স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, শেয়ারবার্তা ২৪ ডটকম, ঢাকা: দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি আর্থিকখাত। বিশেষ করে ব্যাংক ও পুঁজিবাজার। জুলাই বিপ্লবে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ব্যাংকিং খাতে নানামুখী সংস্কার ও পদক্ষেপের মাধ্যমে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হলেও আর্থিকখাতের আরেক চালিকাশক্তি পুঁজিবাজারে বিপরীত অবস্থা বিরাজমান।

ক্রমান্বয়ে পুঁজিবাজার ডুবতে বসেছে। স্পর্শকাতর এই খাতটির সঙ্গে লাখ লাখ বিনিয়োগকারীদের সরাসরি বিনিয়োগ জড়িত, প্রতিদিনের লেনদেনের প্রতিফলন ঘটে সূচক উঠা-নামার মাধ্যমে, ফলে বিনিয়োগকারীদের প্রতিক্রিয়াটিও সূচকের সমান্তরাল রেখায় প্রতিফলিত হয়।

অবশ্য এক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদসহ শীর্ষ ব্যক্তিদের খামখেয়ালীপনা, বাজার সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানের অভাব, নানা হঠকারী সিদ্বান্ত, ব্যক্তিগত অভিপ্রয়াস, পুঁজিবাজারের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ব্যক্তিবর্গকে অবমূল্যায়ন, কমিশনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, নতুন মিউচুয়্যাল ফান্ড বিধিমালা-২০২৫ ও মার্জিন রুলের মতো আত্মঘাতি সিদ্বান্ত বাস্তবায়ন, আইপিও খরা, পুঁজিবাজারের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ব্যক্তিদেরকে অবমূল্যায়ন এবং একটি স্বার্থান্বেষী কুচক্রি মহল দ্বারা প্রভাবিত হওয়াসহ নানাবিধ কারণে দেশের পুঁজিবাজার ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।

এছাড়া দেশের শিল্পায়নের গতি প্রত্যাশিত মাত্রায় না পৌঁছানোর পেছনে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ঘাটতি অন্যতম বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা ও সম্প্রসারণে বিপুল মূলধনের প্রয়োজন হলেও দেশের অর্থায়ন কাঠামো এখনো মূলত ব্যাংকনির্ভর। উচ্চ সুদের চাপ, ঋণ পরিশোধের সময়সীমা এবং আর্থিক ঝুঁকি অনেক উদ্যোক্তার জন্য বড় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়।

ফলে শিল্পখাতের সম্প্রসারণ কাঙ্খিত গতিতে এগোতে পারে না। রাশেদ মাকসুদ দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের পুঁজিবাজারে নজিরবিহীন স্থবিরতা বিরাজ করছে। গত ১৯ মাসে কোনো নতুন কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়নি। এমনকি এ সময়ে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) অনুমোদনের জন্যও কোনো আবেদন জমা পড়েনি নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসিতে।

]ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান পদ থেকে খন্দকার রাশেদ মাকসুদকে সরানোর পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। তাকে এ পদ থেকে সরানোর আগে কমিশন আইনে কিছু পরিবর্তন আনা হবে। এরই মধ্যে আইন পরিবর্তনের কার্যক্রম শুরু করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে বলবৎ থাকা ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন, ১৯৯৩’ অনুযায়ী বিএসইসি চেয়ারম্যানের সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬৫ বছর। অর্থাৎ, বয়স ৬৫ বছর পূর্ণ হলে কোনো ব্যক্তি বিএসইসির চেয়ারম্যান হওয়া বা এ পদে থাকার যোগ্য হবেন না।

সরকার বিএসইসি চেয়ারম্যানের বসয়সীমা আরও কমিয়ে আনার পরিকল্পনা করছে। এক্ষেত্রে তা পাঁচ বছর কমিয়ে সর্বোচ্চ ৬০ বছর করা হতে পারে। অর্থাৎ, ৬০ বছর পূর্ণ হলে কোনো ব্যক্তি বিএসইসি চেয়ারম্যান হওয়া বা এ পদে থাকার যোগ্য হবেন না। চেয়ারম্যানের পাশাপাশি বিএসইসি কমিশনারদের বয়সসীমাও কমিয়ে ৬০ বছর করা হতে পারে।

বিএসইসি চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের বয়সসীমা কমানোর পাশাপাশি বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান ও সদস্যদের বয়সসীমা কমানোরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমান আইন অনুযায়ী, আইডিআরএ’র চেয়ারম্যান ও সদস্যদের সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণ করা আছে ৬৭ বছর। এটি কমিয়ে ৬০ বছর করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের আত্মীয় হিসেবে পরিচিত খন্দকার রাশেদ মাকসুদ ওই বছরের ১৮ আগস্ট ৪ বছরের জন্য বিএসইসির চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পান

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ তথা শেখ হাসিনার সরকারের পতন হলে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেয় মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের আত্মীয় হিসেবে পরিচিত খন্দকার রাশেদ মাকসুদ ওই বছরের ১৮ আগস্ট ৪ বছরের জন্য বিএসইসির চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পান।

রাশেদ মাকসুদ বিএসইসি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেওয়ার পর শেয়ারবাজারে ব্যাপক দরপতন হয়। এই দরপতনের প্রতিবাদ জানিয়ে এবং রাশেদ মাকসুদের অপসারণ দাবিতে দিনের পর দিন বিক্ষোভ করেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। এমনকি একই দাবিতে মতিঝিলে বিনিয়োগকারীদের ‘কাফন মিছিল’ও হয়।

তখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিনিয়োগকারীদের দাবির প্রতি কোনো কর্ণপাত করেনি। বরং তৎকালীন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বিভিন্ন সময় বিএসইসি চেয়ারম্যান হিসেবে খন্দকার রাশেদ মাকসুদের প্রসংশা করেন। এমনকি একটি বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘অনেকের দাবি থাকলেও শেয়ারবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদকে পদ থেকে সরাতে চাই না।’

এ বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার গঠনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পর বিএসইসির চেয়ারম্যান পরিবর্তনের গুঞ্জন শুরু হয়। বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পরিবর্তনের পর বিএসইসি চেয়ারম্যান পরিবর্তন নিয়েও গুঞ্জন জোরালো হয়।

এর মধ্যেই আইডিআরএ’র চেয়ারম্যান পদ থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া এম আসলাম আলম পদত্যাগ করলে, বিএসইসি চেয়ারম্যানের পদত্যাগ নিয়েও গুঞ্জনের পালে হাওয়া লাগে। তবে এখনো চেয়ারম্যান পদে বহাল থেকে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন খন্দকার রাশেদ মাকসুদ। কারণ, তিনি নিজে থেকে পদত্যাগ করেননি এবং সরকার এখনো তাকে সরিয়ে দেয়নি। যদিও তাকে সরানোর প্রক্রিয়া এখন শুরু হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিএসইসির চেয়ারম্যান পদ থেকে রাশেদ মাকসুদকে সরিয়ে দেওয়া হবে। তবে তাকে এ পদ থেকে সরানোর আগে কমিশনের আইনে কিছু সংশোধন আনা হবে। এরই মধ্যে আইন সংশোধনের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব এটি শেষ করা হবে।