জুন মাসে কমেছে বিও অ্যাকাউন্ট, পুঁজিবাজার ছাড়ছেন বিনিয়োগকারীরা
শেয়ারবার্তা ২৪ ডটকম, ঢাকা: দেশের পুঁজিবাজারে ধারাবাহিকভাবে কমছে বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীর সংখ্যা। কয়েক মাস ধরে বিদেশিদের পুঁজিবাজার ছাড়ার যে ধারা চলছে, তা এখনও থামেনি। তবে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্যান্য খাতের মতো পুঁজিবাজারে আশার আলো দেখা যায়। নতুন করে আসতে শুরু করে বিদেশি বিনিয়োগ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সম্ভাব্য সংস্কারের আশায় আসা এই বিনিয়োগে সাময়িকভাবে সক্রিয় হয় দেশের পুঁজিবাজার। ফলে আগস্টের পুরো সময় ইতিবাচক ধারা দেখা যায়। তবে বেশিদিন অটুট থাকেনি এ ধারা।
আগস্টে শুরু হওয়া বিনিয়োগ জানুয়ারিতে এসে ভাটায় পড়ে। বেশিরভাগ বিদেশি বিনিয়োগকারী তাদের বিনিয়োগ তুলে নিয়ে যাচ্ছেন। ফলে দিন দিন কমেছে প্রবাসী ও বিদেশী বিনিয়োগকারীরা সংখ্যা। তবে সংস্কার সম্পন্ন হলে এবং অর্থনীতি স্থিতিশীল হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ফিরে আসবেন বলে আশা প্রকাশ করেছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে পুঁজিবাজারের লোকসানে জুন ক্লোজিংয়ে এসে সিংহভাগ বিনিয়োগকারী তাদের বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাব নবায়ন করেনি। ফলে জুলাইয়ের ৭ তারিখ পর্যন্ত প্রায় চার হাজারের বেশি দেশীয় বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব বন্ধ হয়েছে। শুধু দেশীয় বিনিয়োগকারী নয়, প্রবাসী বিনিয়োগকারীদেরও বিও হিসাবও কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে।
২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের ধারাবাহিকভাবে পুঁজিবাজার ছাড়ার তথ্য প্রকাশ করতে থাকে সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড বাংলাদেশের (সিডিবিএল), যা অব্যাহত থাকে চলতি বছরের ২০ মে পর্যন্ত। এ সময়ের মধ্যে বিদেশি ও প্রবাসীদের বিও হিসাব কমেছে ৯ হাজার ১৭৬টি।
তবে চলতি বছরের ২০ মে থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত পুঁজিবাজারে বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব বাড়ার তথ্য প্রকাশ করে সিডিবিএল। এই সময়ের মধ্যে বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব বেড়েছে ৭৪টি। নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিবছরের ৩০ জুনের মধ্যে ৫০০ টাকা ফি দিয়ে বিও হিসাব নবায়ণ করতে হয় উভয় শ্রেণির বিনিয়োগকারীদের। এই সময়ের মধ্যে বিও হিসাব নবায়ন না করলে সেই হিসাব বন্ধ করে দেয় সিডিবিএল।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলতি বছরের জুন ও জুলাই মাসে পুঁজিবাজারের কিছুটা উত্থান দেখা গেলেও তার আগে জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে সূচকের পতন হয়েছে। এমনও সপ্তাহ গেছে যার ৫ দিনের লেনদেনে ৫ দিনই কমেছে সূচক। লেনদেন নেমে এসেছিল আড়াইশ কোটি টাকার ঘরে। তারা বলছেন, এমন অবস্থায় বিনিয়োগকারীরা তাদের সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ হারিয়েছে।
যদিও এখন পুঁজিবাজারে সূচক বাড়ছে তার পরও সে সময়ে যে লোকসান হয়েছে সেটি কাটিয়ে ওঠা এখনো সম্ভব হয়নি। ফলে যেসব বিনিয়োগকারীদের যৌথ নামে বিও আছে সেগুলো বন্ধ হয়েছে। আবার বিনিয়োগ সুরক্ষার জন্য লোকসানে শেয়ার বিক্রি করে বাজার থেকে বের হয়ে গেছেন অনেকে। সেই বিও হিসাবগুলো এই বছরের জুনে এসে বন্ধ হয়ে গেছে।
এই সিডিবিএলের তথ্য অনুযায়ী, ৩ জুলাই পর্যন্ত পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ৮৩ হাজার ৯৯৭টি, যা গত ২৬ জুন ছিল ১৬ লাখ ৮৮ হাজার ৭০২টি। এ হিসাবে মাত্র পাঁচ কার্যদিবসে পুঁজিবাজারে বিও হিসাব কমেছে ৪ হাজার ৭০৫টি। বর্তমানে বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের নামে বিও হিসাব আছে ৪৫ হাজার ৯০৩টি। গত ২৬ জুন বিদেশি ও প্রবাসীদের নামে বিও হিসাব ছিল ৪৬ হাজার ৪১০টি। অর্থাৎ পাঁচ কার্যদিবসে বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব কমেছে ৫০৭টি।
গত বছরের ৫ আগস্টের পর পুঁজিবাজারে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়তে দেখা যায়। তবে শেষ পাঁচ কার্যদিবসে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাবও কমেছে। সিডিবিএলের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশি বিনিয়োগকারীদের নামে বিও হিসাব আছে ১৬ লাখ ২০ হাজার ৩৮৬টি, যা গত ২৬ জুন ছিল ১৬ লাখ ২৪ হাজার ৫১৫টি। অর্থাৎ শেষ পাঁচ কার্যদিবসে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব কমেছে ৪ হাজার ১২৯টি। ৫ আগস্টের আগে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের নামে বিও হিসাব ছিল ১৬ লাখ ৩ হাজার ৮২২টি। এ হিসাবে হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশি বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব বেড়েছে ১৬ হাজার ৫৬৪টি।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর পুঁজিবাজারে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের সংখ্যা বাড়লেও তার আগে অনেক বিনিয়োগকারী পুঁজিবাজার ছেড়েছেন। ২০২৪ সালের শুরুতে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব ছিল ১৭ লাখ ৭৩ হাজার ৫৫১টি। আর বর্তমানে বিও হিসাব আছে ১৬ লাখ ৮৩ হাজার ৯৯৭টি। অর্থাৎ ২০২৪ সালের শুরু থেকে এ পর্যন্ত বিও হিসাব কমেছে ৮৯ হাজার ৫৫৪টি।
এদিকে বর্তমানে পুরুষ বিনিয়োগকারীদের নামে বিও হিসাব আছে ১২ লাখ ৬৩ হাজার ৯৫১টি। গত ২৬ জুন এই সংখ্যা ছিল ১২ লাখ ৬৭ হাজার ৪৮৪টি। অর্থাৎ পাঁচ কার্যদিবসে পুরুষ বিনিয়োগকারীদের হিসাব কমেছে ৩ হাজার ৫৩৩টি। অপরদিকে বর্তমানে নারী বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ২ হাজার ৩৩৮টি। গত ২৬ জুন এই সংখ্যা ছিল ৪ লাখ ৩ হাজার ৪৪১টি। এ হিসাবে শেষ পাঁচ কার্যদিবসে নারী বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব কমেছে ১ হাজার ১০৩টি।
নারী ও পুরুষ বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি শেষ পাঁচ কার্যদিবসে কোম্পানির বিও হিসাবও কমছে। বর্তমানে কোম্পানি বিও হিসাব রয়েছে ১৭ হাজার ৭০৮টি। গত ২৬ জুন এই সংখ্যা ছিল ১৭ হাজার ৭৭৭টি। এ হিসাবে পাঁচ কার্যদিবসে কোম্পানি বিও হিসাব কমেছে ৬৯টি। বর্তমানে বিনিয়োগকারীদের যে বিও হিসাব আছে তার মধ্যে একক নামে আছে ১২ লাখ ৫ হাজার ৩৪৭টি, যা গত ২৬ জুন ছিল ১২ লাখ ৮ হাজার ৫৩১টি।
অর্থাৎ পাঁচ কার্যদিবসে একক নামে বিও হিসাবে কমেছে ৩ হজার ১৮৪টি। এ ছাড়া বিনিয়োগকারীদের যৌথ নামে বিও হিসাব আছে ৪ লাখ ৬০ হাজার ৯৪২টি। গত ২৬ জুন যৌথ বিও হিসাব ছিল ৪ লাখ ৬২ হাজার ৩৯৪টি। অর্থাৎ শেষ পাঁচ কার্যদিবসে যৌথ বিও হিসাব কমেছে ১ হাজার ৪৫২টি।

