বীমা খাতের অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে: অর্থমন্ত্রী
শেয়ারবার্তা ২৪ ডটকম, ঢাকা: ব্যাংকিং খাতের মতো বীমা খাতেও অনিয়ম-লুটপাট হয়েছে। এ খাতের গ্রাহকরাও তাদের কষ্টের টাকা ফেরত পাচ্ছেন না। ফলে বীমা খাতে অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা ও দুর্নীতি গভীরে শিকড় গেড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, বীমা খাতকে নিয়ন্ত্রণে আনতে কঠিন পদক্ষেপ নিতে হবে। গ্রাহকের আস্থা ফেরাতে বীমা কোম্পানিগুলোকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিমা দাবি পরিশোধ করতে হবে। প্রয়োজন হলে গ্রাহকের পাওনা পরিশোধে কোম্পানির সম্পদ বিক্রি করতে হবে।
আজ সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) রাজধানীতে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) কার্যালয় পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন অর্থমন্ত্রী।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, গ্রাহক নিজের কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে ভবিষ্যতের নিরাপত্তার জন্য বীমা করেন। অথচ অনেক বীমা কোম্পানি গ্রাহকের দাবি পরিশোধ করছে না। বর্তমানে প্রায় ৫৭ শতাংশ বীমা দাবি পরিশোধ করা হয়নি। অর্থাৎ, ১০০টি দাবির মধ্যে ৫৭টিই অনিষ্পন্ন রয়েছে। এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি বলেন, বীমা কোম্পানিগুলোকে দাবি পরিশোধের জন্য সময়সীমা দেওয়া হচ্ছে। যারা দাবি পরিশোধ করছে, তারা ভালো করছে। যারা করছে না, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অনেক কোম্পানি গ্রাহকের পাওনা পরিশোধ না করে জমি ও অন্যান্য সম্পদ কিনেছে। তাদের যদি নগদ অর্থের সংকট থাকে, তাহলে সম্পদ বিক্রি করে হলেও গ্রাহকের দাবি পরিশোধ করতে হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, যে মানুষটা নিরাপত্তার জন্য ইন্স্যুরেন্স করে, নিজের কষ্টের অর্জিত টাকা থেকে দেয়, তাকে আপনি কীভাবে সেই টাকা থেকে বঞ্চিত করবেন? এরই মধ্যে কিছু দাবি পরিশোধ করা হয়েছে। আইডিআরএর চেয়ারম্যান নিজেও একটি দাবি পরিশোধের উদ্যোগ নিয়েছেন, যা মূলত একটি দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য। তবে বিমা দাবি পরিশোধ করা নিয়ন্ত্রক সংস্থার চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নয়, সংশ্লিষ্ট বিমা কোম্পানিকেই তা পরিশোধ করতে হবে।
বীমা খাতে ব্যাংকিং খাতের মতোই অনিয়ম ও দুর্নীতি দেখা যাচ্ছে মন্তব্য করে অর্থমন্ত্রী বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর তারা বিমা খাতে ব্যাপক অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও অনিয়ন্ত্রণ দেখতে পেয়েছেন। এ কারণে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, বীমা খাতকে নিয়ন্ত্রণে আনতে বীমা আইনেও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হবে। ব্যাংকিং খাতের মতো বিমা খাতেও প্রয়োজনীয় ‘রেজুলেশন’ কাঠামো গড়ে তোলা হবে। এসব পরিবর্তন আগামী দিনে সংসদে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বীমা খাতে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা চালুর কথা জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, আইডিআরএর পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় তদারকি ব্যবস্থা আগে না থাকায় বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এখন প্রত্যেকটি বিমা কোম্পানিকে অটোমেশনের আওতায় আনা হবে এবং লেনদেন অনলাইনে করতে হবে।
তিনি বলেন, যত বেশি শারীরিক যোগাযোগ থাকবে, দুর্নীতির সুযোগ তত বেশি থাকবে। এ কারণে পুরো ব্যবস্থাকে ইন্টারঅপারেবল করা হচ্ছে। বীমা কোম্পানি ও আইডিআরএর পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনসহ বীমা খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে। কিছু বিমা কোম্পানির দুটি সার্ভার ব্যবহারের অভিযোগের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, একটি সার্ভার প্রকৃত তথ্যের জন্য এবং অন্যটি ভিন্ন লেনদেনের জন্য ব্যবহারের মতো ঘটনা পাওয়া গেছে। এখন থেকে কোনো কোম্পানিতে দুই সার্ভার রাখা যাবে না।
নির্ধারিত সময়ের পর পরিদর্শন শুরু হবে জানিয়ে তিনি বলেন, কোনো কোম্পানিতে দুই সার্ভার পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বীমা কোম্পানিগুলোর আর্থিক লেনদেন ও সব কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আনতে হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার সব কমপ্লায়েন্স পুরোপুরি মানতে হবে, আংশিক মানলে চলবে না। বীমা খাতের কয়েকটি কোম্পানির অবস্থা অত্যন্ত উদ্বেগজনক উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, সাত-আটটি কোম্পানি এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে তারা এখনো কীভাবে কার্যক্রম চালাচ্ছে, সেটিই চিন্তার বিষয়। এসব কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা মেনে এসব কোম্পানিকে স্বল্প সময়ের মধ্যে সমস্যাগুলো সমাধান করতে হবে। যারা তা করতে পারবে না, তাদের বিরুদ্ধে অন্য ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে কোনো কোম্পানিকে একীভূত করার বিষয়ে এখনই কিছু বলতে চান না জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিমা কোম্পানির জন্য যা প্রয়োজন, সেটিই করা হবে। বিষয়গুলো প্রস্তুত না হওয়া পর্যন্ত আগেভাগে এ বিষয়ে মন্তব্য করা ঠিক হবে না।
আইডিআরএর জনবল সংকটের পাশাপাশি দক্ষ ও পেশাদার জনবলের ঘাটতি রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থায় জনবলের সংখ্যা এবং তাদের মান দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে দুটোরই ঘাটতি রয়েছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে ধীরে ধীরে সরকারের ডেপুটেশনে থাকা কর্মকর্তার সংখ্যা কমিয়ে আইডিআরএর নিজস্ব জনবল গড়ে তোলা হবে। তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ ও পেশাদার হিসেবে গড়ে তোলা হবে, যাতে তারা দীর্ঘমেয়াদে বীমা খাতের নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির কাজ করতে পারেন। বীমা একটি বিশেষায়িত পেশা। এ পেশায় পড়াশোনা ও অভিজ্ঞতা আছে এমন দক্ষ লোকজনকে আইডিআরএর সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন।
বীমা খাতের বিভিন্ন মামলা ও আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সমস্যা হচ্ছে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, কেউ কেউ নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্ত এড়াতে আদালতে চলে যাচ্ছেন এবং এ সুযোগে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
এ সমস্যা সমাধানে বীমা আইনে পরিবর্তন আনার পাশাপাশি আইডিআরএর ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তন আনা হবে বলে জানান তিনি। বিমা খাতকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার লক্ষ্য তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিশ্বজুড়ে অর্থনীতিতে বিমার ভূমিকা অনেক বড়। বীমা পেশার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও বিভিন্ন দেশে সম্মানজনক অবস্থানে রয়েছেন। বাংলাদেশেও বিমাকে সেই পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে।
তিনি বলেন, একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বীমা কোম্পানির অবদান অনেক বড় হতে পারে। বিমার পরিধি জীবন বিমার পাশাপাশি মানুষের সম্পদ, ব্যবসা, বাড়িঘর, আসবাবপত্র ও ইলেকট্রনিক পণ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিস্তৃত। কিন্তু বাংলাদেশে বিমার সেই সম্ভাবনাকে এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি। ফলে বিমা খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতির শিকড় অনেক গভীরে। ‘অনিয়ন্ত্রণ, বিশৃঙ্খলা ও দুর্নীতি এত গভীরে এটা কঠিন কাজ। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থে কঠিন কাজটিই করতে হবে।
তিনি বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা যখন কার্যকরভাবে কাজ শুরু করবে, তখন বাজারে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। যারা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত, তারা নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে দুর্বল করে আগের অবস্থায় ফিরে যেতে চাইবে। কিন্তু সেই সুযোগ আর দেওয়া হবে না। ওই দরজা আমরা বন্ধ করে দিয়েছি। এখন থেকে বীমা কোম্পানিগুলোকে আইন মেনে, নিয়ন্ত্রিতভাবে, পেশাদারত্বের সঙ্গে এবং নতুন ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় কাজ করতে হবে।

