পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়ানোর আভাস, সূচকের উত্থানে লেনদেন ১ হাজার ১০১ কোটি
স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, শেয়ারবার্তা ২৪ ডটকম, ঢাকা: টানা ছয় কার্যদিবসের পতনের পর সপ্তাহের তৃতীয় কার্যদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) সূচকের পাশাপাশি লেনদেনেও বড় উত্থান দেখা গেছে। তবে দেশের পুঁজিবাজার দীর্ঘদিন ধরে অস্থিরতার বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। কখনো অস্বাভাবিক উত্থান, আবার কখনো আকস্মিক পতন এমন ওঠানামা বিনিয়োগকারীদের মনে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ তৈরি করেছে। শেয়ার দরে বারবার ধস, কারসাজির অভিযোগ ও দুর্বল তদারকির কারণে অনেক ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন।
এছাড়া ‘কারসাজি’র ভীতিতে বিনিয়োগকারীরা আস্থা ফিরে পাচ্ছেন না। কারসাজির শেয়ারের দাপটে শঙ্কিত বিনিয়োগকারীরা ভালো শেয়ারও বিক্রি করে দিচ্ছেন। ফলে বাজারে শেয়ারের দাম পড়ছে। তবে পুঁজিবাজারে তাদের আস্থা ফেরানোই এখন সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।
ফলে সপ্তাহের তৃতীয় কার্যদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচকের উত্থানে বেড়েছে বেশির ভাগ কোম্পানির শেয়ার দর ও টাকার পরিমানে লেনদেন। ডিএসই সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
এদিকে ঢাকার মতিঝিলে ব্রোকারেজ হাউসের বড় মনিটরজুড়ে তখন শুধু লাল আর লাল। সূচক কমছে, কমছে বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ারের দামও। দুপুরের দিকে অফিস ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী মিজানুর রহমান। মুখে হতাশার ছাপ স্পষ্ট। পাঁচ বছর আগে লাভের আশায় পুঁজিবাজারে এসেছিলেন তিনি। এখন সেই বিনিয়োগই যেন দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মিজানুর রহমান বলেন, করোনা মহামারির পর থেকেই বাজার মন্দার মধ্যে আছে। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর কয়েকদিন বাজারে বড় উত্থান দেখা গেলেও অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো সময়জুড়ে আবারও দরপতন হয়েছে। আমার মতো সাধারণ বিনিয়োগকারীদের লোকসানের পাল্লা দিন দিন ভারী হয়েছে। প্রায় সাড়ে আট লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছি। বর্তমানে সেই বিনিয়োগ কমে তিন লাখ টাকায় চলে এসেছে।
নতুন রাজনৈতিক সরকার এলে বাজার ঘুরে দাঁড়াবে, এই আশায় ছিলাম। শুরুতে কিছুটা ভালো অবস্থাও ছিল। কিন্তু এখন আবার টানা দরপতন চলছে। যে ক্ষতির মধ্যে পড়েছি, তা হয়তো আর কখনো কাটিয়ে উঠতে পারবো না। এখন শুধু চেষ্টা করছি লোকসান কিছুটা কমানোর। কিন্তু বাজার পরিস্থিতি কিছুতেই ভালো হচ্ছে না। দিন যত যাচ্ছে হতাশা বাড়ছে।
মিজানুর রহমানের এই হতাশা শুধু একজন বিনিয়োগকারীর গল্প নয়, দেশের পুঁজিবাজারে এখন লাখো ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর অভিজ্ঞতাই প্রায় একই। মাঝেমধ্যে সূচকের সাময়িক উত্থান দেখা গেলেও বাজারে স্থায়ী আস্থা ফিরছে না। দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা, কমে যাওয়া লেনদেন, নীতিগত অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক চাপ সব মিলিয়ে পুঁজিবাজারে হতাশা আরও গভীর হচ্ছে।
বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার যে কোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি শুধু বিনিয়োগের মাধ্যমই নয়, বরং শিল্প ও ব্যবসা খাতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের অন্যতম উৎস। কিন্তু বাংলাদেশের পুঁজিবাজার এখনো সেই কাঙ্খিত স্থিতিশীলতা অর্জন করতে পারেনি। স্বচ্ছতার অভাব, তথ্যের অসমতা ও কিছু অসাধু গোষ্ঠীর কারসাজি প্রায়ই বাজারকে অস্থিতিশীল করে তোলে।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী মনে করেন, পুঁজিবাজারের বর্তমান আস্থাহীনতার মূল কারণ দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি। কারণ পুঁজিবাজারে আস্থার সংকট কেন কাটছে না এর উত্তর খুঁজতে হলে দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা দেখতে হবে। দুই-তিন বছর ধরে অর্থনীতিতে যে চাপ তৈরি হয়েছে, সেটার প্রভাব এখনো রয়ে গেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সুদহার বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট এবং বৈশ্বিক অস্থিরতা সবকিছু মিলিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।
জানা গেছে, দিনশেষে ডিএসই ব্রড ইনডেক্স আগের দিনের চেয়ে ২৪ পয়েন্ট বেড়ে অবস্থান করছে ৫ হাজার ২২৯ পয়েন্টে। আর ডিএসই শরিয়াহ সূচক ৭ পয়েন্ট বেড়ে অবস্থান করছে ১ হাজার ৬৩ পয়েন্টে এবং ডিএসই ৩০ সূচক ৪ পয়েন্ট বেড়ে অবস্থান করছে ১ হাজার ৯৮৯ পয়েন্টে।
দিনভর লেনদেন হওয়া ৩৯৩ কোম্পানি ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মধ্যে দর বেড়েছে ১৮৮ টির, দর কমেছে ১৩৮ টির এবং দর অপরিবর্তিত রয়েছে ৬৭ টির। ডিএসইতে ১ হাজার ১০১ কোটি ৫২ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। যা আগের কার্যদিবস থেকে ৩৮৬ কোটি ৫৫ লাখ টাকা বেশি। এর আগের দিন লেনদেন হয়েছিল ৭১৪ কোটি ৯৭ লাখ টাকার।
অপরদিকে, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ৪১ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৬৮৩ পয়েন্টে। সিএসইতে ২০৫ টি কোম্পানি লেনদেনে অংশ নিয়েছে। এসব কোম্পানির মধ্যে ১০৯টির দর বেড়েছে, কমেছে ৬৭ টির এবং ২৯ টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। সিএসইতে ২১ কোটি ৫ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে।

