কে হতে যাচ্ছেন বিএসইসি চেয়ারম্যান, সরকারের শীর্ষ মহলে চূড়ান্ত তালিকায় মাসুদ খান
স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, শেয়ারবার্তা ২৪ ডটকম, ঢাকা: পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান পদ থেকে খন্দকার রাশেদ মাকসুদকে সরিয়ে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়ার লক্ষ্যে এরইমধ্যে আইনে সংশোধন এনেছে সরকার। ফলে রাশেদ মাকসুদকে সরিয়ে বিএনপি সরকার নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দিতে চায় বলে আলোচনা চলছে। নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে সরকারের শীর্ষ মহলে চূড়ান্তের তালিকায় রয়েছে মাসুদ খান।
এছাড়াও আলোচনায় রয়েছে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম, বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী ও সাবেক সচিব ফরিদুল ইসলাম।
মুলত বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দায়িত্ব পাওয়া খন্দকার রাশেদ মাকসুদকে সরিয়ে বর্তমান বিএনপি সরকার শেষ পর্যন্ত কাকে বিএসইসির দায়িত্ব দেবে, তা জানতে প্রজ্ঞাপন জারি অবধি অপেক্ষা করতে হবে। পুঁজিবাজারের বড় বিনিয়োগকারী ও স্টেকহোল্ডাররা ডিবিএ সভাপতি সাইফুলকে সমর্থন দিচ্ছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, অবসরপ্রাপ্ত আমলা বা অনভিজ্ঞ শিক্ষাবিদদের তুলনায় তার প্রায়োগিক দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা বেশি, তিনিই বর্তমান সময়ের চাহিদা ভালো বুঝবেন।
আবার হিসাববিদ ও ঝানু করপোরেট পেশাদার মাসুদ খানকেও নিয়ন্ত্রক সংস্থার শীর্ষ পদের জন্য শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ২০২৪ সালের পট পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার ১৩ অগাস্ট বিএসইসির চেয়ারম্যান পদে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এম মাসরুর রিয়াজকে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেয়। বিএনপি ঘনিষ্ঠ সাংবাদিক রিয়াজ উদ্দিন আহমেদের ছেলে মাসরুর রিয়াজ আইএফসির সাবেক একজন কর্মকর্তা, যিনি ২০১০ এর দশকে বিনিয়োগ প্রসারে সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছিলেন।
কিন্তু তাকে বিএসইসির চেয়ারম্যান করার খবরে একটি পক্ষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরব হয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের সঙ্গে সখ্যের অভিযোগ তোলা হয় তার বিরুদ্ধে। সালমান এফ রহমানের সঙ্গে তার একটি ছবিও সে সময় ফেইসবুকে ছড়ানো হয়।
পরে বিএসইসির কর্মকর্তারাও মাসরুর রিয়াজের বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে আপত্তি জানান।
সেই পরিস্থিতিতে মাসরুর রিয়াজ বিএসইসির চেয়ারম্যান হিসেবে যোগ দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। পরে সাবেক ব্যাংকার খন্দকার রাশেদ মাকসুদকে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট তিনি দায়িত্ব বুঝে নেন। চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের পর থেকেই বিএসইসির শীর্ষ পদে নতুন কাউকে দায়িত্ব দেওয়ার আলোচনা চলছে। বিএসইসি চেয়ারম্যান পদে বয়সসীমার বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়ার পর সেই আলোচনা আরও জোরালো হয়।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে মাসুদ খানের নাম চূড়ান্ত করে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য ফাইল পাঠানো হয়েছে। অনুমোদনের পর প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। এ বিষয়ে মাসুদ খানকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, শুনেছি বিএসইসির চেয়ারম্যান হিসেবে আমার নামটি আছে। এর বাইরে আমি কিছু জানি না।
৩০ এপ্রিল সংসদে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (সংশোধনী) বিল ২০২৬ পাস হয়, যার মাধ্যমে বিএসইসির চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের ক্ষেত্রে ৬৫ বছর বয়সসীমা বাতিল হয়ে যায়। অভিজ্ঞ পেশাজীবীদের কমিশনে নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ তৈরি করতেই সরকার ওই বয়সসীমা তুলে দিয়েছে। এর পর ৭০ বছরের বেশি বয়সী এবং দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করা মাসুদ খানের নাম সবার সামনে চলে আসে। গত কয়েক দিনে তার নিয়োগ নিয়ে জল্পনা বেশ জোরালো হয়।
ডিবিএ সভাপতি সাইফুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি যতোটুকু জেনেছি, মাসুদ খানের নিয়োগের বিষয়টি সরকারের শীর্ষ মহল চূড়ান্ত করেছে। তার ফাইলটি প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে।
তবে প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজার বিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গনি স্পষ্ট করে কোনো নাম বলতে চাননি। তিনি বলেন, আমরা এই বিষয়টি নিয়ে অনেক বিশ্লেষণ করছি। আমাদের আরও একটু সময় দরকার। ইনশাআল্লাহ, কিছু জানলে আপনাদের আপডেট জানাব।
এদিকে মাসুদ খানকে গত মাসে ইউনিলিভার কনজ্যুমার কেয়ারের চেয়ারম্যান হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ইউনিলিভারের পাশাপাশি তিনি বর্তমানে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ এবং ম্যারিকো বাংলাদেশের স্বাধীন পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এ বিষয় যোগাযোগ করা হলে বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, তিনি কমিশনে যোগ দিতে আগ্রহী নন। এ বিষয়টি কর্তৃপক্ষ হয়ত আগেই জানত। তাই তারা সরাসরি তার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। সরকারের একজন প্রতিনিধি আমাকে বিএসইসির প্রধান হিসেবে যোগ দিতে আগ্রহী কি না জানতে চেয়েছিলেন। আমি অনাগ্রহের কথা জানিয়ে দিয়েছি।
তিনি বলেন, চেয়ারম্যান হিসেবে আমার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর অনেক আগেই আমি বিএসইসি ছেড়েছি। সেখানে ফিরে যাওয়ার আর কোনো আগ্রহ আমার নেই। চেয়ারম্যানের পাশাপাশি বিএসইসির কমিশনার পদেও পরিবর্তন আসতে পারে। তবে একটি সূত্র জানিয়েছে, কমিশনারদের সবাইকে বদলানো হচ্ছে না। কমিশনের আইনি বিষয় দেখভালের দায়িত্বে থাকা কমিশনার মো. আলী আকবরকে সরকার রেখে দিতে পারে। সাবেক জ্যেষ্ঠ জেলা ও দায়রা জজ আলী আকবর সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

