হঠাৎ চাঙা পুঁজিবাজার নেপথ্যে ৮ কারণ, আস্থা বাড়ছে ভালো মৌল ভিত্তি শেয়ারে
শেয়ারবার্তা ২৪ ডটকম, ঢাকা: দীর্ঘ মন্দা আর অনিশ্চয়তার পর দেশের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আবারও আস্থা ফিরে আসতে শুরু করেছে। টানা কয়েক মাস ধুঁকতে থাকা বাজারে হঠাৎ সূচকের উল্লম্ফন ও লেনদেনের মাত্রা বাড়ায় অনেকেই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছেন। তাছাড়া এক কার্যদিবসের পতনের পর সপ্তাহের তৃতীয় কার্যদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ফের সূচকের উত্থানের মধ্যে দিয়ে লেনদেন শেষ হয়েছে।
মুলত বাজার কারেকশন হলেও ভালো মৌল ভিত্তি শেয়ারে ভর করে ফের ঘুরে দাঁড়িয়েছে পুঁজিবাজার। এতে ধীরে ধীরে আস্থা বাড়ছে বিনিয়োগকারীদের। এছাড়া ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচকের বড় উত্থানের পাশাপাশি বেশির ভাগ কোম্পানির শেয়ার দর ও টাকার পরিমানে লেনদেন লেনদেন। ডিএসই সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
বাজার বিশ্লেষকেরা বলছেন, সরকারের উদ্যোগ স্থিতিশীল অর্থনৈতিক পরিবেশ ও বিনিয়োগবান্ধব সিদ্ধান্তের কারণে বিনিয়োগকারীদের মনে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। এছাড়া বাজার উঠানামার মধ্যে দিয়ে স্থিতিশীলতার পথে হাঁটছে। পুঁজিবাজার একটানা বাড়ছে না তেমনি একটানা দরপতন হচ্ছে না। এটা বাজারের জন্য ইতিবাচক দিক।
একাধিক ব্রোকারেজ হাউসগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাজারে ফিরে আসা আস্থা এখন অনেক স্পষ্ট। আগে যারা আশাহত হয়ে বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন, তারাও এখন আবার বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছেন। বিশেষ করে ভালো মৌল ভিত্তি কোম্পানির শেয়ার কিনতে আগ্রহ বাড়ছে।
পুঁজিবাজারের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে ডিএসইর পরিচালক শাকিল রিজভী বলেন, পুঁজিবাজারে গতি ফেরাতে গত বাজেটের সময় থেকেই সরকারের দিক থেকে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। পাশাপাশি ব্যাংক খাতে আমানত ও ট্রেজারি বিল-বন্ডের সুদের ঊর্ধ্বমুখী যে ধারা ছিল, সেটিও এখন কিছুটা স্থিতিশীল। নতুন করে সুদের হার না বেড়ে বরং কিছুটা নিম্নমুখী প্রবণতায় রয়েছে। এ কারণে অনেক প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী আবারও পুঁজিবাজারমুখী হচ্ছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে বাজারের উত্থানে সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হলো ভালো কোম্পানির শেয়ারের মূল্যবৃদ্ধি। এই ধারা অব্যাহত থাকলে বাজার টেকসই ও স্থিতিশীল একটি রূপ পাবে। তবে ভালো শেয়ারের দামও যাতে অতিমূল্যায়িত না হয়ে যায়, সে জন্য এখন উচিত বাজারে ভালো শেয়ারের সরবরাহ বাড়ানো।
যার ফলে পুঁজিবাজার চাঙা হওয়ার পেছনে প্রধানত ৮টি কারণ বিদ্যমান বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। দেশের শীর্ষ অর্থনীতিবিদ, দুই স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষ এবং বড় ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের কথায় এ ৮টি কারণ উঠে এসেছে। কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে: রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, লভ্যাংশ ঘোষণার মৌসুম, সরকারের ইতিবাচক মনোভাব, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ৫ দফা নির্দেশনা, তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কোম্পানির করপোরেট করের ব্যবধান, আইসিবিকে ১০ হাজার কোটি টাকার স্বল্প সুদি ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত, ব্যাংকের ইন্টারেস্ট রেট কমে যাওয়া এবং বড় বিনিয়োগকারীদের সক্রিয়তা।
প্রথমত, মূলত দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিরাজ করায় বাজারে সূচক ও লেনদেন বাড়ছে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া ফেব্রুয়ারীতে নির্বাচন ইস্যুতে বড় বিনিয়োগকারীরা বাজারমুখী হয়ে লেনদেন বাড়িয়ে দিয়েছে। তাদের দাবি, এ মুহূর্তে দেশে কোনো হরতাল বা অবরোধ না থাকায় বাজারের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ায় বাজারে নতুন নতুন বিনিয়োগকারী বিনিয়োগ করছে। ফলে বাজারে চাঙাভাব লক্ষ্য করা গেছে।
দ্বিতীয়ত, মুলত ব্যাংক ও বীমা খাতের শেয়ারে পতন হলেও জুন ক্লোজিং কোম্পানির শেয়ারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ছে। ফলে লভ্যাংশ ঘোষনাকে সামনে রেখে জুন ক্লোজিং কোম্পানির বিভিন্ন খাতের শেয়ারের প্রতি একটু বাড়তি আগ্রহ দেখা গেছে। জুন ক্লোজিং কোম্পানিগুলোর লভ্যাংশ ঘোষণার মৌসুম হিসেবে পরিচিত। এখন অধিকাংশ দিন এসব কোম্পানির শেয়ারে সেল অর্ডার কম থাকে বা থাকেই না। ফলে এসব কোম্পানির শেয়ার দর বাড়ায় বাজার চাঙা হয়ে উঠেছে।
তৃতীয়ত, ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছরের মাথায় স্থিতিশীলতার পথে হাঁটছে শুরু করছে দেশের পুঁজিবাজার। ফলে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর তাদের অন্যতম চ্যালেঞ্জ ছিল লুটপাট হওয়া পুঁজিবাজারে সংস্কারের মাধ্যমে স্বচ্ছতা, সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। গত এক বছরে সরকারের সদিচ্ছা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) উদ্যোগে পুঁজিবাজার থেকে হারানো আস্থা ফিরতে শুরু করেছে। যার ফলে বিনিয়োগকারীরা ফের বাজারমুখী হচ্ছে।
চতুর্থত, এর মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে বাজারে গতি ফেরাতে নেওয়া হয়েছে বেশ কিছু সাহসী উদ্যোগ। বিশেষ করে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ৫ দফা নির্দেশনায় বাজার সংস্কারের আশ্বাস বিনিয়োগকারীদের মনে আস্থা তৈরি করেছে। এই নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে: বহুজাতিক কোম্পানির সরকারি শেয়ারবাজারে ছাড়া, ভালো দেশীয় কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্তিতে উৎসাহ দেওয়া, বিদেশি বিশেষজ্ঞ দিয়ে বাজার সংস্কার, অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং বড় কোম্পানিগুলোকে ঋণের বদলে শেয়ার বা বন্ড ছাড়ার মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহে উৎসাহিত করা।
পঞ্চমত, চলতি অর্থবছরের বাজেটেও পুঁজিবাজারবান্ধব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কোম্পানির করপোরেট করের ব্যবধান বাড়িয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ করায় ভালো কোম্পানিগুলো বাজারে আসতে আগ্রহী হচ্ছে। এ ছাড়া সঞ্চয়পত্রে সুদের হার কমানো এবং ডলারের বিপরীতে টাকার মান কিছুটা শক্তিশালী হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজারকে বিকল্প বিনিয়োগক্ষেত্র হিসেবে ভাবছেন।
ষষ্ঠতম, এ ছাড়া সরকার পুঁজিবাজারে তারল্য বাড়াতে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশকে (আইসিবি) ১০ হাজার কোটি টাকার স্বল্প সুদি ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাশাপাশি ১০ হাজার কোটি টাকার ‘ক্যাপিটাল মার্কেট সাপোর্ট ফান্ড’ গঠনের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এ দুটি পদক্ষেপ পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে বড় ভূমিকা রাখবে।
সপ্তমতম, ব্যাংকের ইন্টারেস্ট রেট কমে যাওয়ার ব্যাংকে গচ্ছিত টাকা না রেখে পুঁজিবাজারমখী হচ্ছেন সাধারন বিনিয়োগকারীরা। এছাড়া সঞ্চয়পত্রে মুনাফার হার কমানোর ফলে পুঁজিবাজারের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে সাধারন মানুষের। গত ১ জুলাই থেকে নতুন হার অনুযায়ী, সঞ্চয়পত্রের সর্বোচ্চ সুদহার হবে ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ এবং সর্বনিম্ন সুদহার হবে ৯ দশমিক ৭২ শতাংশ।
এছাড়া নীতি সুদহার বা রেপো রেট ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৮ শতাংশ নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সার্কুলারে বলা হয়েছে, মুদ্রানীতি কাঠামোর ইন্টারেস্ট রেট করিডর এর আওতায় আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজার (কল মানি মার্কেট) এর কার্যক্রম আরও গতিশীল করা এবং তারল্য ব্যবস্থাপনা সুসংহত করার লক্ষ্যে নীতি সুদহার করিডরের নিম্ন সীমা স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) ৮.৫০ শতাংশ থেকে ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে ব্যাংক ও সঞ্চয় পত্রের মুনাফা কমানোর ফলে আমানতকারীরা লাভের আশায় পুঁজিবাজারমুখী হবে।
অষ্টমতম, দীর্ঘদিন পুঁজিবাজার অস্থিতিশীল থাকায় বাজারে নিস্কিয় ছিলেন ব্যক্তি শ্রেণির বড় বিনিয়োগকারী বা গেমলাররা। লভ্যাংশ ঘোষণার মৌসুম ও বাজার স্থিতিশীল করতে সরকারের ইতিবাচক মনোভাব এবং সঞ্চয় পত্র ও ব্যাংক মুনাফা কমানোর ফলে আবারও সক্রিয় হয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। তাদের সক্রিয়তায় আবারও চাঙা হয়ে উঠেছে পুঁজিবাজার।
জানা গেছে, দিনশেষে ডিএসই ব্রড ইনডেক্স আগের দিনের চেয়ে ৩৭ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ৫ হাজার ৬২০ পয়েন্টে। আর ডিএসই শরিয়াহ সূচক ৮ পয়েন্ট বেড়ে অবস্থান করছে ১ হাজার ২৩৩ পয়েন্টে এবং ডিএসই ৩০ সূচক ৬ পয়েন্ট বেড়ে অবস্থান করছে ২ হাজার ১৯৫ পয়েন্টে।
দিনভর লেনদেন হওয়া ৩৯৮ কোম্পানি ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মধ্যে দর বেড়েছে ২২০ টির, দর কমেছে ১৩১ টির এবং দর অপরিবর্তিত রয়েছে ৪৭ টির। ডিএসইতে ১ হাজার ২৭৮ কোটি ৬ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। যা আগের কার্যদিবস থেকে ৯৬ কোটি ৯৩ লাখ টাকা বেশি। এর আগের দিন লেনদেন হয়েছিল ১ হাজার ১৮১ কোটি ১৩ লাখ টাকার ।
অপরদিকে, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ৪৬ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৬৫২ পয়েন্টে। সিএসইতে ২৩৯ টি কোম্পানি লেনদেনে অংশ নিয়েছে। এসব কোম্পানির মধ্যে ১৩৭ টির দর বেড়েছে, কমেছে ৭১ টির এবং ৩১ টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। সিএসইতে ১৪ কোটি ৭৯ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে।

