সাউথইস্ট ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছাড়াল সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা, আলমগীর কবির ও কাসেমের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়
শেয়ারবার্তা ২৪ ডটকম, ঢাকা: ব্যাংক খাতে জালিয়াতির মাধ্যমে বিতরণ করা বড় অঙ্কের সব ঋণই এখন খেলাপি হচ্ছে। এ কারণে অপরিশোধিত ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। যা ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের বোঝা বাড়িয়ে দিচ্ছে। যেসব ব্যাংকে ঋণ জালিয়াতি বেশি হয়েছে, সেগুলোতেই বর্তমানে খেলাপি ঋণের বোঝা বেশি। মাত্রাতিরিক্ত খেলাপি ঋণের কারণে জালিয়াতির শিকার ব্যাংকগুলোই বর্তমানে বেশি দুর্বল। এর মধ্যে অতি দুর্বল ৫টি ব্যাংক একীভূত করা হচ্ছে। তবে একীভূত ইস্যুতে সম্মতি নয় এক্সিম ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংক খাতের হালনাগাদ সার্বিক চিত্র নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৈরি প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য উপাত্ত পাওয়া গেছে।
সূত্র জানায়, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে ব্যাংক খাতে নজিরবিহীন লুটপাট হয়েছে। লুটপাট করতে ১১টি ব্যাংক দখল করা হয়েছে। এরই মধ্যে সাউথইস্ট ব্যাংক পিএলসি’র ঋণ খেলাপি প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকায় এসে দাঁড়িয়েছে। ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যাংকে রাখা আমানতকারীদের টাকা যেমন আত্মসাৎ করা হয়েছে, তেমনি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। পাচার করা টাকায় বিদেশে গড়ে তোলা হয়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিলাসবহুল প্রতিষ্ঠান। পাচারের টাকায় জালিয়াতরা এখন দেশ থেকে পালিয়ে বিদেশে বিলাসবহুল জীবন যাপন করছেন।
এর মধ্যে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক খাতের সাউথইস্ট ব্যাংক পিএলসি’র ঋণ খেলাপি বাড়ায় ব্যাংকটির আমানতকারীরা পড়েছেন ঝুঁকিতে। নতুন করে ব্যাংকটিতে আমানত রাখতেও ভয় পাচ্ছেন তারা। শুধু তাই নয়, সাউথইস্ট ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আলমগীর কবির ও পরিচালনা পর্ষদের ছত্রছায়ায় অনিয়মমাফিক ঋণ দেওয়ার কারণে ঋণ খেলাপির পরিমাণও বেড়েছে। মুলত দুইজনের কাছে জিম্মি ছিলো সাউথইস্ট ব্যাংক।
একজন খোদ সাউথইস্ট ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান আলমগীর কবির। অপরজন পদ্মা ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান চৌধুরী নাফিজ সরাফাত। তাদের দুজনের বিরুদ্ধেই রয়েছে আর্থিক দুর্নীতি, ঋণ জালিয়াতি, পুঁজিবাজার কেলেঙ্কারি ও অর্থপাচারসহ নানা অভিযোগ। আলমগীর কবির সম্প্রতি চৌধুরী নাফিজ সরাফাতকে সঙ্গে নিয়ে সাউথইস্ট ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন বলে অভিযোগ করেছেন ব্যাংকটির অন্যান্য পরিচালক ও কর্মকর্তাদের বড় একটা অংশ।
এতে আমানতকারীদের ভবিষ্যৎ শঙ্কায় পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে আলমগীর কবির, নাফিজ সরাফতের প্রতিষ্ঠান সিঙ্গেল ক্লিক আইটি সলিউশনস এবং আলমগীর কবিরের দুর্নীতির সহযোগী এশিয়া ইন্সুরেন্সকে দ্রুত সাউথইস্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ থেকে অব্যাহতি দিয়ে ব্যাংকটিকে রক্ষার জন্য আমানতকারী ও শেয়ারহোল্ডাররা দাবি জানিয়েছেন।
অন্যদিকে সাউথইস্ট ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঘঝট) ট্রাস্টি বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান মো. এম এ কাসেম এর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, নির্বাচিত ভূমি কেনাকাটায় ৩০৪ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার, বিলাসবহুল গাড়ি বাজেট ব্যবহার, অতিরিক্ত সিটিং ভাতা গ্রহণ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিল সাউথইস্ট ব্যাংকে এফডিআর করার মতো গঠনমূলক কেন্দ্র নিয়ে অনিয়মের অনুসন্ধান ও তদন্ত চাওয়া হয়েছে। দুদক সূত্রে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
দুদক সূত্র জানায়, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান থাকাকালে এম এ কাসেমের দুর্নীতি ও অনিয়মের বিষয়টি অনুসন্ধানে তিন সদস্যের অনুসন্ধান টিম গঠন করেছে দুদক। অনুসন্ধান টিমের সদস্যরা হলেন: উপপরিচালক আজিজুল হক, সহকারী পরিচালক মো. মেহেদী মুসা জেবিন ও সহকারী পরিচালক আল-আমিন। দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগে বলা হয়, সাউথইস্ট ব্যাংকের চেয়ারম্যান এম এ কাসেম ক্যাম্পাসের উন্নয়নের নামে ৯০৯৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ জমির ক্রয়মূল্য বাবদ ৩০৩ কোটি ৮২ লাখ ১৩ হাজার ৪৯৭ টাকা হস্তন্তর, রূপান্তর ও স্থানান্তরের মাধ্যমে আত্মসাৎ করেছেন। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে। কাসেম কম মূল্যের জমি বেশি দামে ক্রয় দেখানো, ডেভেলপার কোম্পানি থেকে কমিশন নেওয়া,
ছাত্রদের টিউশন ফি থেকে অবৈধভাবে ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যের জন্য বিলাসবহুল গাড়ি ক্রয়, লাখ টাকা করে সিটিং অ্যালাউন্স, অনলাইনে মিটিং করেও সমপরিমাণ অ্যালাউন্স গ্রহণ, নিয়ম ভেঙে বিশ্ববিদ্যালয় ফান্ডের ৪০৮ কোটি টাকা নিজেদের মালিকানাধীন ব্যাংকে এফডিআর, ইউজিসির নির্দেশনা অমান্য করে কয়েকগুণ শিক্ষার্থী ভর্তিসহ নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা অনিয়মের বিষয়ে সরকারের বিভিন্ন দফতরে তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ জমা পড়লেও অজ্ঞাত কারণে তিনি ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছেন।
জানা গেছে, ২০০৪ সাল থেকে টানা ২০ বছর সাউথইস্ট ব্যাংকের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন আলমগীর কবির। গত বছরের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন আসে। গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এম এ কাশেম। চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করলেও আলমগীর কবির এত দিন ব্যাংকটির পরিচালক হিসেবে ছিলেন। গত মাসের (জুলাই) শেষে তিনি পরিচালক পদ থেকেও পদত্যাগ করেছেন।
তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, ২০২৪ সালে সাউথইস্ট ব্যাংকের গ্রাহকদেরকে দেওয়া মোট লোন বা ঋণের পরিমাণ এসে দাঁড়িয়েছে ৩৬ হাজার ৯৯৮ কোটি ৭২ লাখ ৩৯ হাজার ৯৫২ টাকা। এখান থেকে ঋণ খেলাপির পরিমাণ এসে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৪৮১ কোটি ৩৬ লাখ ৪৮ হাজার ১০৫ টাকা বা ১৪ দশমিক ৮২ শতাংশ। গত বছর ঋণ খেলাপির পরিমাণ ছিল ৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ। অর্থাৎ ঋণ খেলাপির পরিমাণ বেড়েছে ৫৩ শতাংশের বেশি।
অভিযোগ রয়েছে, দুর্বল ও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তির প্রতিষ্ঠানে লোন দেওয়ার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় সাউথইস্ট ব্যাংকের ঋণ খেলাপির পরিমাণ বেড়েছে। আর খেলাপিকারকরা এসমস্ত ঋণ গত বছরের ৫ আগস্টের আগে ও পরে বিদেশে পাচার করেছে, নিজেরাও গা ঢাকা দিয়েছে।
এদিকে তথ্য বিশ্লেষণে আরও জানা গেছে, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে ৩০০ কোটি টাকার অধিক আনরিয়েলাইজড লোকসানের কবলে পড়েছে সাউথইস্ট ব্যাংক। পুঁজিবাজারের বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ রয়েছে ৫৬৮ কোটি ১৪ লাখ ৫৪ হাজার ৭৬২ টাকা। ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪ সাল পর্যন্ত সেগুলোর বাজার দর এসে দাঁড়িয়েছে ৩২৫ কোটি ৬৫ লাখ ৬ হাজার ৫০৮ টাকা। এক্ষেত্রে আন রিয়েলাইজড লোকসান হয়েছে ২৪২ কোটি ৪৯ লাখ ৪৮ হাজার ২৫৪ টাকা।
এদিকে বিশেষ ফান্ডের শেয়ারে বিনিয়োগ রয়েছে ১৭০ কোটি ২৮ লাখ ৭ হাজার ৩ টাকা। আর ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে এই ফান্ডের বাজার দর এসে দাঁড়িয়েছে ৮৬ কোটি ৫৯ লাখ ৭৪ হাজার ৩৫২ টাকা। এক্ষেত্রে আনরিয়েলাইজড লোকসানে রয়েছে ৮৩ কোটি ৬৮ লাখ ৩২ হাজার ৬৫১ টাকা। অর্থাৎ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে মোট ৩২৬ কোটি ১৭ লাখ ৮০ হাজার ৯০৫ টাকা লোকসান করেছে।
তথ্য বিশ্লেষণে আরও জানা গেছে, বিশেষ ফান্ডের মধ্যে বিতর্কিত ব্যবসায়ী সালমান এফ রহমানের বেক্সিমকো গ্রিন সুকুক বন্ডে ১০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে, যেখানে ৫২ কোটি ৫০ লাখ টাকা আনরিয়েলাইজড লোকসান করেছে সাউথইস্ট ব্যাংক। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে এভাবে লোকসান করায় কোম্পানিটির ম্যানেজমেন্ট ও পরিচালনা পর্ষদের দূরদর্শিতার যথেষ্ট অভাব রয়েছে বলে জানিয়েছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালে শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছে দশমিক ৩২ টাকা। এর আগের বছর ইপিএস হয়েছিল এক দশমিক ৬০ টাকা। বছরের ব্যবধানে ইপিএস কমেছে এক দশমিক ২৮ টাকা ৮০ শতাংশ। ২০২৪ সালে কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের কোনো ডিভিডেন্ড দেয়নি। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, ব্যবসায়িকভাবে দুর্বল হয়ে যাওয়া ব্যাংকটি ২০২৪ সালে গ্রাহকদের এক হাজার ৪০৪ কোটি ৬১ লাখ ২১ হাজার ৭৯৪ টাকা বেশি লোন দিয়েছে, যা কোনোভাবেই উচিত হয়নি বলে জানিয়েছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে নিয়ম অনুসারে সাউথইস্ট ব্যাংকে স্টেটরি রিজার্ভেও ঘাটতি রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রুলস অনুসারে পরিশোধিত মূলধনের সমান হতে হবে স্টেটরি রিজার্ভ। কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন এক হাজার ৩৩৭ কোটি ৩৯ লাখ ৬৩ হাজার ৮৮০ টাকা। আর স্টেটরি রিজার্ভে রয়েছে এক হাজার ৩২৩ কোটি ৯৫ লাখ ৬৫ হাজার ৮৯০ টাকা। এক্ষেত্রে স্টেটরি রিজার্ভে ঘাটতি রয়েছে ১৩ কোটি ৪৩ লাখ ৯৭ হাজার ৯৯০ টাকা। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনাকে অমান্য করেছে সাউথইস্ট ব্যাংক পিএলসি।
জানা গেছে, ঋণ খেলাপিতে জর্জরিত বে-লিজিং অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডে সাউথ ইস্ট ব্যাংকের মেয়াদি আমানত রয়েছে ১৪৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা। সাউথইস্ট ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যানের আলমগীর কবিরের পারিবারিক প্রতিষ্ঠান বে-লিজিং। সে-সময়ের পরিচালনা পর্ষদের যোগসাজসে এই অর্থ বে-লিজিংকে দেওয়া হয়েছে। এখনো বে-লিজিং থেকে সুদসহ সাউথ ইস্ট ব্যাংক এই অর্থ উঠাতে পারছে না।
কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের রেমুনারেশন (সম্মানী) বাড়ানো হয়েছে ৯ লাখ ৮৩ হাজার ৯৩২ টাকা। আর পরিচালকদের ফিস বাড়ানো হয়েছে ১৩ লাখ ৮৩ হাজার ২০৭ টাকা। যেখানে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা কোনো লভ্যাংশ পায়নি, আমানতকারীদের অর্থ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, সেখানে আর্থিকভাবে বেহাল দশায় থাকা সাউথইস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও অন্যান্য পরিচালকদের রেমুনারেশন বা ফিস এভাবে বাড়ানো কোনোভাবেই উচিত হয়নি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব ব্যাপারে জানতে চাইলে সাউথইস্ট ব্যাংকের কোম্পানি সচিব মামুনুর রশিদের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

