স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, শেয়ারবার্তা ২৪ ডটকম, ঢাকা: মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কোনো সুরাহা না হওয়ায় এর প্রভাব রয়ে গেছে পুঁজিবাজারে। বিনিয়োগকারীরা পুরোপুরি আস্থা আনতে পারছেন না বাজারের ওপর। তাই বিক্রয়চাপের মুখে একপ্রকার অস্থির আচরণ করছে পুঁজিবাজার। তবে মাঝে মধ্যে সূচকের কিছুটা উত্থান হলেও তা স্থায়ী হচ্ছে না। ফলে তারল্য নয়, আস্থার সংকটেই স্থিতিশীল হচ্ছে না পুঁজিবাজারে।

এক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থার আরো কার্যকরী ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। এছাড়া বাংলাদেশের পুঁজিবাজার আজ এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের মুখোমুখি। একদিকে সংস্কার, নীতিগত পরিবর্তন ও কাঠামোগত রূপান্তরের ধারাবাহিক প্রচেষ্টা; অন্যদিকে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বাড়তে থাকা অনিশ্চয়তা ও আস্থার ঘাটতি।

সাম্প্রতিক সময়ের বাজারচিত্রে এই দুই প্রবণতা যেন পাশাপাশি এগোলেও বাস্তবে একে অপরের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। নীতিনির্ধারকদের উদ্যোগে বাজারকে আরও স্বচ্ছ, গতিশীল ও বিনিয়োগবান্ধব করার চেষ্টা অব্যাহত থাকলেও, বাস্তবতায় তার প্রতিফলন খুব স্পষ্ট নয়। ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে প্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণকারীদের মধ্যেও এক ধরনের দ্বিধা ও সংশয় তৈরি হয়েছে।

তবে পুঁজিবাজারে বর্তমানে তীব্র আস্থার সংকট ও দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার মধ্য দিয়ে এক জটিল সময় অতিক্রম করছে। সাম্প্রতিক সময়ে গত নয় মাসে প্রায় ৬০ হাজারের বেশি বিনিয়োগকারী বাজার থেকে নিস্কিয় হয়ে পড়েছেন, যা বর্তমান পরিস্থিতির গভীরতা স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে।

সুশাসনের ঘাটতি, মানসম্পন্ন শেয়ারের অভাব, ফ্লোর প্রাইসের মতো নীতিগত সীমাবদ্ধতা এবং সুদের হার বৃদ্ধিসহ সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপ বিনিয়োগকারীদের ধীরে ধীরে পুঁজিবাজার থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। এর ফলে বাজারে তারল্য কমছে, লেনদেন স্থবির হয়ে পড়ছে এবং আস্থার সংকট আরও তীব্র হচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এর ভূমিকা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। আস্থার সংকট কাটাতে সংস্থাটির পুনর্গঠন, নেতৃত্বে পরিবর্তন এবং কার্যক্রমে গতিশীলতা আনার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিএসইসি মার্জিন রুলস, মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা এবং পাবলিক অফার সংক্রান্ত নীতিমালায় সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে, যার উদ্দেশ্য বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং নতুন মানসম্পন্ন কোম্পানির প্রবেশ সহজ করা।

কিন্তু ২০২৬ সালের এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে বাজারের সার্বিক চিত্রেও মিশ্র ও অস্থির প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সাময়িক বড় উত্থানের পরপরই শেয়ার বিক্রির চাপ তৈরি হচ্ছে, ফলে সূচকে মূল্য সংশোধন এবং পতনের প্রবণতা দেখা দিচ্ছে। পুঁজিবাজারে স্থায়ী ইতিবাচক ধারা তৈরি না হয়ে ওঠানামার একটি চক্রই বেশি দৃশ্যমান। লেনদেনের দিক থেকে কিছুটা আশার ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও তা এখনো ধারাবাহিক নয়; কোনো কোনো দিনে লেনদেন ৮০০ কোটি টাকার বেশি অতিক্রম করলেও সেই গতি স্থায়ী হচ্ছে না।

এছাড়া বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট একদিনে তৈরি হয়নি; বরং এটি দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা, নীতিগত অসংগতি এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপের সম্মিলিত ফল। দীর্ঘ সময় ধরে বাজারের নিম্নমুখী প্রবণতার কারণে অসংখ্য বিনিয়োগকারী ধারাবাহিকভাবে মূলধন হারিয়েছেন, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হতাশা ও অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে এবং নতুন বিনিয়োগের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাজারে মানসম্মত ও মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির অভাব। শক্তিশালী ব্লু-চিপ কোম্পানির সংখ্যা সীমিত থাকায় বিনিয়োগের নিরাপদ ক্ষেত্র সংকুচিত হয়েছে, অন্যদিকে দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ কোম্পানির আধিক্য বাজারের সামগ্রিক গুণগত মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

জানা গেছে, সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচকের মিশ্রাবস্থায় লেনদেন শেষ হয়েছে। তবে বড় মূলধনী কোম্পানির শেয়ারে ভর করে পতন থেকে রক্ষা পেয়েছে পুঁজিবাজার। যার কারণে কমেছে টাকার পরিমানে লেনদেন ও বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ার দর। ডিএসই সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

দিনশেষে ডিএসই ব্রড ইনডেক্স আগের দিনের চেয়ে ১ পয়েন্ট বেড়ে অবস্থান করছে ৫ হাজার ২৫৬ পয়েন্টে। আর ডিএসই শরিয়াহ সূচক .৩০ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ১ হাজার ৬৬ পয়েন্টে এবং ডিএসই ৩০ সূচক ৬ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ১ হাজার ৯৯০ পয়েন্টে।

দিনভর লেনদেন হওয়া ৩৯৪ কোম্পানি ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মধ্যে দর বেড়েছে ১৩১ টির, দর কমেছে ২০১ টির এবং দর অপরিবর্তিত রয়েছে ৬২ টির। ডিএসইতে ৮০৬ কোটি ১৫ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। যা আগের কার্যদিবস থেকে ৩০ কোটি ৩৩ লাখ টাকা কম। এর আগের দিন লেনদেন হয়েছিল ৮৩৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকার।

অপরদিকে, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ১৫ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৭৪১ পয়েন্টে। সিএসইতে ২০৮ টি কোম্পানি লেনদেনে অংশ নিয়েছে। এসব কোম্পানির মধ্যে ৮৪ টির দর বেড়েছে, কমেছে ৯৩ টির এবং ৩১ টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। সিএসইতে ৩১ কোটি ৪২ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে।