পূবালী ব্যাংকের এমডি ফ্যাসিস্টের দোসর মোহাম্মদ আলী বিরুদ্ধে দুর্নীতির ফিরিস্তি
শেয়ারবার্তা ২৪ ডটকম, ঢাকা: ডলার কারসাজি, ঋণজালিয়াতি ও অর্থপাচারসহ নানা অভিযোগে পূবালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান এমডিসহ কয়েক পরিচালকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধান চলছে। তবে ব্যাংকটির প্রভাবশালী একটি মহল ওই অনুসন্ধান ধামাচাপা দেওয়ার অপচেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে দুদকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, অনুসন্ধান তার নিজস্ব গতিতে চলবে। কারও দ্বারা প্রভাবিত হয়ে অনুসন্ধান করছেন না।
তবে পূবালী ব্যাংকে ফ্যাসিবাদের বর্তমান চেয়ারম্যান মঞ্জুরুর রহমান ও সাবেক চেয়ারম্যান এবং আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য হাফিজ আহমদ মজুমদার, ঋণখেলাপি পরিচালক কবিরুজ্জামান ইয়াকুব, ফাহিম আহমদ ফারুক চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে সম্প্রতি অনুসন্ধান শুরু হয়। কমিশনের সহকারী পরিচালক হাফিজুর রহমানকে অনুসন্ধান কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে নোটিশও করেছেন দুদক।
মুলত সিন্ডিকেট চক্রের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাত করেছেন এমন অভিযোগ উঠেছে পূবালী ব্যাংকের এমডি মোহাম্মদ আলীর বিরুদ্ধে। ফরহাদ হোসেন নামে ব্যাংকটির একজন কর্মকর্তা এ নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগও দায়ের করেছেন। অভিযোগে এমডি মোহাম্মদ আলী সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ শেখ হাসিনার সাবেক রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচটি ইমামের ভাগ্নে বলেও উল্লেখ করেছেন। এছাড়া, পূবালী ব্যাংকের বিরুদ্ধে কারসাজির মাধ্যমে ডলার বাজার অস্থিতিশীল করার যে প্রমাণ কেন্দ্রীয় ব্যাংক পেয়েছে সেখানে এমডি মোহাম্মদ আলী সরাসরি জড়িত বলেও ব্যাংকটির একটি সূত্রে জানা গেছে।
এত কিছুর পরও মোহাম্মদ আলী এখনো এমডি হিসেবে বহাল থাকায় পূবালী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। একজন কর্মকর্তা বলেন, এমডি সাহেব আওয়ামী লীগের লোক। তিনি আওয়ামী লীগ আমলে অনিয়ম করে পার পেয়েছেন। কিন্তু এখনো তিনি বহাল তবিয়্যতে আছেন। তার খুঁটির জোর কোথায়?
বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি পরিদর্শন প্রতিবেদন বলছে, ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশ ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিলারস অ্যাসোসিয়েশনের (বাফেদা) নির্ধারিত দরের বেশিতে ডলার বিক্রি করে ২৪৮ কোটি টাকা আয় করে বেসরকারি খাতের পূবালী ব্যাংক।
একই সময়ে বিভিন্ন এক্সচেঞ্জ হাউস থেকে বেশি দরে ডলার ক্রয় করে অতিরিক্ত ২১১ কোটি টাকা ব্যয় করেছে ব্যাংকটি। শুধু তাই নয়, আয় ও ব্যয় করা অতিরিক্ত অর্থ লেনদেনের জন্য কয়েকটি সন্দেহজনক হিসাব খোলা হয়। প্রয়োজনীয় লেনদেন শেষে এই হিসাবগুলো মুছে ফেলার (ডিলিট) পরিকল্পনা ছিল ব্যাংকটির। তবে তার আগেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শন দল এ অনিয়ম চিহ্নিত করে। এরপর ডলার কেনাবেচা ও সংশ্লিষ্ট হিসাবগুলোর বিস্তারিত তথ্য চেয়ে পরিদর্শক দলের পক্ষ থেকে চিঠি দেওয়া হয়।
সেই সময় ব্যাংকটিকে এ বিপত্তি থেকে বাঁচতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার শরণাপন্ন হয় পূবালী ব্যাংক। তার হস্তক্ষেপে তদন্ত প্রক্রিয়া সেখানেই থামিয়ে দিতে বাধ্য হন পরিদর্শকরা। মাত্র একটি শাখার এ অনিয়মের সূত্র ধরে পূবালী ব্যাংকের অন্যান্য এডি শাখা পরিদর্শনের উদ্যোগও আর অগ্রসর হতে পারেনি।
জানা গেছে, পূবালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান জনাব মনঞ্জুরুর রহমান, হাফিজ আহমদ মজুমদার ও পরিচালক কবিরুজ্জামান ইয়াকুব বাংলাদেশ ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তাকে তাদের অনুকূলে নেয়।
যাদের মাধ্যমে তারা বিভিন্ন নিয়ম বহির্ভূত কাজ চালিয়ে আসছিলেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক খুরশিদ-উল-আলমকে হাত করে ব্যাংকটির যাবতীয় অবৈধ কার্যকলাপ পরিচালিত হতো। বিনিময়ে খুরশিদ-উল-আলমকে পূবালী ব্যাংকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি দীর্ঘদিন ব্যাংকটির ইন্ডিপেন্ডেন্ট ডাইরেক্টও ছিলেন। অপর স্বতন্ত্র পরিচালক নওশাদ আলী চৌধুরীও পূর্বসূরির মতোই আজ্ঞাবহ হয়ে বর্তমান চেয়ারম্যান মনঞ্জুরুর রহমান ও সাবেক চেয়ারম্যান হাফিজ আহমদ মজুমদারের পক্ষে কাজ করে যাচ্ছেন।
এছাড়া পূবালী ব্যাংকের পরিচালক কবিরুজ্জামান ইয়াকুব দীর্ঘদিন যাবত উক্ত ব্যাংকেরই একজন বড় ঋণ খেলাপি। বর্তমানে তার চন্দ্রা স্পিনিং মিলের নামে ঋণ প্রায় ১৩২ কোটি টাকারও বেশি। চন্দ্রা স্পিনিং মিলের নামে নেওয়া ঋণ পরিশোধ না হওয়ায় হাফিজ আহমদ মজুমদার ঋণের সুদ মওকুফ করে ৬৫ কোটি টাকা দেওয়ার জন্য পরামর্শ দেন, কিন্তু উক্ত টাকাও পরিশোধ করতে কবিরুজ্জামান ইয়াকুব ব্যর্থ হয়। এতো সাহায্য সহযোগিতা করার পরও উক্ত চন্দ্রা স্পিনিং মিলের নামে নেওয়া ঋণ পরিশোধ না করা সত্ত্বেও অদৃশ্য ক্ষমতা বলে তিনি পরিচালক পদে আছেন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকও কোন রহস্যজনক কারণে কবিরুজ্জামান ইয়াকুবের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না ।
এছাড়া আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী ও স্বতন্ত্র এমপি ও গার্মেন্টস ব্যবসায়ী এ কে আজাদ সাবেক চেয়ারম্যান হাফিজ মজুমদারের একজন ঘনিষ্ঠ। তিনি হাফিজ মজুমদার সাহেবের গার্মেন্টসে বিভিন্ন সাহায্য করে আসছেন। বিনিময়ে তাকে পূবালী ব্যাংকের শেয়ার কিনতে সাহায্য করে পূবালী ব্যাংকের প্রায় ১১ শতাংশ শেয়ার ক্রয় করান তার গার্মেন্টসের নামে। হাফিজ মজুমদার নিজ উদ্যোগে একে আজাদের একজন প্রতিনিধি আব্দুর রাজ্জাক মন্ডলকে পূবালী ব্যাংকের পরিচালক করেছেন।
মনঞ্জুরুর রহমান, হাফিজ আহমদ মজুমদার ও এ কে আজাদ পূবালী ব্যাংকের শেয়ার কিনে তারা এস আলম গ্রুপের মত এই ব্যাংকটিকে কুক্ষিগত করার পরিকল্পনা করেছেন। অভিযোগ থেকে আরও জানা গেছে, ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ে সরকারের বিভিন্ন মহলকে হাত করে মঞ্জুরুর রহমান ব্যাংকের চেয়ারম্যান হন। তিনি চেয়ারম্যান হওয়ার পর থেকে তার সহায়ক দুর্নীতিবাজ কয়েকজন পরিচালকদের নিয়ে ব্যাপক লুটপাট ও দুর্নীতি করেন। যার পরিণতিতে ব্যাংকটির বর্তমানে করুণ ও ভয়ানক চিত্র ফুটে উঠেছে।
মঞ্জুরুর রহমান পূবালী ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডার ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স থেকে সরে আসার পর সেখানে হাফিজ আহমদ মজুমদারকে চেয়ারম্যান বানান এবং একে আজাদের ছেলেকে পরিচালক পদে বসিয়েছেন। এছাড়া হাফিজ আহমদ মজুমদার ও মঞ্জুরুর রহমান যাকে ইচ্ছা পূবালী ব্যাংকের চাকরি দিয়েছেন; এক্ষেত্রে কোন রকম যোগ্যতার বাছবিচার ছাড়াই। ব্যাংকে কে থাকবে আর কে থাকবেনা সেটা তারা নিজেরা ইচ্ছেমতো নির্বাচন করেন।
প্রতিটি বার্ষিক সাধারণ সভার আগে প্রক্সি ভোট ব্যাংকের চেয়ারম্যান বা হাফিজ আহমদ মজুমদারের নিকট জমা দেওয়ার একটা অদ্ভুত নিয়ম চালু করেন আওয়ামী লীগ দলীয় সাবেক এমপি হাফিজ মজুমদার ও মঞ্জুরুর রহমান চালু করেন। এর আসল কারণ হলো যাতে তারা তাদের নিজস্ব পছন্দের লোকদের বোর্ডের পরিচালক বানিয়ে আজ্ঞাবহ করে রাখতে পারেন।
অথচ তারা ব্যাংক থেকে বিএনপির সাবেক এমপি শফি উদ্দিন চৌধুরী ও তার ভাই সাবেক আইজিপি ই-এ চৌধুরীকে পরিচালক থেকে সরিয়ে দেয়। কারন তারা বোর্ডে উপস্থিত থাকলে অসাধু চক্রের দুর্নীতি বাঁধাগ্রস্ত হতে থাকে। এই ভাবেই এক পর্যায়ে তারা ভোট কুক্ষিগত করে শফি উদ্দিন চৌধুরীকে বোর্ডে থাকতে দেয়নি।
অভিযোগের বিবরণ মতে, পূবালী ব্যাংক ১৯৮৬ সালে ব্যক্তি মালিকানায় আসার পর পরিচালনা পর্ষদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানের কারণে ব্যাংকটি খুব অল্প সময়ে মধ্যেই একটি সফল ব্যাংকে পরিণত হয়। এরপরই ব্যাংক খেকো দুর্নীতিবাজদের কুদৃষ্টি পড়ে পূবালী ব্যাংকের ওপর। নামে বেনামে ব্যাংকের সিএসআর এম ফান্ড থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় একটি চক্র।
চন্দ্রা স্পিনিং মিলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে যাচাই-বাছাই না করে কোটি টাকা ঋণ প্রদান করে। যার ফলে পূবালী ব্যাংকে ঋণ খেলাপির সংখ্যা দিন দিন বাড়তে থাকে। ব্যাংকের ক্যাশ ফ্লো কমতে থাকে। দুর্নীতিবাজ এই সিন্ডিকেট চক্রের অন্যতম হোতা হাফিজ আহমেদ মজুমদার বিগত আওয়ামী সরকারের দোসর থেকেও অদ্যাবধি বহাল তবিয়তে ব্যাংকে খবরদারি করে যাচ্ছেন এবং তার সাথে আছেন এ.কে আজাদ ও বর্তমান চেয়ারম্যান মঞ্জুরুর রহমান। দুদকের অভিযোগে বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়মের মাধ্যমে লোন দেওয়ার বিষয়ে তুলে ধরা হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অনুসন্ধান কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান বলেন, আমরা অনুসন্ধান শুরু করেছি। কয়েকটি দপ্তরে ও অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের চিঠি দিয়ে বক্তব্য চাওয়া হয়েছে। আমরা সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ করছি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শন টিম যেসব অনিয়ম পায়: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শন টিমের বিশেষ পরিদর্শনে দেখা যায়, পূবালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সেন্ট্রালাইজড ট্রেড প্রসেসিং ইউনিট (কেন্দ্রীভূত বাণিজ্য প্রক্রিয়াকরণ ইউনিট) বৈদেশিক মুদ্রার ধরন নির্দিষ্ট করে দিলেও আমদানি বিল ইস্যুর জন্য গ্রাহকের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে ব্যাংকটি আমদানিকারকদের কাছ থেকে নির্ধারিত দামের অতিরিক্ত ১৪৮ কোটি টাকা আদায় করে। বিপুল পরিমাণ এ অর্থ ব্যাংকের মতিঝিল ফরেন এক্সচেঞ্জ শাখার বেশ কয়েকটি হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। এজন্য কোনো রকম অনুমোদন না নিয়েই ফরেন এক্সচেঞ্জ হাউসগুলোর নামে সাতটি হিসাব খোলা হয়।
একই সময়ে ব্যাংকটি বিভিন্ন এক্সচেঞ্জ হাউসের কাছ থেকে নির্ধারিত দরের চেয়ে উচ্চমূল্যে বৈদেশিক মুদ্রা কিনেছে। একটিমাত্র এডি শাখার মাধ্যমেই বৈদেশিক মুদ্রা কিনতে অতিরিক্ত ২১১ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, এক্সচেঞ্জ হাউসের নামে খোলা পূবালী ব্যাংকের সাতটি হিসাবের মধ্যে চারটির অনুমোদন দিয়েছেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্ব)। অন্য তিনটি হিসাব কার অনুমতি নিয়ে খোলা হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়।
প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, পূবালী ব্যাংক ঘোষিত দরের চেয়ে বেশি দরে এক্সচেঞ্জ হাউস থেকে ডলার কেনার ক্ষেত্রে উচ্চমূল্য পরিশোধ করে। এর মাধ্যমে রেমিট্যান্সের বিপরীতে অতিরিক্ত প্রণোদনা দেওয়ায় সরকারের ৫ কোটি ২৮ লাখ টাকা অপচয় হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, পূবালী ব্যাংকের এসব অনিয়ম চিহ্নিত করার পর অন্যান্য শাখায় পূর্ণাঙ্গ পরিদর্শন করতে চেয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শক দল। তবে এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সেই উদ্যোগ আটকে দেন। এমনকি উদ্ঘাটিত অনিয়মের জন্য পূবালী ব্যাংকের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হয়নি।
লেনদেন হয়েছে যেসব এক্সচেঞ্জ হাউসের নামে: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, ওই সময় অ্যারাবিয়ান এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে ১ কোটি ৫২ লাখ ডলার রেমিট্যান্স আনে পূবালী ব্যাংক। এ সময় বাজারের দর ১০৯ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ১১০ টাকার মধ্যে হলেও ব্যাংকটি ডলার কিনেছে সর্বোচ্চ ১১৭ টাকায়। এতে ব্যাংকটিকে অতিরিক্ত ৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে।
মার্চেনট্রেডের কাছ থেকে ৫ কোটি ৫২ লাখ ডলার কিনতে সর্বোচ্চ ১২৩ টাকা দর দিয়েছে ব্যাংকটি। এতে অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ৪০ কোটি টাকা। গালফ ওভারসিজ এক্সচেঞ্জের কাছ থেকে ৪ কোটি ৮৭ লাখ ডলার কেনা হয় সর্বোচ্চ ১২২ টাকা দরে। এজন্য অতিরিক্ত পরিশোধ করা হয় ২৬ কোটি টাকা।
ইউনিভার্সাল এক্সচেঞ্জ সেন্টার থেকে সর্বোচ্চ ১২২ টাকা ৫০ পয়সা দরে ৭৭ লাখ ডলার কিনে পূবালী ব্যাংক, এতে অতিরিক্ত পরিশোধ করতে হয়েছে ৬ কোটি ১৯ লাখ টাকা। এনবিএল মানি ট্রান্সফারের মাধ্যমে ৪৫ লাখ ডলার কিনেছে ব্যাংকটি। এতে সর্বোচ্চ দর ছিল ১১৭ টাকা ৫০ পয়সা, যার কারণে ২ কোটি ৪২ লাখ টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ করতে হয়েছে। ব্যাংকটি কন্টিনেন্টাল এক্সচেঞ্জ সলিউশন্সের (আরআইএ) মাধ্যমে ১০ লাখ ৬০ হাজার ডলার কিনেছে। এতে সর্বোচ্চ দর ছিল ১২৩ টাকা ৬০ পয়সা। এক্ষেত্রে অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ১১০ কোটি টাকা।
এছাড়া মাল্টিনেট ট্রাস্ট এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে ৫ কোটি ৮৬ লাখ দিরহাম রেমিট্যান্স কিনেছে পূবালী ব্যাংক। এতে নির্ধারিত রেট ছিল ৩০ টাকা ০৮ পয়সা। কিন্তু ব্যাংকটি রেমিট্যান্স কিনেছে সর্বোচ্চ ৩৩ টাকা ২১ পয়সা দামে। এতে বাড়তি খরচ হয়েছে ১৭ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শনে আরও বলা হয়েছে, পূবালী ব্যাংক বিভিন্ন শাখার মাধ্যমে আমদানিকারকদের কাছ থেকে থেকে বিল মূল্য বাবদ ঘোষিত দরের চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ নিয়েছে। এই অর্থ মতিঝিল ফরেন এক্সচেঞ্জ শাখার ৭টি হিসাবের বাইরেও ব্যাংকের অন্যান্য শাখার বিভিন্ন হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে।
এমনকি এ কাজে বিভিন্ন গ্রাহকের হিসাবও ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে পূবালী ব্যাংকের বরিশাল হসপিটাল রোড শাখা একটি এলসির বিপরীতে ৫৬ হাজার ৮৫০ টাকা আদায় করেছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। পূবালী ব্যাংকের ডলার কারসাজির বিষয়ে জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে পূবালী ব্যাংককে কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে।
অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ দুদকে: অপরদিকে, দুদকে পূবালী ব্যাংকের কর্মকর্তা ফরহাদ হোসেনের করা অভিযোগে বলা হয়েছে, পরিচালনা পর্ষদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের বিচ্ছিন্ন নির্দেশনা উপেক্ষা করে পূবালী ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ্যান্ড সিইও মোহাম্মদ আলীসহ একটি চক্র ব্যাংকটিতে ব্যাপক লুটপাট চালিয়ে যাচ্ছেন। বৈষম্য বিরোধী ছাত্র-জনতার অনুত্থানেরপরও এই চক্রটি ব্যাংকে বহাল তবিয়ে আছেন এবং তাঁরা লুটপাট ও অবৈধ কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন।
বিষয়টি অতন্ত অনঅভিপ্রেত ও দুঃখজনক এবং ব্যাংকটির নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য হুমকি সৃষ্টি করেছে। পূবালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ অনৈতিক সুবিধা পাওয়ার লক্ষ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা এইচটি ইমামের ভাগ্নে অদক্ষ অযোগ্য কর্মকর্তা মোহজদ অলীকে এমডি ও সিইও হিসেবে নিয়োগ করেছেন। এতে আওয়ামী লীগ সরকারের শেল্টার পাওয়া তাদের জন্য সহজ হয়। এছাড়া ফাহিম আহমেদ ফারুক চৌধুরীকে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে ব্যাংকটির পরিচালক করেছেন। তাদের মাধ্যমে যাবতীয় অনিয়ম ‘হালাল’ করার অপচেষ্টা করছেন।
অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, এমডি মোহাম্মদ আলী চক্র হেড অফিস কর্পোরেট শাখায় নির্ধারিত রেটের বাইরে অতিরিক্ত দামে ডলার ক্রয় করে ব্যাংকের ২১১ কোটি টাকা বাড়তি ব্যয় অর্থাৎ আত্মসাৎ করেছেন। যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অডিট প্রতিবেদনেও উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অডিটে পুবালী ব্যাংকের হেড অফিস কর্পোরেট শাখায় বিষয়টি সনাক্ত হওয়ার পর পুবলী ব্যাংকের ট্রেজারি শাখার প্রধান ও আইটি বিভাগের তৎকালীন প্রধানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। ওই সময় তারা স্বীকার করেন যে, বাংকের চেয়ারম্যান মঞ্জুরণা রহমান ও এমডি মোহঞ্জদ আলীর নির্দেশে তারা নির্ধারিত দামের অনেক অতিরিক্ত দানে ওলার ক্রয় করেন। যাতে ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্রয়কৃত ওই ডলারের অধিকাংশই বিদেশে পাচার করা হয়েছিল।
পূবালী ব্যাংকের হেড অফিস কর্পোরেট শাখায় ডলার ক্রয়ে জালিয়াতির বিষয়টি সামনে আসর পর পূবালী ব্যাংকের প্রতিটি কর্পোরেট শাখার জালিয়াতি ও ডলার ক্রয়ে অনিয়ম দুর্নীতির বিষয়টি অডিট করব নির্দেশনা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু মোহাম্মদ আলী নিজের দুর্নীতি ধামা চাপা দিতে কৌশলে আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফিনান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইয়) চিফ প্রধান) মাসুদ বিশ্বাস, ডেপুটি গভর্নর কাজী ছাইদুর রহমান ও মো. খুরশীদ আলমকে ম্যানেজ করেন।
অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রবাসীদের এক্সচেঞ্জ করা শতশত কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা ব্যাংকিং চ্যানেলে না দিয়ে বিদেশে পাচারের অভিযোগ আসে পুবালী ব্যাংক পিএলসির বিরুদ্ধে। দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিমের অভিযানেও এই অর্থপাচারের প্রমাণ পাওয়া যায়।
এ বিষয়েও দুদকের একটি তদন্ত চলমান রয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে জানতে পূবালী ব্যাংকের এমডি মোহাম্মদ আলীর মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। এমনকি বিষয়টি উল্লেখ করে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দিলেও কোনো উত্তর দেননি।

