পুঁজিবাজারে নতুন করে ৫৪ কোম্পানি লোকসানে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে ১০০ ছাড়িয়েছে
স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, শেয়ারবার্তা ২৪ ডটকম, ঢাকা: দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে এখনো স্থিতিশীলতা ফেরেনি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ক্রমাগত বাজার চাহিদা হ্রাস, বিনিয়োগ মন্দা, ব্যাংকিং খাতের তীব্র চাপে দেশের করপোরেট খাতে মুনাফা কমার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এক সময়ের মুনাফাধারী বহুজাতিক কম্পানি থেকে শুরু করে দেশীয় নামি অনেক কোম্পানি লোকসানের খাতায় নাম লিখিয়েছে। এই সংকটের ঢেউ লেগেছে দেশের পুঁজিবাজারে, যেখানে বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতায় সূচক এখন খাদের কিনারায়।
বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতায় পুঁজিবাজারের মন্দাভাব কাটছেই না। এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। অনেকে পোর্টফোলিও বিক্রি করে লোকসান মেনে নিচ্ছেন। বাজারে তারল্য কমে যাওয়ায় নতুন বিনিয়োগও আসছে না। বাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে পুঁজিবাজার থেকে বিনিয়োগ তুলে নিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়বে।
চলতি অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে বিভিন্ন কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তালিকাভুক্ত ৫৪টি কোম্পানি নতুন করে লোকসানে পড়েছে। ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে অবনমন হওয়া কোম্পানির সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়েছে, যা বাজারের মোট কম্পানির ২৫ শতাংশ। এমনকি নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে পরিচিত ব্যাংক খাতও এখন লভ্যাংশ দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। এক সময়ের ভালো মৌলভিত্তির কম্পানিও একের পর এক ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নেমে যাচ্ছে।
মুলত কোম্পানিগুলোর প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন ও ও সংশ্লিষ্ট তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, চলতি হিসাব বছরে লোকসানের পেছনে বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, ডলার সংকট, ঋণের উচ্চ সুদহার এবং কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি বড় কারণ হয়ে উঠেছে।
উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে, এসব চাপের কারণে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, যা ব্যাবসায়িক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। উচ্চ সুদহার, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ-পরবর্তী জ্বালানি সংকট ও গ্যাস সংকটে ৩০ শতাংশের বেশি কমেছে উৎপাদন। উচ্চমূল্যস্ফীতি বাজার চাজিদা কমে যাওয়ায় বিক্রিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
এছাড়া সুতা ও ফেব্রিকের দাম কমে যাওয়া, বৈশ্বিক বাজারে পোশাকের চাহিদা হ্রাস এবং উচ্চ পরিচালন ব্যয়ের কারণে ধুকছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত টেক্সটাইল কোম্পানিগুলো। ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের মার্চ পর্যন্ত ৯ মাসে মুনাফা কমেছে অধিকাংশ কোম্পানির। এমনকি নতুন করে লোকসানে পড়েছে বেশ কয়েকটি কোম্পানি।
খাত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। দীর্ঘ ঈদ ছুটি, জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং রপ্তানি চালান বিলম্বিত হওয়ায় অনেক কোম্পানির বিক্রি ও মুনাফা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।
বাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যচাপ, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, জ্বালানি সংকট ও উচ্চ সুদের ব্যয়ের সমন্বিত প্রভাবে বহুমুখী সংকটে পড়েছে টেক্সটাইল খাত। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে পুঁজিবাজারেও। কারণ, তালিকাভুক্ত ৫৮টি টেক্সটাইল কোম্পানির মধ্যে বর্তমানে ২৭টিই রয়েছে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে যা খাতটির দুর্বল আর্থিক ভিত্তিরই প্রতিফলন।
একাধিক ব্রোকারেজ হাইউজের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক ভোক্তা চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে টেক্সটাইল পণ্যের দাম কমেছে। অন্যদিকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট উৎপাদন ব্যাহত করছে। ফলে মার্জিন ধরে রাখতে পারছে না কোম্পানিগুলো। বিক্রয়মূল্য যেভাবে কমছে, কাঁচামালের খরচ সেভাবে কমছে না। এতে উৎপাদন স্থিতিশীল থাকলেও মুনাফা কমে যাচ্ছে কোম্পানিগুলোর।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, স্কয়ার টেক্সটাইলসের মার্চ পর্যন্ত ৯ মাসে রাজস্ব কমেছে প্রায় ৬ শতাংশ। একই সময়ে কোম্পানিটির মুনাফা ৭০ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৩০ কোটি ৪০ লাখ টাকায়। জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে উচ্চ আর্থিক ব্যয় ও কম বিক্রির কারণে লোকসানে পড়েছে কোম্পানিটি। ডিবিএল গ্রুপের প্রতিষ্ঠান মতিন স্পিনিং জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে তুলার মূল্যচাপের কারণে তাদের গড় বিক্রয়মূল্য প্রতি কেজিতে ৩ দশমিক ৬৫ ডলার থেকে কমে নেমেছে ৩ দশমিক ৪৭ ডলারে। ফলে বিক্রি সামান্য বাড়লেও নয় মাসে মুনাফা কমেছে ৯ শতাংশ।
এনভয় টেক্সটাইলসের রাজস্ব কমেছে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মুনাফা কমেছে ২ দশমিক ৩ শতাংশ। বিশেষ করে তৃতীয় প্রান্তিকে কোম্পানিটির মুনাফা ৩৭ শতাংশ এবং রাজস্ব কমে যায় ১৩ শতাংশ। অন্যদিকে শাশা ডেনিমসের মুনাফা কমেছে ৭২ শতাংশ। জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে প্রায় ৩ কোটি টাকা লোকসান করেছে কোম্পানিটি। কম কার্যদিবসের মধ্যেও বেতন, বোনাস, বিদ্যুৎ বিল ও অবচয়সহ স্থায়ী ব্যয় বহন করায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে বলে জানিয়েছে কোম্পানিটি।
ফারইস্ট নিটিং অ্যান্ড ডাইং মার্চ পর্যন্ত ৯ মাসে ২১ কোটি ৭০ লাখ টাকার নতুন লোকসান করেছে। কোম্পানিটির বিক্রি কমেছে ১৮ শতাংশ। একই সময়ে এসকোয়ার নিট কম্পোজিট ১২ কোটি ৯০ লাখ টাকার লোকসান দেখিয়েছে। যদিও বিক্রিতে সামান্য প্রবৃদ্ধি ছিল, তবে পরিচালন ব্যয় ১২ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় লোকসানে পড়েছে কোম্পানিটি।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি বর্তমানে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, যার সরাসরি এবং নেতিবাচক প্রভাব আমরা পুঁজিবাজারে লক্ষ্য করছি। বেশ কয়েক বছর ধরেই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে এক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা প্রতিকূল ফ্যাক্টর, যা শিল্প উৎপাদন থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকটে থাকা পুঁজিবাজার মূলত অর্থনীতির আয়না। ফলে সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলো যতক্ষণ পর্যন্ত ইতিবাচক ধারায় না ফিরবে, ততক্ষণ বাজার থেকে ভালো কিছু আশা করা কঠিন।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, পুঁজিবাজারে সবচেয়ে বেশি লভ্যাংশ প্রদানকারী খাত হচ্ছে ব্যাংক ও লিজিং কম্পানি। কিন্তু বর্তমানে এই দুই খাতই সবচেয়ে বেশি সংকটের মধ্যে রয়েছে। এরই মধ্যে ১০টির বেশি ব্যাংক ও চারটি লিজিং কম্পানি গভীর সংকটে পড়েছে এবং ভবিষ্যতেও তারা লভ্যাংশ দিতে পারবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এছাড়া বস্ত্র খাতের বেশ কয়েকটি কোম্পানি নতুন করে লোকসানের মুখে পড়ছে। এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর ব্যর্থতা।
আইসিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, উচ্চ সুদের হার, উৎপাদন ও চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে দেশের বেসরকারি খাতে ব্যবসা-বাণিজ্য বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। এর প্রভাব এখন বহুজাতিক কম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদনেও স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। অনেক কম্পানি লোকসানে পড়েছে, আবার অনেককে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নামতে হয়েছে। যেসব কম্পানি এখনো প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পেরেছে, তাদেরও মুনাফা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

