প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সে ৫৬৫ কোটি অনিয়মের ফিরিস্তি
শেয়ারবার্তা ২৪ ডটকম, ঢাকা: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বীমা খাতের কোম্পানি প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স এখন পরিবারতন্ত্র ও দখলদারিত্ব এবং লুটপাটের শিকার হয়ে আর্থিক সঙ্কটে জর্জরিত। ২০১৮ সালে মাফিয়া এস আলম গ্রুপের ছত্রছায়ায় ইউনিয়ন ব্যাংকের পলাতক সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ বি এম মোকাম্মেল হক চৌধুরীর নেতৃত্বে এই কোম্পানি দখল করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, কোম্পানি দখলের পরপরই ছয় শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত করা হয় এবং বিভিন্ন প্রভাবশালী শিল্পগ্রুপের প্রতিনিধিকে পরিচালক হিসেবে বসিয়ে দেয়া হয়। ফলে দখলের ৮ বছরের মাথায় প্রতিষ্ঠানটি এখন রুগ্ন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। টানা লোকসানের কারণে এখন ডিভিডেন্ড দেয়াই চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এছাড়া দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠার পর মোকাম্মেল হক চৌধুরী কোনো আইন-কানুন বা যোগ্যতার তোয়াক্কা না করে নিজের পরিবারের সদস্যদের কোম্পানির শীর্ষ পদগুলোতে বসান। ছোট ভাই এ কে এম নাজমুল হক চৌধুরীকে করা হয় অ্যাডিশনাল ম্যানেজিং ডিরেক্টর। বীমা খাতে অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও তিনি প্রতি মাসে তিন লাখ টাকা বেতনসহ গাড়ি, ড্রাইভার, বাসা ভাড়া ও অন্যান্য খাতে অতিরিক্ত কয়েক লাখ টাকা সুবিধা পাচ্ছেন। অপর ভাই এ টি এম হামিদুল হক চৌধুরীকে উপদেষ্টা পদে বসানো হয়।
নিয়ম অনুযায়ী এই পদে নিয়োগের জন্য কমপক্ষে ১০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকা বাধ্যতামূলক হলেও তার ক্ষেত্রে সেই শর্ত মানা হয়নি। তবুও তিনি প্রতি মাসে আড়াই লাখ টাকা বেতন, মিটিং ফি, গাড়ি, রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য সুবিধা ভোগ করছেন।
শুধু ভাই নয়, ভগ্নিপতি রহিম উদ্দৌলা চৌধুরীকেও বসানো হয় চিফ কনসালট্যান্ট পদে। অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতার শর্ত উপেক্ষা করেই তাকে নিয়োগ দেয়া হয়। মাসে তিন লাখ টাকা বেতন ছাড়াও ব্যবসা উন্নয়ন ভাতা, গাড়ি, ড্রাইভার ও অন্যান্য সুবিধা ভোগ করছেন তিনি।
এছাড়া প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের আর্থিক হিসাবে ভয়াবহ অনিয়ম ও বিধি লঙ্ঘনের চিত্র ধরা পড়েছে। সরকারি সিকিউরিটিজে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ ঘাটতির পাশাপাশি শত শত কোটি টাকার বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে থাকলেও সে অনুযায়ী কোনো নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) রাখেনি কোম্পানিটি। ফলে কোম্পানিটির ৫৬৫ কোটি টাকার বেশি আর্থিক অনিয়ম, বিধি লঙ্ঘন ও অনিশ্চিত বিনিয়োগের চিত্র উঠে এসেছে।
কোম্পানিটির ২০২৫ সালের আর্থিক হিসাব নিরীক্ষা করে এসব তথ্য জানিয়েছেন নিরীক্ষকরা। এর মধ্যে অনাদায়ী খাতে আটকে আছে ২১১ কোটি টাকা, সরকারি সিকিউরিটিজে বাধ্যতামূলক বিনিয়োগের ঘাটতি ২০৭ কোটি ৭৭ লাখ এবং আইডিআরএ নির্ধারিত ‘অন্যান্য অনুমোদিত বিনিয়োগের’ সীমা ছাড়িয়েছে ১৪৮ কোটি ৬৭ লাখ টাকা।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোম্পানিটির স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগের মধ্যে পিএফআই সিকিউরিটিজে ১৬৭ কোটি ৮০ লাখ এবং অনাদায়ী মুনাফা, লভ্যাংশ ও ভাড়া বাবদ ৯ কোটি ৭৮ লাখ টাকা রয়েছে। এ ছাড়া পিএফআই সিকিউরিটিজে আরও ১০ কোটি ৫২ লাখ টাকা রয়েছে। সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটি থেকে পাওনা ১৮৮ কোটি ১১ লাখ টাকা, যা ২০১৮ সাল থেকে অনাদায়ী।
প্রাইম ইসলামী লাইফের সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ রয়েছে মাত্র ২৭ কোটি টাকা। অথচ বীমা বিধিমালা অনুযায়ী কোম্পানির সম্পদের অন্তত ৩০ শতাংশ সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ কোম্পানিটির সম্পদের পরিমাণ ছিল ৭৮২ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। সে হিসাবে সরকারি সিকিউরিটিজে ন্যূনতম ২৩৪ কোটি ৭৭ লাখ টাকা বিনিয়োগের কথা। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২০৭ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।
এদিকে জিরো কুপন বন্ড, পিএফআইর স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগ, স্টার্লিং গ্রুপের বিনিয়োগসহ ‘অন্যান্য অনুমোদিত বিনিয়োগ’ রয়েছে ১৮৭ কোটি ৮০ লাখ ৪৪ হাজার ৯০৭ টাকা। আইডিআরএর বিধিমালা অনুযায়ী এ খাতে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ বিনিয়োগের সুযোগ থাকলেও কোম্পানিটির বিনিয়োগ নির্ধারিত সীমার চেয়ে ১৪৮ কোটি ৬৭ লাখ টাকা বেশি।
নিরীক্ষকরা আরও জানিয়েছেন, বাংলালায়নের ১০ শতাংশ কনভার্টিবল জিরো কুপন বন্ডে প্রায় ৪ কোটি টাকা বিনিয়োগ দেখানো হয়েছে। এর বিপরীতে জমা মুনাফা রয়েছে ৩ কোটি ৬ লাখ টাকা। বন্ডটির মেয়াদ ২০১৬ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে শেষ হলেও অর্থ আদায় এখনো অনিশ্চিত। স্টার্লিং গ্রুপের চার প্রতিষ্ঠানে কোম্পানিটির ১৫ কোটি টাকার স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগও ২০১৮ সাল থেকে অনাদায়ী। অর্থ আদায়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে চারটি দেওয়ানি আবেদন চলমান।
এ ছাড়া কোম্পানিটি জীবন বীমা দায়ের অ্যাকচুয়ারিয়াল তদন্ত ও মূল্যায়ন করেনি। অথচ ২০১৮ সালের ২৯ মে জারি করা এসআরও ১৬১-আইন/২০১৮-এর ৩০(১) ধারায় এ মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক। সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্য ১৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা লভ্যাংশও ২০১৮ সাল থেকে অনাদায়ী। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে কোম্পানিটির আনরিয়েলাইজড লোকসান হয়েছে ২ কোটি ৮৩ লাখ টাকা।
২০০৭ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রাইম ইসলামী লাইফের অনুমোদিত মূলধন ৫০ কোটি এবং পরিশোধিত মূলধন ৩০ কোটি ৫২ লাখ টাকা। কোম্পানির মোট ৩ কোটি ৫ লাখ ২০ হাজার ২৩০টি শেয়ারের মধ্যে উদ্যোক্তা-পরিচালকদের কাছে রয়েছে ৩৬.০৮ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ৩৩.৩৫ শতাংশ, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে ০.১৭ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে ৩০.৪০ শতাংশ।

