পুঁজিবাজারে সবচেয়ে বড় সমস্যা ভালো কোম্পানি তথা শেয়ারের অভাব
স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, শেয়ারবার্তা ২৪ ডটকম, ঢাকা: দেশের পুঁজিবাজারের সব চেয়ে বড় সমস্যা ভালো কোম্পানির শেয়ারের অপ্রতুলতা। গত দুই বছরের ও বেশি সময় ধরে দেশের পুঁজিবাজারগুলোতে কোনো আইপিও আসেনি। তালিকাভুক্ত হয়নি কোনো কোম্পানি। অথচ বিগত দেড় দশকের ও বেশি সময় ধরে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চার মেয়াদে শতাধিক কোম্পানি তালিকাভুক্ত হলেও হাতে গোনা কয়েকটি ছাড়া বেশিরভাগই দুর্বল মৌলভিত্তির । বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন এ মুহূর্তে বাজারে চাহিদার তুলনায় সরবরাহের অভাবই সবচেয়ে বড় সমস্যা।
সর্বশেষ ২০২৪ সালের মার্চ মাসে ওষুধ ও রসায়ন খাতের কোম্পানি টেকনোড্রাগসের আইপিও প্রস্তাব জমা পড়েছিল, যা ওই বছর জুলাই মাসে তালিকাভুক্ত হয়। ওই বছর ৫ জুলাই দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন কমিশন দয়িত্ব নিলেও এই পর্যন্ত কোনো কোম্পানি আইপিও’র আবেদন করেনি। আবার এর আগে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর বেশিরভাগই নন পারফর্মিং যেগুলো এখন বাজারের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সম্প্রতি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের এক রিপোর্টে এগুলোর মধ্যে ৩০টি কোম্পানির তালিকা প্রকাশ করেছে যেগুলো দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদনে নেই। আবার এ ধরনের অনেক কোম্পানি রয়েছে যেগুলো কোনভাবে স্টক এক্সচেঞ্জের লিস্টিং শর্ত পূরণ করে টিকে থাকলেও বাজারে এগুলোর কোনো পণ্য চোখে পড়ে না।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, এমনিতেই বাজারের গভীরতা নেই, তার ওপর দুই বছর ধরে নতুন কোম্পানির আইপিও না থাকায় বাজারে বিনিয়োগকারীরা চাইলেও বিনিয়োগে আসতে পারছেন না। তারা মনে করছেন, বাজারে চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে পুঁজিবাজার তার স্বাভাবিক আচরণ ধরে রাখতে পারে না। বেড়ে যায় কারসাজিকারীদের দৌরাত্ম্য। সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তারা বলেন, বাজারে ভালো শেয়ারের সরবরাহ থাকলে বিনিয়োগকারীরা এ ধরনের ঝুঁকি নিতেন না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশিষ্ট পুঁজিবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, মানুষকে ভালো শেয়ার দিতে না পারলে তারা কোথায় বিনিয়োগ করবে। দীর্ঘদিন ধরে পুঁজিবাজারে ভালো কোনো কোম্পানি আসছে না। গত অন্তর্বর্তী সরকার বারবার চেষ্টা করেও কোনো সরকারি কোম্পানি তালিকাভুক্ত করতে পারেনি। এর আগেও বিভিন্ন সময় অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ ধরনের উদ্যোগ নেয়া হলেও তা বারবারই ব্যর্থ হয়েছে।
এমনকি দেশে বেশ কয়েকটি বহুজাতিক কোম্পানি কার্যক্রম চালাচ্ছে যেগুলোর একটি অংশের মালিকানায় রয়েছে বাংলাদেশ সরকার। অথচ সরকারের হাতে থাকা এ শেয়ারও সরকার বাজারে আনতে পারছে না। বেসরকারি অনেক ভালো কোম্পানি বছরের পর বছর ধরে ভালো মুনাফা নিয়ে ব্যবসা করে যাচ্ছে; কিন্তু এসব কোম্পানিও পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তিতে উৎসাহ দেখাচ্ছে না। সবগুলো বিষয় নিয়ে নতুন সরকারকে ভাবতে হবে।
ড. আবু আহমেদ আরো বলেন, বিএনপি সরকার তাদের মেনিফেস্টোতে পুঁজিবাজার বিষয়ে অনেক ভালো কথা বলেছেন। এখন সময় এসেছে পুঁজিবাজারের জন্য ভালো কিছু করার। অতীতে বিএনপি সরকারের সময় পুঁজিবাজার নিয়ে কোনো স্ক্যান্ডাল ছিল না। বিনিয়োগকারীরা আশা করছে এবারো তারা ভালো কিছু করবে। তবে সব চেয়ে বেশি প্রয়োজন ভালো কোম্পানি বাজারে আনা। ভালো শেয়ার না পেলে দেশী বা বিদেশী প্রত্যাশিত মাত্রায় কোনো বিনিয়োগই পুঁজিবাজারে আশা করা যায় না। সরকার বারবার বলছে পুঁজিবাজারে সংস্কার করা হবে।
যত দ্রুত সম্ভব এটা করা দরকার। বিগত কমিশন বেশ কয়েকটি আইনে পরিবর্তন এনেছে যেখানে অনেক ভালো দিক রয়েছে। তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রেও আইন সংশোধন করা হয়েছে। এখন সরকার চাইলে নতুন কমিশন গঠন করবে। আর নতুন কমিশন চাইলে আগের কমিশনের ভালো সংস্কারগুলো কার্যকর করতে পারে।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের সিকিউরিটিজ হাউজের প্রধান নির্বাহী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ভালো শেয়ারের সরবরাহ ছাড়া দেশী বা বিদেশী কোনো বিনিয়োগই আকর্ষণ সম্ভব নয়। গত দু’বছর কোনো কোম্পানি বাজারে আসেনি। কোনো কোম্পানি আইপিও প্রস্তাবও জমা দেয়নি। এটা খুবই দুঃখজনক। সরকার হয়তো কমিশন পুনর্গঠনের কথা ভাবছে।
আর কমিশন পুনর্গঠন করা হলে সর্বাগ্রে গুরুত্ব দিতে হবে ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তি কিভাবে করা যায়। আর এর জন্য শুধু মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো দিকে তাকিয়ে থাকলে হবে না। সরকারকেই উদ্যোগ নিতে ভালো কোম্পানি ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে বাজারে নিয়ে আসার। এর জন্য প্রয়োজনে আইনের সংশোধন করতে হবে; অর্থাৎ এ মুহূর্তে ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তির কোনো বিকল্প নেই।
অন্তর্বর্র্তী সরকারের সময় গঠিত পুঁজিবাজার সংস্কার কমিঠির সুপারিশের ভিত্তিতে বর্তমান বিএসইসি কর্তৃক সংশোধিত নতুন আইপিও বিধিমালা গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে; কিন্তু এখনো পর্যন্ত ২০২৫ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী ব্যবহার করে কোনো কোম্পানি প্রাথমিক শেয়ার ছাড়ার আবেদন করেনি।
সংশোধিত নিয়মে বলা হয়েছে, অর্থবছর শেষ হওয়ার ১২০ দিনের মধ্যে কোম্পানিগুলো আইপিও প্রস্তাব জমা দিতে পারবে। সে হিসাবে ক্যালেন্ডার বছর অনুসরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নির্ধারিত সময়সীমা ছিল ২৮ এপ্রিল; কিন্তু পাওয়া তথ্য মতে এ পর্যন্ত কোনো আইপিও প্রস্তাব জমা পড়েনি।
তবে ইস্যু ব্যবস্থাপকদের মতে, একটি অর্থবছর শেষ হওয়ার পর আর্থিক বিবরণী প্রস্তুত করতে কমপক্ষে এক মাস সময় লাগে। এরপর তা নিরীক্ষা ও পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন পেতে আরো সময় প্রয়োজন হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে সাধারণত দুই মাসের কম সময় লাগে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এক মাসের মধ্যে নিরীক্ষা সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। ফলে ২০২৬ অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী দিয়ে আইপিও আনতে হলে কোম্পানিগুলোকে অন্তত আরো কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হবে।
আইপিও’র সংশোধিত বিধিমালায় কোনো কোম্পানির তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে স্টক এক্সচেঞ্জগুলোতে প্রাথমিক অনুমোদনের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। আগের নিয়মে আইপিও অনুমোদন পেতে অনেক সময় লাগত। কিছু ক্ষেত্রে এক বছরেরও বেশি সময় লেগেছে অনুমোদন পেতে। নতুন বিধিমালায় এই প্রক্রিয়া দ্রুত করার জন্য স্টক এক্সচেঞ্জ, ইস্যু ব্যবস্থাপক এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন স্টক এক্সচেঞ্জের সুপারিশের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ২০ দিনের মধ্যে আইপিও প্রস্তাব গ্রহণ বা বাতিল করবে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতিতে ৪০ দিনের মধ্যে এবং বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে ৫৩ দিনের মধ্যে আইপিও অনুমোদন বা বাতিলের পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। এ ছাড়া শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তি থাকলে কোম্পানিগুলো এখন বেশি প্রিমিয়াম দাবি করতে পারবে। আগের নিয়মে মূল্য নির্ধারণে সীমাবদ্ধতা থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান ন্যায্য মূল্যায়ন পেত না বলে অভিযোগ ছিল।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতামতের ভিত্তিতে নতুন বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে, যাতে তালিকাভুক্তির পথে থাকা জটিলতা ও বিলম্ব দূর করা যায়। এতে একাধিক মূল্যায়ন পদ্ধতি ব্যবহারের সুযোগও রাখা হয়েছে। তবুও এখন পর্যন্ত নতুন নিয়মে কোনো কোম্পানি আইপিও প্রস্তাব জমা দেয়নি, যা বাজারের স্থবিরতা নির্দেশ করছে।
এরই মধ্যে সরকার নতুন কমিশন গঠন করলে সেই কমিশন আদৌ এ সংশোধনী কার্যকর করবে কি না তা সময়ই বলে দেবে। আর পুনর্গঠিত কমিশন তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে নতুন কোন বিধিমালা করতে চাইলে হয়তো আগামী আরো এক বছর নতুন কোনো কোম্পানির তালিকাভুক্তির অনিশ্চয়তা থেকে যাবে।

