ডিভিডেন্ড মৌসুমেও পুঁজিবাজারে টানা দরপতনে তীব্র হচ্ছে আস্থার সংকট
বিশেষ প্রতিনিধি, শেয়ারবার্তা ২৪ ডটকম, ঢাকা: টানা দরপতনের বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে দেশের পুঁজিবাজার। তবে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে কোন বাস্তব উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। এছাড়া পুঁজিবাজারে জুন ক্লোজিং বা হিসাববছর শেষ হওয়া তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন ও লভ্যাংশ ঘোষণার অপেক্ষায় সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। এর প্রভাবে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) টানা ৫ম কার্যদিবসের মতো সূচকের দরপতন হয়েছে।
ফলে দিন যতই যাচ্ছে পুঁজিবাজারের হাহাকার ততই বাড়ছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে ঠেকেছে যে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ মানেই লোকসান। ফলে মাসুদ কমিশনের দায়িত্ব নেওয়ার ৫ মাস অতিবাহিত হলেও এখন আস্থা ফেরাতে পারেনি পুঁজিবাজার। বরং আস্থা বিনিয়োগকারীদের যেটুকু ছিল তাও সংকটে পড়েছে।
ফলে দিন দিন বিনিয়োগকারীদের লোকসানের পাল্লা ভারী হচ্ছে। তবে ২০২৬ সালের জুন মাসে মাসুুদ খানের নেতৃত্বে গঠিত বিএসইসির নতুন কমিশন ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার ও কৃত্রিম হস্তক্ষেপ বন্ধ এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি চালুর মতো সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিলেও ৫ মাসে আস্থা ফেরাতে পারেনি পুঁজিবাজার। ফলে মাসুদ কমিশনের উপর ক্ষোভ বাড়ছে বিনিয়োগকারীদের।
তবে নির্বাচনের পর নতুন সরকার ও নতুন নিয়ন্ত্রক সংস্থা ঘিরে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বড় প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। এর ওপর ভর করে কিছুটা গতি ফিরেছিল দেশের পুঁজিবাজারে। তবে সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন বাস্তবে না ঘটায় এখন বাজারে দেখা দিয়েছে উল্টো চিত্র। টানা দরপতনের পাশাপাশি সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) প্রধান সূচক ৪৯ পয়েন্টের বেশি কমে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ ও আস্থার সংকট তীব্র হচ্ছে। আবারও পুঁজি হারানোর আতঙ্ক পেয়ে বসেছে বিনিয়োগকারীদের।
ফলে সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচকের বড় দরপতনে লেনদেন শেষ হয়েছে। তবে টানা দরপতনের সঙ্গে লেনদেনের গতিও কমে গেছে। তেমনি ডিএসইতে লেনদেন কমে ৫০০ কোটি টাকার ঘরে নেমেছে।
মুলত আর্থিক প্রতিবেদন ও লভ্যাংশ মৌসুমে সর্তক অবস্থানের কারণে বিনিয়োগকারীরা নতুন করে বিনিয়োগ করছেন না। এছাড়া গত দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে পুঁজিবাজার উন্নয়নে নানা সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেয়া হলেও বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা কাটেনি। বরং বাজার আজ ভাল তো কাল খারাপ। এ অবস্থায় অধিকাংশ সময় সূচকের টানা দরপতনে বাজারের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলছেন বিনিয়োগকারীরা।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ডিএসইতে লেনদেন শুরু হওয়ার পর পরই দাম কমার তালিকায় চলে আসে বেশিরভাগ কোম্পানি। ফলে লেনদেনের শুরুতেই সূচক ঋণাত্মক হয়ে পড়ে। লেনদেনের শেষ দিকে দরপতনের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। ফলে দাম কমার তালিকা বড় হওয়ার পাশাপাশি সবকটি মূল্যসূচকের বড় পতন দিয়েই দিনের লেনদেন শেষ হয়।
অভিজ্ঞ বিনিয়োগকারী কাজী হোসাইন আলী বলেন, টানা দরপতনের মধ্যেও পুঁজিবাজারকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার দৃশ্যমান কোন তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। এতে বিনিয়োগকারীদের হতাশা আরও বাড়ছে। বাজারের প্রতি আস্থা ও বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার এখনই সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি বাজার মনিটরিং জোরদার করে দরপতনের কারণ অনুসন্ধান এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বাজার বিশ্লেষকরা বলেন, পুঁজিবাজারে উত্থান-পতন থাকাটাই স্বাভাবিক। তবে একটানা উত্থান কিংবা ধারাবাহিক পতন কোনোটিই বাজারের জন্য ইতিবাচক নয়। বর্তমানে জুন ক্লোজিং কোম্পানিগুলোর ডিভিডেন্ড ঘোষণার মৌসুম চলছে। এ সময়ে সাধারণত বাজারে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। বরং পুঁজিবাজারে টানা দরপতন অব্যাহত রয়েছে। ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন বিনিয়োগকারীরা।
জানা গেছে, সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচকের পতনে কমেছে বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ার দর ও টাকার পরিমাণে লেনদেন। ডিএসই সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। দিনশেষে ডিএসই ব্রড ইনডেক্স আগের দিনের চেয়ে ৪৯ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ৫ হাজার ৪৮২ পয়েন্টে। আর ডিএসই শরিয়াহ সূচক ১০ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ১ হাজার ৮৯ পয়েন্টে এবং ডিএসই ৩০ সূচক ১৮ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ১ হাজার ৮৫ পয়েন্টে।
দিনভর লেনদেন হওয়া ৩৮৫ কোম্পানি ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মধ্যে দর বেড়েছে ৬৬ টির, দর কমেছে ২৯১ টির এবং দর অপরিবর্তিত রয়েছে ২৮ টির। ডিএসইতে ৫৪২ কোটি ৯৮ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। যা আগের কার্যদিবস থেকে ১৮০ কোটি ১৩ লাখ টাকা কম। এর আগের দিন লেনদেন হয়েছিল ৭২৩ কোটি ১১ লাখ টাকার।
অপরদিকে, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ১৫২ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৬৭৯ পয়েন্টে। সিএসইতে ১৭১ টি কোম্পানি লেনদেনে অংশ নিয়েছে। এসব কোম্পানির মধ্যে ৪০ টির দর বেড়েছে, কমেছে ১১৩ টির এবং ১৮ টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। সিএসইতে ১৩ কোটি ৩২ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে।

