মার্কেন্টাইল ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডারা লভ্যাংশ বঞ্চিত হলেও চীফ এক্সকিউটিভ ও পরিচালকদের সম্মানীর নামে পোয়াবারো
স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, শেয়ারবার্তা ২৪ ডটকম, ঢাকা: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক খাতের কোম্পানি মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসি খেলাপি ঋণের চাপে পড়েছে চরম আর্থিক সংকটে। আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাওয়া এই খেলাপি ঋণের কারণে প্রভিশন সংরক্ষণের পর নিট মুনাফা মারাত্মকভাবে কমে গেছে।
ফলে ২০২৪ সালে ব্যাংকটি শেয়ারহোল্ডারদের জন্য কোন লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারেনি। ফলে শেয়ারহোল্ডারদের মাঝে চরম ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। এছাড়া ব্যাংকটির পরিচালকদের বিরুদ্ধে রয়েছে অন্তহীন অভিযোগ। পরিচালকরা নামে বেনামে ঋণের নামে বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগ রয়েছে।
মুলত ব্যাংকটির গত ৬ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন মুনাফা করেছে। এর মধ্যে ব্যাংকটি ২০২৪ সালে মুনাফা করে ৫৮ পয়সা, ২০২৩ সালে মুনাফা করে ১ টাকা ৮৬ পয়সা, ২০২২ সালে মুনাফা করে ২ টাকা ১৭ পয়সা, ২০২১ সালে মুনাফা করে ৩ টাকা ৪৬ পয়সা, ২০২০ সালে মুনাফা করে ২ টাকা ২৬ পয়সা, ২০১৯ সালে মুনাফা করে ২ টাকা ৩৭ পয়সা, ২০১৮ সালে মুনাফা করে ৩ টাকা ৫৯ পয়সা। যদিও গত ছয় বছরের মধ্যে সব্বোর্চ মুনাফা করে ২০২৪ সালে।
এমন অবস্থায় ব্যাংকটি গত ছয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন মুনাফা করলেও ব্যাংকটির চীফ এক্সকিউটিভ ও পরিচালকদের সম্মানীর নামে তুঘলকি কাণ্ড দেখা গেছে। ২০২৪ সালে শেয়ারহোল্ডারা বছর শেষে কোন লভ্যাংশ না পেলেও চীফ এক্সকিউটিভ বেতন ভাতা বেড়েছে প্রায় ১৯ লাখ টাকা।
আর প্রায় ২১ লাখ টাকা সম্মানী বেড়েছে পরিচালকদের। ফলে ব্যাংকটির এরকম দৈতনীতির কারণে শেয়ারহোল্ডারদের মাঝে চরম ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। এমন অবস্থায় ব্যাংকটির খেলাপী লোনে পরিমান আশঙ্কাজনক বাড়লেও ব্যাংকটির চিফ এক্সিকিউটিভ ও পরিচালকদের সম্মানির অঙ্ক বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ১৭৬ কোটি ১৭ লাখ টাকা, যা আগের বছর ছিল ১ হাজার ৭৩১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩ হাজার ৪৪৪ কোটি ৮৪ লাখ টাকা বা প্রায় ১৯৯ শতাংশ। ওই বছর ব্যাংকটি মোট ৩০ হাজার ২ কোটি ৫১ লাখ টাকা ঋণ বিতরণ করেছে। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ১৭ দশমিক ২৫ শতাংশে, যা ব্যাংক খাতে অতি ঝুঁকিপূর্ণ ধরা হয়।
২০২৩ সালে ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ২৮ হাজার ৪৮৩ কোটি ১০ লাখ টাকা। খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় এর বিপরীতে প্রভিশন হিসেবে সংরক্ষণ করতে হয়েছে ৫৪৪ কোটি ৩৬ লাখ ৮৭ হাজার ৫২৯ টাকা, যা সরাসরি মুনাফায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ফলে ২০২৪ সালে ব্যাংকটির নিট মুনাফা হয়েছে মাত্র ৬৪ কোটি ৯৫ লাখ ৬৭ হাজার ১৩১ টাকা এবং শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছে মাত্র ০.৫৮ টাকা।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে কোম্পানিটি ২০২৪ সালে ‘নো ডিভিডেন্ড’ ঘোষণা করে। ফলে বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন এবং কোম্পানিটির শেয়ার দর নেমে আসে নিচে। এমন পরিস্থিতিতেও ব্যাংকটির শীর্ষ পর্যায়ের ব্যয়ের চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। ২০২৪ সালে চিফ এক্সিকিউটিভকে বেতন ও ফিস বাবদ দেওয়া হয়েছে ১ কোটি ৭৯ লাখ ২ হাজার ২৩২ টাকা। আগের বছর তা ছিল ১ কোটি ৬০ লাখ ১৫ হাজার ৭১৫ টাকা।
অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বেড়েছে ১৮ লাখ ৮৬ হাজার ৫১৭ টাকা। একইভাবে পরিচালকদের সম্মানীর পরিমাণও বেড়েছে। ২০২৪ সালে পরিচালকদের ফিস ছিল ৬৮ লাখ ৪ হাজার ৬০০ টাকা, যা আগের বছর ছিল ৪৭ লাখ ৮ হাজার টাকা। এতে ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ২০ লাখ ৯৬ হাজার ৬০০ টাকা।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ছিলেন প্রয়াত মো. আব্দুল জলিল, যিনি আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন। তার প্রভাবেই গত ১৫ বছর ধরে ব্যাংকটি সরকারের সুনজরে ছিল এবং নানা রকম সুযোগ-সুবিধা পেয়েছে। তবে গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ব্যাংকটির প্রকৃত চিত্র প্রকাশ্যে আসে।
তারা আরও জানান, ব্যাংকটির ব্যবসা কমে গেছে এবং প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। এর মধ্যেই ব্যাংকটি তৃতীয় সাব-অর্ডিনেটেড বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে ৮০০ কোটি টাকা সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বন্ডটি শেয়ারে রূপান্তরযোগ্য নয়, জামানতবিহীন এবং ভাসমান সুদের হারে কুপনযুক্ত। এর পূর্ণ অবসায়ন নির্ধারিত মেয়াদ শেষে ঘটবে। এই বন্ড ইস্যু কার্যকর হবে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএসইসি’র অনুমোদন সাপেক্ষে।
এদিকে কাগুজে প্রতিষ্ঠান খুলে ব্যাংক থেকে অর্থ সরানোই তার মূল লক্ষ্য। ব্যাংকিং এবং নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কখনও শেয়ার কিনে, কখনও ডিরেক্টরশিপ নিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেন তিনি। প্রতারণা, জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ লোপাটই তার নেশা। এ হেন এই লুটেরার নাম শহীদুল আহসান।
‘আহসান গ্রুপ’ তথা এজি গ্রুপ’র কর্ণধার হিসেবেই যিনি সমধিক পরিচিত। আওয়ামীলীগের আমলে কতিপয় ব্যক্তিকে সামনে রেখে তিনি গত দেড় দশক ধরে চালিয়ে যাচ্ছেন লুটপাট। এই সময়ের মধ্যে তিনি হাতিয়ে নিয়েছেন শত শত কোটি টাকা। লুণ্ঠিত অর্থের সামান্যকিছু দেশে বিনিয়োগ দেখিয়ে পুরো অর্থই পাচার করেন বিভিন্ন দেশে।
শহীদুল আহসান এবং তার ভাইদের অর্থ লোপাটের বিষয়টি বহু আগেই ধরা পড়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি ইউনিট-বিএফআইইউ। তার আর্থিক অপরাধের বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)তে সংস্থাটি বহু আগেই প্রতিবেদন পাঠায়। কিন্তু অদৃশ্য ইশারায় শহীদুল আহসানের টিকিটিও স্পর্শ করেনি কোনো সংস্থা।
গভীর তথ্যানসুন্ধানে জানা যায়, নোয়াখালিতে জন্ম দেশের অর্থনৈতিক খাতের লুটেরা শহীদুল আহসানের। বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচারিত প্রোফাইলে রয়েছে তার ব্যক্তি জীবন সংক্রান্ত ইতিবাচক সব তথ্য। যেমন তার বায়োডাটায় উল্লেখ রয়েছে, শহীদুল আহসান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজ বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ধীরে ধীরে নিজেকে শিল্পপতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন শহীদুল আহসান।
শহীদুল আহসানের আবির্ভাব হয় বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময় নিজেকে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদের ঘনিষ্ঠজন পরিচয়ে গর্ব বোধ করতেন। যদিও ব্যরিস্টার মওদুদও তাকে খুব একটা পাত্তা দিতেন না। স্বার্থের টানাপড়েনে এক সময ব্যারিস্টার মওদুদ এবং শহীদুল আহসানের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি হয়।
শহীদুল যোগাযোগ শুরু করেন আওয়ামী লীগের তৎকালিন সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিলের সঙ্গে। একপর্যায়ে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের পরিচালকও হন। আবদুল জলিল বাণিজ্যমন্ত্রী থাকাকালে শহীদুল বিভিন্ন বাণিজ্যিক কোটা নিয়ন্ত্রণ করতেন। আব্দুল জলিলকেও কেনাবেচনা করতেন। এ ঘটনা আব্দুল জলিলের কাছে ধরা পড়ে গেলে শহীদুল আহসানকে দূরে সরিয়ে দেন। এক পর্যাযে পরিচালক পদ থেকেও বাদ দেয়া হয় শহীদুল আহসানকে।
এরপর তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘দেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্স’। সেখানেও তার নানা ধরণের অনিয়ম-দুর্নীতি চলতে থাকে। একপর্যায়ে আব্দুল জলিলের হাতেপায়ে ধরে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। জলিল তাকে ক্ষমা করলে শহীদুল পুনরায় মার্কেণ্টাইল ব্যাংকের পরিচালক পদে আসীন হন। এরপর থেকে শুরু হয় তার নামে-বেনামে ঋণ জালিয়াতি। ঋণ জালিয়াতি সম্পর্কে শহীদুল আহসানের কোনো রাখঢাকও নেই। তার কথা স্পষ্ট। বলেন, যারা আমাদের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ উত্থাপন করেছে তাদের বিরুদ্ধে লিগ্যাল নোটিশ দিচ্ছি।
বেনামী প্রতিষ্ঠানে ঋণ নিয়ে দুই ব্যাংক লুট: শহীদুল আহসান পর পর ২টি বেসরকারি ব্যাংকে গ্রাহকের রাখা আমানতের টাকা অর্থ লুট করেছেন। ছোট-বড় অসংখ্য কাগুজে প্রতিষ্ঠান তৈরি করে অন্যান্য ব্যাংক থেকেও তিনি হাতিয়েছেন শত শত কোটি টাকা। দেশের ভেতরে তার রয়েছে নামে বেনামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। গড়েছেন বিপুল অবৈধ সম্পদ। ভয়াবহ আর্থিক কেলেংকারি আড়াল করতে তিনি ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন একটি স্যাটেলাইট টিভি ও ইংরেজী দৈনিককে।
একাধিক সংবাদ মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ঢালছেন অর্থ। আর্থিক খাতে শহীদুল আহসান একজন খল নায়ক। কিন্তু মিডিয়ার কল্যাণে তাকে মানুষ জানে ‘নায়ক’ হিসেবে। তবে দুদকসহ একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা তাকে নিয়ে তদন্ত চালাচ্ছে দীর্ঘ দিন ধরে। তাই তার মুখোশ উন্মোচন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, এজি গ্রুপের মালিক শহীদুল আহসানের বিরুদ্ধে দুদক আইনের ১৯ ও ২০ ধারা ও কমিশন বিধিমালার ২০ বিধিসহ ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬০ ধারা অনুসারে তদন্ত চলছে। মার্কেন্টাইল ব্যাংকের আগ্রাবাদ ও মাদামবিবির হাট শাখা পরিদর্শনকালে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক অনুসন্ধানে এ অনিয়ম ধরা পড়ে।
এটিকে ‘ফৌজদারি অপরাধ’ গণ্য করে বিএফআইইউ একটি অনুসন্ধান প্রতিবেদন প্রণয়ন করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, মাদামবিবির হাট শাখা ‘মেসার্স রিজেন্ট কর্পোরেশন’র নামে ২০১১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গুলশান শাখার গ্রাহক ‘মেসার্স ফ্রেন্ডস ট্রের্ডাস’-এর অনুকূলে টিএসপি সার কেনার নামে ২ কোটি টাকা করে মোট ১০ কোটি টাকার ৫টি স্থানীয় ঋণপত্র খোলা হয়।
বিধি মোতাবেক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জামানতের বিপরীতে ১০ শতাংশ মার্জিন রেখে সর্বোচ্চ ২ কোটি টাকার লোকাল এলসি খোলার অনুমোদন দিতে পারেন। কিন্তু রিজেন্টের ক্ষেত্রে এ নিয়ম মানা হয়নি। এ ছাড়া আগ্রাবাদ শাখা থেকেই ‘মেশমার্ক লিমিটেড’ নামে আরেকটি শিপ ব্রেকার্স প্রতিষ্ঠানের নামে ক্ষমতার অপব্যবহার করে এবং বোর্ডের অনুমতি ছাড়াই ঋণ মঞ্জুর করান শহীদুল আহসান।
মঞ্জুরকৃত ঋণের ওই অর্থ আবার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর ও পুনরায় স্থানান্তর করা হয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনকালে ধরা পড়ে। এ খাতে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ৯ কোটি ৭৬ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন বলা হয়েছে।
ডিএসইর সূত্র মতে, মার্কেন্টাইল ব্যাংকের মোট শেয়ার সংখ্যা ১১০ কোটি ৬৫ লাখ ৭৫ হাজার ৪৩৫টি। এর মধ্যে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে রয়েছে ৩৯ দশমিক ২৮ শতাংশ শেয়ার, উদ্যোক্তা পরিচালকদের রয়েছে ৩৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ২৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শেয়ার রয়েছে ০ দশমিক ৭২ শতাংশ। সূত্র: দৈনিক দেশ প্রতিক্ষণ ও দেশ প্রতিক্ষণ।

