মাসুদ কমিশন ভেঙে পড়া আস্থা পুনর্গঠন করতে পারবে তো?
শেয়ারবার্তা ২৪ ডটকম, ঢাকা: দেশের পুঁজিবাজার দীর্ঘদিন ধরে অস্থিরতার বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। কখনো অস্বাভাবিক উত্থান, আবার কখনো আকস্মিক পতন এমন ওঠানামা বিনিয়োগকারীদের মনে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ তৈরি করছে। ঠিক সে সময় বাজারের আস্থা ফেরাতে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নতুন চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পেয়েছেন মাসুদ খান। পুঁজিবাজার সংস্কারের নতুন অধ্যায় হিসেবে মাসুদ খানকে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশের সামগ্রিক কর্পোরেট ইতিহাসে মাসুদ খান এক অনন্য নাম। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি দেশি-বিদেশি বড় বড় কোম্পানিতে অত্যন্ত সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
তবে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার (বিএসইসি) নেতৃত্বের পরিবর্তন নতুন কোনো ঘটনা নয়। গত দেড় দশকে বারবার চেয়ারম্যান ও কমিশন বদলেছে, বদলেছে প্রতিশ্রুতির ভাষা, পরিবর্তনের অঙ্গীকার এবং সংস্কারের রূপরেখা। কিন্তু বাস্তবতা হলো: বাজারে স্থিতিশীলতা আসেনি, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরেনি,
বরং দীর্ঘ সময় ধরে অনিয়ম, কারসাজি, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক প্রভাব এবং নীতিগত অস্থিরতার কারণে দেশের পুঁজিবাজার এক গভীর আস্থাহীনতার সংকটে নিমজ্জিত হয়েছে। এই বাস্তবতার মধ্যেই নতুন চেয়ারম্যান মাসুদ খানের নেতৃত্বে নতুন কমিশন দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। তাঁদের সামনে যেমন সম্ভাবনা আছে, তেমনি রয়েছে ভয়াবহ চ্যালেঞ্জ।
কারণ তাঁরা এমন একটি বাজারের দায়িত্ব নিয়েছেন, যেখানে বিনিয়োগকারীরা বছরের পর বছর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন; যেখানে ভালো কোম্পানির চেয়ে খারাপ কোম্পানির আধিপত্য বেড়েছে; যেখানে কারসাজিকারীদের দৌরাত্ম্যে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বারবার নিঃস্ব হয়েছেন। নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিরপেক্ষতা ও সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। নতুন কমিশনের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা তাই অনেক বড় ও অনেক বেশি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এই কমিশন কি সত্যিই বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারবে? নাকি অতীতের মতো তারাও শেষ পর্যন্ত একই ব্যর্থতার চক্রে আটকে যাবে?
এছাড়া বাংলাদেশের পুঁজিবাজার বহু বছর ধরেই এক ধরনের আস্থার সংকটের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। কখনো নীতিগত অস্পষ্টতা, কখনো নিয়ন্ত্রক দুর্বলতা, আবার কখনো অর্থনীতির সামগ্রিক অস্থিরতা বাজারকে তার স্বাভাবিক গতিপথ থেকে বিচ্যুত করেছে। তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন, নতুন সরকারের সংস্কারমুখী অবস্থান এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার পর বাজারে নতুন করে আশার আলো দেখা যাচ্ছে। প্রশ্ন হলো, এই আশাবাদ কতটা বাস্তব, আর কতটা প্রত্যাশা নির্ভর?
অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর উপস্থাপিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট নিঃসন্দেহে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট। তবে বাজেটের আকারের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এর দর্শন। সরকার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে ঋণনির্ভর প্রবৃদ্ধি নয়, উৎপাদন ও বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে অর্থমন্ত্রী সতর্ক করেছেন যে আগামী দুই বছর সহজ হবে না। অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের পথে নিতে হলে কিছু কঠিন ও অজনপ্রিয় সিদ্ধান্তও গ্রহণ করতে হবে।
বাস্তবতা হলো, সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। একদিকে বড় অঙ্কের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য, অন্যদিকে বিপুল ঋণ পরিশোধের চাপ। উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানোর প্রয়োজন থাকলেও ঋণের কিস্তি পরিশোধে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে। ফলে বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে পুঁজিবাজারের ইতিহাসে ২০১০ সালের ধস একটি বড় ট্র্যাজেডি। লাখ লাখ বিনিয়োগকারী তখন সর্বস্ব হারিয়ে সর্বশান্ত হয়েছিলেন। অনেকে আত্মহত্যা করেছেন, অনেকে নিঃস্ব হয়ে পথে বসেছেন। সেই ধসের পর প্রত্যাশা ছিল রাষ্ট্র শিক্ষা নেবে, বাজারকে সংস্কার করবে, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তুলবে এবং বাজারকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের কার্যকর প্ল্যাটফর্মে রূপ দেবে।
কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখেছি উল্টো চিত্র। ২০১১ সালে এম খাইরুল হোসেন দায়িত্ব নেওয়ার পর বাজারে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরলেও ধীরে ধীরে আইপিও বাজারে ভয়াবহ অনিয়ম ছড়িয়ে পড়ে। দুর্বল ও লোকসানি কোম্পানিকে অতিমূল্যায়নে বাজারে আনা হয়। অনেক কোম্পানি তালিকাভুক্তির পর বিনিয়োগকারীদের টাকা নিয়ে কার্যত অদৃশ্য হয়ে যায়। এতে আইপিও বাজারের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এরপর শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের সময়ে বাজারে কৃত্রিম উত্থান-পতনের সংস্কৃতি আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
একটি বিশেষ গোষ্ঠী বা সিন্ডিকেটের হাতে বাজারের নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে উচ্চারিত হয়েছে। অসংখ্য দুর্বল ও ফ্লোরবিহীন শেয়ার অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হয়। পরে সেই শেয়ারের পতনে লাখো বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হন। বাজারে স্বচ্ছতার বদলে গুজবনির্ভর বিনিয়োগ বেড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিষ্ক্রিয়তা কিংবা পক্ষপাতিত্ব নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
খন্দকার রাশেদ মাকসুদের সময়কে তুলনামূলকভাবে কম বিতর্কিত বলা হলেও সেখানে নেতৃত্বের দৃঢ়তা ও কর্মচাঞ্চল্যের ঘাটতির অভিযোগ ছিল। বাজারে কাঙ্খিত সংস্কার হয়নি। বিএসইসির অভ্যন্তরেও স্থবিরতা তৈরি হয়। এমনকি কমিশনের সদস্যদের কর্মচারীদের হাতে অপদস্থ হওয়ার ঘটনাও দেশের পুঁজিবাজারের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা। এটি কেবল প্রশাসনিক দুর্বলতার প্রতীক নয়; বরং নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ারও ইঙ্গিত। এই দীর্ঘ ব্যর্থতার ইতিহাস নতুন কমিশনের জন্য এক কঠিন বাস্তবতা তৈরি করেছে। কারণ, এখন শুধু বাজার পরিচালনা করলেই হবে না; ভেঙে পড়া আস্থা পুনর্গঠন করতে হবে।
আর আস্থা কোনো প্রশাসনিক নির্দেশে তৈরি হয় না। এটি গড়ে ওঠে সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং ধারাবাহিক ন্যায্যতার মাধ্যমে। নতুন চেয়ারম্যান মাসুদ খান দায়িত্ব নিয়েই যে কথাগুলো বলেছেন, সেগুলো নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। তিনি বাজারকে প্রযুক্তিনির্ভর ও ডিজিটালাইজড করার কথা বলেছেন। অযাচিত নিয়ন্ত্রণ কমানোর কথা বলেছেন। একই সঙ্গে যেখানে প্রয়োজন, সেখানে ‘স্মার্ট রেগুলেশন’ বা বুদ্ধিদীপ্ত কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের কথাও বলেছেন। বাজারে কারসাজির বিরুদ্ধে রিয়েল-টাইম ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
কথাগুলো গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে সবচেয়ে বড় সংকট- প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবতার ব্যবধান। অতীতেও বহু চেয়ারম্যান দায়িত্ব নিয়ে সংস্কারের অঙ্গীকার করেছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক চাপ, প্রভাবশালী গোষ্ঠীর দৌরাত্ম্য, অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি এবং প্রশাসনিক অদক্ষতার কারণে সেসব প্রতিশ্রুতির অনেকটাই কাগজে সীমাবদ্ধ থেকেছে। সুতরাং নতুন কমিশনের সামনে প্রথম ও প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমাণ করা।
বাজারে আস্থা ফেরাতে হলে প্রথমেই নিশ্চিত করতে হবে: কারসাজিকারী যেই হোক, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অতীতে দেখা গেছে, অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও গোষ্ঠী বারবার বাজারে কারসাজি করলেও কার্যকর শাস্তি হয়নি। তদন্ত কমিটি হয়েছে, প্রতিবেদন জমা হয়েছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত শাস্তির মুখোমুখি হয়েছেন খুব কম মানুষ। এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মনে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে পুঁজিবাজারে বড় অপরাধীরা শেষ পর্যন্ত পার পেয়ে যায়। এই সংস্কৃতি ভাঙতে না পারলে কোনো সংস্কারই টেকসই হবে না।

