সোনালী লাইফ ইন্সুরেন্সের সিইও রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে ভুয়া সনদ ও দুর্নীতির ফিরিস্তি!
শেয়ারবার্তা ২৪ ডটকম, ঢাকা: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বিমা খাতের কোম্পানি সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ভারপ্রাপ্ত মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। তিনি অনিয়মকে নিয়ম বলে চালিয়ে যাচ্ছেন। কোন কিছু তোয়াক্কা করছেন না। তার অনিয়মগুলো যেন নিয়মে পরিনত হয়েছে। ফলে জাল-জালিয়াতি, অনিয়ম, দুর্নীতি ও ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের সিইও রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে।
এর মধ্যে আইন লঙ্ঘন এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অনিয়মের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন তিনি। রফিকুল ইসলাম অনিয়ম ও অনৈতিক পন্থায় অত্যন্ত সুক্ষ্ম এবং সুপরিকল্পিতভাবে আত্মসাত করেছেন কোম্পানির কোটি কোটি টাকা। যার ফলে হুমকির মুখে পড়েছে সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির গ্রাহকের শত শত কোটি টাকার আমানত।
এছাড়া কোম্পানিটির চলতি বছরের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর সময়ে উদ্বৃত্ত আয় উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) কঠোর ব্যবস্থা নিতে চাইলেও আইনের জটিলতায় তা সম্ভব হচ্ছে না। সেই সুযোগে গ্রাহকের টাকা লোপাটে ব্যস্ত রয়েছে একশ্রেণির অসাধু বীমা কোম্পানির মালিক ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা।
সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির প্রধান নির্বাহী এতোটাই বেপরোয়া যে আন-অডিটেড আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশেও গড়িমসি করেছেন। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) আইনও লঙ্ঘন করেছে কোম্পানিটি।
সর্বশেষ কোম্পানির অডিটবিহীন আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০২৪ প্রান্তিকে মোট আয়ের বিপরীতে মোট ব্যয়ের উদ্বৃত্ত ছিল ৩৫১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১,০৯১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। মুনাফা হ্রাস পেয়েছে ৬৭.৮২ শতাংশ। জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর সময়ের উদ্বৃত্ত দাঁড়ায় ৯৮৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা, যা ২০২৩ সালের একই সময়ে ছিল ২,৬৪৯ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ মুনাফা হ্রাস পেয়ে ৬২.৮০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
এর ফলে ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর কোম্পানির লাইফ ইন্স্যুরেন্স ফান্ডের ভারসাম্য দাঁড়িয়েছে ৭,৯১৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে তা ছিল ৮,৬৮৫ কোটি ১৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ ফান্ডে নেট ঘাটতি হয়েছে ৭৬৯ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। ফান্ড ঘাটতি পড়েছে ৮.৮৭ শতাংশ।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে ২৭ আগস্ট একই দিনে কোম্পানিটির ২০২৪ সালের প্রথম (জানুয়ারি-মার্চ), দ্বিতীয় (এপ্রিল-জুন) ও তৃতীয় (জুলাই-সেপ্টেম্বর) প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। যদিও বিএসইসির কোম্পানি আইন অনুযায়ী, প্রান্তিক শেষ হওয়ার পরবর্তী ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে কোম্পানিকে ওই প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে। এই ক্ষেত্রে কোম্পানিটি আইন লঙ্ঘন করেছে। এছাড়া গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর শেষে নেট অপারেটিং ক্যাশ ফ্লো শেয়ারপ্রতি (এনওসিএফপিএস) বা নগদ পরিচালন প্রবাহ কমে দাঁড়িয়েছে ১৬ টাকা ৩ পয়সা। আগের বছরের একই সময় এটি ছিল ৫৪ টাকা ৬৯ পয়সা।
বীমা আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে শিক্ষাগত যোগ্যতার জাল সনদ ব্যবহার করে সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী পদে বহাল আছেন মো. রফিকুল ইসলাম। ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর তিনি এই পদে দায়িত্ব নেন। তবে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) অনুমোদন ছাড়াই প্রায় এক বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। বীমা আইন ২০১০-এর ৮০ (৪) ধারা অনুযায়ী, কোনো বীমা কোম্পানির সিইও পদ তিন মাসের বেশি শূন্য রাখা যায় না। প্রয়োজনে সর্বোচ্চ আরও তিন মাস সময় বাড়ানো যেতে পারে।
কিন্তু ওই সময়সীমা অতিক্রম করেও তিনি এখনো অবৈধভাবে বহাল রয়েছেন। এর আগে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে বিষয়টি নিয়ে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হলেও আইডিআরএ কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। বরং সোনালী লাইফ কর্তৃপক্ষ সময় বাড়ানোর আবেদন করেছে।
দৈনিক দেশ প্রতিক্ষণের হাতে আসা নথিতে দেখা গেছে, মো. রফিকুল ইসলামের এসএসসি, এইচএসসি, অনার্স ও মাস্টার্স সনদে গুরুতর অসঙ্গতি রয়েছে। এসএসসি (১৯৯২, সুধীর কুমার উচ্চবিদ্যালয়) : নাম লেখা হয়েছে ‘মো. রফিকুল ইসলাম’, পিতার নাম ‘মৃত ইমাজ উদ্দিন’। এইচএসসি (সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ) : নাম ‘মোহা: রফিকুল ইসলাম’, পিতার নাম ‘মৃত ইয়াজ উদ্দিন’।
অনার্স ও মাস্টার্স (জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়): একই রেজিস্ট্রেশন নম্বর (২৮৯৫৩), সেশন (১৯৯৫-৯৬) এবং সার্টিফিকেট ইস্যুর তারিখ (০১-০৩-০৫) ব্যবহার করা হয়েছে। দুই সনদেই পাশের বছর উল্লেখ করা হয়েছে ২০০০। মাস্টার্স সনদে পরীক্ষার বছরের ঘরে কাটা-ছেঁড়া রয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে সোনালী লাইফের তৎকালীন প্রশাসক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এস. এম. ফেরদৌস (অব.) এবং কোম্পানির মানবসম্পদ বিভাগ আইডিআরএকে লিখিতভাবে অবহিত করেছিলেন। এমনকি স্থানীয় থানায় সনদ জালিয়াতির মামলা করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল। তবে মামলা হয়েছে কিনা, সেই তথ্য জানা যায়নি।
এ বিষয়টি প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে ৪ জুন আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব বরাবর পাঠানো এক চিঠিতে বলা হয়, সিইও পদে জাল সনদধারী ব্যক্তিদের রাখার ঘটনা আইডিআরএর কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
আইডিআরএর নিস্কিয়তা বীমা কোম্পানিগুলোর দুর্নীতিকে উৎসাহিত করছে এবং গ্রাহকের স্বার্থ ক্ষুন্ন করছে।
আইডিআরএর মুখপাত্র সাইফুন নাহার সুমি জানিয়েছেন, জাল সনদে সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সুযোগ নেই। আমরা যাচাই-বাছাই করেছি। তবে সোনালী লাইফের পক্ষ থেকে ২৫ মে সময় চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। বীমা আইন সংশোধনের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে। বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স এসোসিয়েশন (বিআইএ) আরও এক মাস সময় আবেদন করেছে। আইনটি পাশ হলে গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষা পাবে।
তিনি আরও বলেন, সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের তহবিল ঘাটতির পাশাপাশি কোম্পানির এমডি নিয়োগেও জটিলতা রয়েছে। প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার নিয়োগের বিষয়ে কোম্পানিটি আইডিআরএর কাছে সময় আবেদন করেছে, যা চলতি মাসে শেষ হবে।
এ বিষয় জানার জন্য কোম্পানিটির সচিব মো. আব্দুর রব ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী মো: রফিকুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তারা কল রিসিভ করেননি।

