়াদি সুপারিশ দিয়েছে, যা ভবিষ্যতে পুঁজিবাজারের সম্ভাবনা আরও বাড়াবে। যদিও নতুন আইপিওর অভাব ও মানসম্পন্ন শেয়ারের সংকট কিছুটা চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, বিশ্লেষকদের মতে দ্রুত আইন সংস্কার ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব।
তেমনি দুর্নীতি দমনে বিএসইসি ইতিমধ্যে কয়েকজন দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে এবং নজরদারি জোরদার করেছে। এর ফলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার হচ্ছে, যা লেনদেন বৃদ্ধি ও সূচকের ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতায় প্রতিফলিত হচ্ছে।
তবে হঠাৎ ডিএসইর অযাচিত হস্তক্ষেপে আবারও গতি হারাচ্ছে পুঁজিবাজার। গত সপ্তাহে পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে চার কার্যদিবস দরপতনের মধ্যে দিয়ে লেনদেন শেষ হয়েছে। এতে গত সপ্তাহে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ২৩৮ পয়েন্ট সূচক হারিয়েছে।
তেমনি সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচক হারিয়েছে ৫৫ পয়েন্ট। ফলে পাঁচ কার্যদিবসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচক হারিয়েছে ২৯৩ পয়েন্ট। এর ফলে ফের পুঁজিবাজারে লেনদেনের গতি কমতে দেখা যাচ্ছে। এক হাজার ৪০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়া লেনদেন ধারাবাহিকভাবে কমে ৬০০ কোটি টাকার ঘরে নেমে এসেছে। এতে এক মাসের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন লেনদেনের ঘটনা ঘটেছে।
মুলত অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগে বাজারে কিছুটা ইতিবাচক আচরণ দেখা দিলেও তা টিকছে না ডিএসইর অতিরিক্ত হস্তক্ষেপের কারণে। বাজার চলবে বাজারের নিজস্ব গতিতে এমন প্রতিশ্রুতি দিলেও নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ঘোষণাকে কার্যত ভেস্তে দিচ্ছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) পদক্ষেপ। যেখানে পুঁজিবাজার ইস্যুতে বিএসইসি হস্তক্ষেপ করছে না সেখানে ডিএসইর হঠাৎ হস্তক্ষেপ নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছিুক শীর্ষ কয়েকটি ব্রোকারেজ হাউজের কর্মকর্তারা বলেন, পুঁজিবাজার স্বাভাবিক গতিতে ফিরেছিল। তবে বেশ কয়েকদিন ধরে ডিএসইর অযাচিত হস্তক্ষেপে আবারও গতি হারাচ্ছে পুঁজিবাজার। মুলত ১৪০০ কোটি টাকার লেনদেন ৬০০ শত কোটি টাকার ঘরে চলে আসছে। এর নেপথ্যে মুল কারণ ছিলো বিভিন্ন শেয়ার ক্রয় করলে ডিএসইর চিঠি ইস্যু।
মুলত কোন হাউজ থেকে কে কোন শেয়ার কিনছেন বা বিক্রি করছে, কেন করছে এসব খুঁটিনাটি বিষয়ে অযাচিত হস্তক্ষেপ করছে ডিএসই। এ নিয়ে বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউজে নিয়মিত চিঠি পাঠানো হচ্ছে। ফলে বাজারের স্বাভাবিক গতি বারবার ব্যাহত হচ্ছে। এর প্রভাবে সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিদিনের লেনদেন নেমে এসেছে প্রায় অর্ধেকে।
এছাড়াও বাজার পতনের অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে মার্জিন ঋণ। বিনিয়োগকারীরা ঋণ নিয়ে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে গিয়ে একসময় হারিয়ে ফেলছেন নিজের মূল পুঁজি। শুধু তাই নয়, মার্জিন ঋণের কারণে বাড়তি সেল প্রেসার বিক্রির চাপ তৈরি হয়ে ক্ষতির মুখে পড়ছেন অন্যান্য বিনিয়োগকারীও।
বাজার বিশ্লেষকরা মনে করেন, একটি বাজারে হরেক রকম পণ্য থাকলে বিনিয়োগকারীও আসবে ভিন্ন ভিন্ন চাহিদা নিয়ে। কিন্তু সেখানে যদি কর্তৃপক্ষ অযাচিত বাধা সৃষ্টি করে, তাহলে সেই বাজারে গতি হারানো অনিবার্য। তাঁদের মতে, ডিএসইর এমন নাক গলানো মনোভাব চলতে থাকলে পুঁজিবাজারের দীর্ঘমেয়াদি সংকট আরও গভীর হতে পারে।
এবিষয়ে বিএসইসির পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম বলেন, সার্ভিলেন্স সংক্রান্ত বিষয় হলে সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ ২০২০ এর ১৭ অনুযায়ী ইন্সপেকশন করতে চাইলে করতে পারে। তবে কেউকে শেয়ার ক্রয় বা বিক্রয় করে এটা বিএসইসি বা ডিএসই বলতে পারে না। শেয়ার ক্রয়-বিক্রয়ের বিষয়টি বিনিয়োগকারীদের ইচ্ছাধীন।
কিন্তু সার্ভিলেন্স সংক্রান্ত কোনো পার্টিকুলার সিকিউরিটিজ সংক্রান্ত তাদের কোয়েরি থাকতে পারে। তবে সেটা লিখিত মাধ্যমে হতে হবে। আইন অনুযায়ী ইন্সপেকশন বা সার্ভিলেন্স সংক্রান্ত বিষয়ে লিখিত তথ্য চাইলে ব্রোকারেজ হাউজগুলো দিতে বাধ্য।

