৩ ইস্যুতে পুঁজিবাজারে শেয়ার বিক্রির চাপে সূচকের রেকর্ড দরপতন
স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, শেয়ারবার্তা ২৪ ডটকম, ঢাকা: জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের বিপুল বিজয়ে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীরা নির্বাচন-পরবর্তী প্রথম কার্যদিবসে ব্যাপক আস্থার প্রতিফলন ঘটালেও খুব দ্রুতই তা শেষ হয়ে যায়। মুলত ইরানে ইসরাঈল ও যুক্তরাষ্ট্রে হামলার পর সেই চাঙ্গাভাবে চিড় ধরেছে। এর পাশাপাশি শোনা যাচ্ছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার নেতৃত্বে পরিবর্তনের গুঞ্জন। এছাড়া নতুন করে প্রশ্নে উঠেছে ইরান যুদ্ধ নাকি বিএসইসির নেতৃত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তায় বাজারে এমন নিম্নমুখী প্রবণতার কারণ কী।
সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচকের বড় দরপতনে লেনদেন শেষ হয়েছে। ফলে পুঁজিবাজার দীর্ঘদিন ধরে অস্থিরতার বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। কখনো অস্বাভাবিক উত্থান, আবার কখনো আকস্মিক পতন এমন ওঠানামা বিনিয়োগকারীদের মনে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
শেয়ার দরে বারবার ধস, কারসাজির অভিযোগ ও দুর্বল তদারকির কারণে অনেক ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। ফলে পুঁজিবাজারে তাদের আস্থা ফেরানোই এখন সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি। এছাড়া টানা পাঁচ কার্যদিবস দরপতনে ডিএসইর ৬৬৪ পয়েন্ট সূচকের দরপতন হয়েছে।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার যে কোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি শুধু বিনিয়োগের মাধ্যমই নয়, বরং শিল্প ও ব্যবসা খাতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের অন্যতম উৎস। কিন্তু আমাদের পুঁজিবাজার এখনো সেই কাঙ্খিত স্থিতিশীলতা অর্জন করতে পারেনি। স্বচ্ছতার অভাব, তথ্যের অসমতা ও কিছু অসাধু গোষ্ঠীর কারসাজি প্রায়ই বাজারকে অস্থিতিশীল করে তোলে।
ফলে বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা বর্তমানে পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় সমস্যা। অতীতে সেখানে বড় ধরনের ধসের ঘটনা এবং অনিয়মের যথাযথ বিচার না হওয়ায় অনেক বিনিয়োগকারী এখনো আশঙ্কার মধ্যে রয়েছেন। ফলে বাজারে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের পরিবেশ দুর্বল হয়ে পড়েছে।
এছাড়া বাজারে মানসম্পন্ন কোম্পানির সংখ্যাও তুলনামূলকভাবে কম। দেশের অনেক বড় ও লাভজনক প্রতিষ্ঠান এখনো পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত নয়। এতে বিনিয়োগকারীদের জন্য ভালো কোম্পানিতে বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত হয়ে আছে। একই সঙ্গে বাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ কম থাকায় এটি অনেক সময় গুজবনির্ভর হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কার্যকর সংস্কার অপরিহার্য।
প্রথমত, বাজারে সুশাসন নিশ্চিত করতে এবং কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এছাড়া নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্ষমতা বাড়িয়ে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে বাজার তদারকি জোরদার করা জরুরি বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, বড় ও মানসম্মত কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করতে উৎসাহ দেওয়াও প্রয়োজন। বিশেষ করে লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর আংশিক পুঁজিবাজারে ছাড়লে এর গভীরতা ও স্থিতিশীলতা বাড়তে পারে।
বাজার-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একাধিক কারণে পুঁজিবাজারে বড় ধরনের দরপতন হয়েছে। প্রথমত, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ায় বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ে একধরনের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যেও তার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে অর্থনীতি আবারও বড় ধরনের অনিশ্চয়তায় পড়তে পাওে এই শঙ্কা থেকে আতঙ্কগ্রস্ত বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রি করে দেন।
দ্বিতীয়ত, পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) শীর্ষ পদে পরিবর্তন নিয়েও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনেক দিন ধরে নানা ধরনের আলাপ-আলোচনা চলছে।
গত শনিবারের পর বাজারে খবর ছড়িয়ে পড়ে বিএসইসিতে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেটি হয়নি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া খবরটি ‘গুজব’ ছিল। ফলে পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বর্তমান চেয়ারম্যানের পদত্যাগ নিয়ে একধরনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। সেটি না হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ দরপতন ঘটিয়ে চেয়ারম্যানকে সরাতে সচেষ্ট হয়ে উঠেছেন বলে মনে করছেন অনেকে। এ কারণে বাজারে বড় ধরনের দরপতন হয়েছে।
তৃতীয়ত, পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর ঘনিয়ে আসায় অনেক বিনিয়োগকারী প্রয়োজনীয় নগদ অর্থ সংগ্রহ করতে শেয়ার বিক্রি করছেন। ফলে বাজারে শেয়ার বিক্রির চাপ আরও বেড়ে গেছে।
জানা গেছে, সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) কমেছে বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ার দর। তবে টাকার পরিমানে লেনদেন কিছুটা বেড়েছে। ডিএসই সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। দিনশেষে ডিএসই ব্রড ইনডেক্স আগের দিনের চেয়ে ২৩১ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ৫ হাজার ৮ পয়েন্টে। আর ডিএসই শরিয়াহ সূচক ৩৫ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ১ হাজার ১৩ পয়েন্টে এবং ডিএসই ৩০ সূচক ৯১ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ১ হাজার ৯১৯ পয়েন্টে।
দিনভর লেনদেন হওয়া ৩৯০ কোম্পানি ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মধ্যে দর বেড়েছে ১০ টির, দর কমেছে ৩৭১ টির এবং দর অপরিবর্তিত রয়েছে ৯ টির। ডিএসইতে ৫৩১ কোটি ৮৮ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। যা আগের কার্যদিবস থেকে ৭২ কোটি ৪৬ লাখ টাকা কম। এর আগের দিন লেনদেন হয়েছিল ৪৫৯ কোটি ৪২ লাখ টাকার ।
অপরদিকে, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ৪৯৬ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৩২৮ পয়েন্টে। সিএসইতে ১৬৪ টি কোম্পানি লেনদেনে অংশ নিয়েছে। এসব কোস্পানির মধ্যে ১১ টির দর বেড়েছে, কমেছে ১৪৭ টির এবং ৬ টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। সিএসইতে ১৬ কোটি ৩৭ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে।

