বিশেষ প্রতিনিধি, শেয়ারবার্তা ২৪ ডটকম, ঢাকা: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক খাতের কোম্পানি মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসিতে এমডি-পরিচালক ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের যোগসাজশে হাজার কোটি টাকার অনিয়ম ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। মুলত করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর), কম্বল, ডায়েরি-কালেন্ডার, ল্যাপটপ, সফটওয়্যার ও আসবাবপত্র কেনাকাটা থেকে শুরু করে কর্মীদের প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি, কল্যাণ তহবিল এবং বিদেশে চিকিৎসা ব্যয়ের ক্ষেত্রেও গুরুতর অনিয়মের তথ্য পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শন দল।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে অনিয়মের সঙ্গে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মতিউল হাসান, দুই উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) এবং প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও) তাপস চন্দ্র পালসহ একাধিক পরিচালক ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠে এসেছে। অনিয়মে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়ার পর এমডি, দুই ডিএমডি ও সিএফওকে চাকরি থেকে অপসারণের সুপারিশ করা হয়েছে বলে ব্যাংকটিতে পাঠানো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

মুলত শেয়ারহোল্ডারদের গত দুই বছর লভ্যাংশ বঞ্চিত করলেও ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মতিউল হাসানের একাধিক বিদেশ সফর এবং এসব সফরে ব্যাংকের অর্থ ব্যয়ের পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ব্যাংকের লেনদেন বিবরণী অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাত, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড ও যুক্তরাজ্য সফরে ৩৪ লাখ টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে। এর বাইরে সিঙ্গাপুর সফরের পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত বাতিল হলেও ওই সফরের জন্য ১ লাখ ৫০ হাজার ২১৩ টাকা ব্যয়ের তথ্য রয়েছে। সব মিলিয়ে চারটি সম্পন্ন সফর ও বাতিল হওয়া সিঙ্গাপুর সফর বাবদ ব্যাংকের মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩৫ লাখ ৯১ হাজার টাকা।

মার্কেন্টাইল ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডাররা ২০১৬ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর ১০ শতাংশ বা তার বেশি হারে ডিভিডেন্ড পেয়েছেন। ওই সময়ে ২২ শতাংশ ডিভিডেন্ড দেওয়া হয়েছিল ২০১৭ সালে। ২০২৩ সালেও ব্যাংকটি ১০ শতাংশ ডিভিডেন্ড দিয়েছিল। তবে এরপর পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে শেয়ারহোল্ডারদের কোনো ডিভিডেন্ড দিতে পারেনি ব্যাংকটি। ফলে একদিকে বিনিয়োগকারীরা ডিভিডেন্ড থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, অন্যদিকে ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীর বিদেশ সফরে ব্যয়ের বিষয়টি ব্যাংকে এবং ব্যাংকের বাইরে তুমুল আলোচনায় এসেছে।

এছাড়া বিদেশে চিকিৎসার খরচের নামে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাপক অনিয়ম চলেছে। ফিন্যান্সিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ডিভিশন ও সিএফও পদে দীর্ঘদিন অবস্থান করার সুবাদে তাপস চন্দ্র পাল একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে আর্থিক বিবরণীতে জালিয়াতি পরিচালনা করেন। পর্ষদের কয়েকজন প্রভাবশালী সদস্য ও এমডির সায় নিয়ে বিপুল এই অর্থ ভিন্ন খাতে সরিয়ে নেওয়া হয়। প্রতিবেদনে ব্যক্তিগত চিকিৎসায় ব্যাংকের অর্থ অপব্যবহারের চাঞ্চল্যকর তথ্য রয়েছে। তাপস চন্দ্র পালের স্ত্রীর সিঙ্গাপুরে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার ব্যয়, মরদেহ দেশে আনার খরচ এবং সেখানে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আতিথেয়তার ব্যয় পরিশোধ করা হয়েছে ব্যাংকের সাসপেন্স হিসাব থেকে। আর্থিক শৃঙ্খলার তোয়াক্কা না করে ব্যাংকের অনুমোদিত খাতের বাইরে এসব ব্যক্তিগত খরচ চালানো হয়েছে।

অন্যদিকে ল্যাপটপ, সফটওয়্যার ও আসবাবপত্র কেনার প্রক্রিয়ায় সঠিক দরপত্র নীতি মানা হয়নি এবং সিএসআর ও কর্মীদের প্রভিডেন্ট ফান্ডের অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার অভাব দেখা গেছে। রূপালী ব্যাংকের সাধারণ কর্মচারী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করা তাপস চন্দ্র পাল পরবর্তী সময়ে মার্কেন্টাইল ব্যাংকে জুনিয়র অফিসার হিসেবে যোগ দেন। ২০১৮ সালে ভিপি থেকে শুরু করে ২০২৬ সালে ডিএমডি পদ পর্যন্ত তার দ্রুত পদোন্নতিকে অলৌকিক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ রয়েছে, কোন পেশাগত সিএ বা এসিসিএ সনদ না থাকা সত্ত্বেও পরিচালকদের বিশেষ সুবিধা দিয়ে তিনি এই অবস্থান নিশ্চিত করেছেন।

নথিপত্রের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকের ডিএমডি ও সিএফও তাপস চন্দ্র পালের বিরুদ্ধে আর্থিক জালিয়াতি, পেশাগত অসদাচরণ, পদ্ধতিগতভাবে তহবিল আত্মসাৎ এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। ব্যাংকের কয়েকজন পরিচালক ও এমডি মতিউল হাসানসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগসাজশে সাসপেন্স হিসাব ও ব্যয় হিসাব থেকে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।

পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংকের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা তাপস চন্দ্র পাল আর্থিক বিবরণীতে কারসাজির মাধ্যমে প্রকৃত আর্থিক চিত্র আড়াল করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সিএ, এসিসিএ বা এফসিএর মতো পেশাগত সনদ না থাকা সত্ত্বেও ফিন্যান্সিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ডিভিশন (এফডিএ) ও সিএফও কার্যালয়ে দীর্ঘদিনের অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে তিনি এসব অনিয়ম করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

কর্মীদের প্রাপ্য অর্থ নিয়েও গুরুতর অনিয়মের তথ্য পেয়েছে পরিদর্শন দল। অভিযোগ রয়েছে, কর্মচারীদের গ্র্যাচুইটি, প্রভিডেন্ট ফান্ড ও কল্যাণ তহবিলের জন্য প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ না করেই ব্যাংকের আর্থিক বিবরণী প্রস্তুত করা হয়েছে। এর ফলে অবসরপ্রাপ্ত ও চাকরি ছেড়ে যাওয়া বহু কর্মচারী দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের আইনগত পাওনা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে সিএসআর ও বিভিন্ন কেনাকাটার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সিএসআর তহবিলের আওতায় প্রায় ১১০ কোটি টাকার কম্বল কেনা দেখানো হলেও এর মধ্যে কমপক্ষে ৮৮ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় চেয়ারম্যানসহ সাতজন পরিচালক জড়িত ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ব্যবসা উন্নয়ন খাতের আওতায় ডায়েরি ও ক্যালেন্ডার কেনার নামে ৭৭ কোটি ৩৪ লাখ টাকা ব্যয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুল আওয়াল ২০২১ সালে পরিচালক পদে নিয়োগ পাওয়ার পর থেকে বিভিন্ন ক্রয় কার্যক্রম ও সিএসআর ব্যয়ের মাধ্যমে মোট ১৮৭ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগের কথাও পরিদর্শন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ডায়েরি, ক্যালেন্ডার ও কম্বলের পাশাপাশি ল্যাপটপ, কম্পিউটার, সফটওয়্যার, আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন পণ্য কেনার জন্য বরাদ্দ অর্থও প্রভাবশালী পরিচালক ও রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরোক্ষ আর্থিক সুবিধা দিতে ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

মার্কেন্টাইল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও নির্বাহী কমিটির সভার ফি নিয়েও অস্বাভাবিকতার তথ্য পেয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নথিতে বলা হয়েছে, প্রতি বোর্ড ও ইসি সভায় নির্ধারিত ৮ হাজার টাকার পরিবর্তে ১ লাখ টাকা করে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। এ ক্ষেত্রে এমডি মতিউল হাসান কোম্পানি সেক্রেটারি মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম শুহিনের সহযোগিতা নেন বলে প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে। এ জন্য ব্যাংকের সাসপেন্স হিসাব এ/সি বিডিটি ১৪০৩৯০০০১০০০১ ব্যবহার করা হয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। ভুয়া বিল ও জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে এসব অর্থ সমন্বয় করা হয়ে থাকলে তা গুরুতর আর্থিক জালিয়াতি ও ফৌজদারি অপরাধের শামিল হতে পারে বলে পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

ব্যাংকের নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নয়নের নামেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। নথিতে বলা হয়েছে, এমডি মতিউল হাসান তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী প্রকৌশলী মো. রেজা হোসেনের সহায়তায় স্বচ্ছ টেন্ডার প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকার একটি কার্যাদেশ দেন। এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করায় ডিএমডি আদিল রাইহানকে অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে আইটি বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ মাহমুদ হাসানকে ভয়ভীতি দেখিয়ে অনিয়মে সহযোগিতা করতে বাধ্য করার অভিযোগও উঠেছে।

এ ছাড়া ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা অনুসরণ না করে একটি সফটওয়্যার ল্যাবকে ৮ লাখ ৪০ হাজার টাকার কার্যাদেশ দেওয়ার পর এমডি মতিউল হাসান ও প্রকৌশলী রেজা হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় রেইনবো অ্যারের অনুকূলে ব্যাংকের কাওরান বাজার শাখার মাধ্যমে ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা দেওয়ার অভিযোগও নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

ব্যাংকটির আর্থিক ফলাফলে দেখা যায়, ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে প্রভিশন সংরক্ষণের আগে পরিচালন মুনাফা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০২৩ সালে এই মুনাফার পরিমাণ ছিল ৫০৯ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। ২০২৪ সালে তা বেড়ে ৫২৭ কোটি ২২ লাখ কোটি টাকা এবং ২০২৫ সালে ৫৪৫ কোটি ৪০ লাখ টাকায় পৌঁছায়। তবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত দুই বছরে ব্যাংকটির নিট মুনাফা হয়নি। পরিচালন মুনাফা থাকা সত্ত্বেও নিট মুনাফা না হওয়া এবং ডিভিডেন্ড বন্ধ থাকার বিষয়টি ব্যাংকের আর্থিক পরিস্থিতি মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ।

আইএফআইসি ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা মতিউল হাসান ২০১৪ সালে মার্কেন্টাইল ব্যাংকে যোগ দেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ব্যাংকটির প্রধান ঝুঁকি কর্মকর্তা (সিআরও) এবং অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৪ সালের নভেম্বরে তিনি ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব নেন। এরপর ২০২৫ সালের মে মাস থেকে তাঁর বিদেশ সফরের ধারাবাহিকতা শুরু হয়। ব্যাংকের নথিতে সংযুক্ত আরব আমিরাত, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড ও যুক্তরাজ্য সফরের ব্যয়ের পাশাপাশি বাতিল হওয়া সিঙ্গাপুর সফরের ব্যয়ও উল্লেখ রয়েছে।

ব্যাংকের লেনদেন বিবরণী অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাত সফরে মতিউল হাসানের পেছনে ব্যয় হয়েছে ৬ লাখ ১০ হাজার ৪৫০ টাকা। একই বছর অস্ট্রেলিয়া সফরের জন্য ব্যয় দেখানো হয়েছে ১১ লাখ ৬২ হাজার ৪৫৮ টাকা। এই দুই সফরেই মোট ব্যয় দাঁড়ায় ১৭ লাখ ৭২ হাজার ৯০৮ টাকা। চারটি সম্পন্ন সফরের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া সফরেই সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় হয়েছে।

চলতি বছরের থাইল্যান্ড সফরটি ছিল চিকিৎসার জন্য। এই সফরে ব্যয় হয়েছে ৫ লাখ ৬৬ হাজার ৯১ টাকা। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যে এক্সিকিউটিভ ট্রেনিং প্রোগ্রামে অংশ নিতে সফরের ব্যয় দেখানো হয়েছে ১১ লাখ ১ হাজার ৯৯০ টাকা। ফলে থাইল্যান্ড ও যুক্তরাজ্য সফরে মোট ব্যয় দাঁড়ায় ১৬ লাখ ৬৮ হাজার ৮১ টাকা। চারটি সম্পন্ন সফরের ব্যয় যোগ করলে মোট পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৪ লাখ ৪০ হাজার ৯৮৯ টাকা। এর সঙ্গে বাতিল হওয়া সিঙ্গাপুর সফরের ১ লাখ ৫০ হাজার ২১৩ টাকা যোগ হয়ে সর্বমোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩৫ লাখ ৯১ হাজার ২০২ টাকা, যা প্রায় ৩৫ লাখ ৯১ হাজার টাকা।

ব্যাংকের অফিস আদেশে বলা হয়, মতিউল হাসান ২০২৬ সালের ২৬ জুন থেকে ৪ জুলাই পর্যন্ত দেশের বাইরে থাকবেন। এই সময় তিনি সোনালী বাংলাদেশ লিমিটেডের আয়োজনে যুক্তরাজ্যে ‘এক্সিকিউটিভ ট্রেনিং প্রোগ্রামে’ অংশ নেবেন। সফরের সময় তাঁর অনুপস্থিতিতে ব্যাংকের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর (ডিএমডি) ও প্রধান ঝুঁকি কর্মকর্তা (সিআরও) মো. জাকির হোসাইন ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। অফিস আদেশ অনুযায়ী, সফরের মেয়াদ ছিল ২৬ জুন থেকে ৪ জুলাই পর্যন্ত, অর্থাৎ মোট নয় দিন।

মার্কেন্টাইল এক্সচেঞ্জ হাউজ (ইউকে) লিমিটেডের পর্ষদ সভার কার্যবিবরণীতেও মতিউল হাসানের যুক্তরাজ্য সফরের প্রসঙ্গ রয়েছে। সেখানে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান এম আমানুল্লাহ, পরিচালক এ এস এম ফিরোজ আলম এবং পরিচালক ও মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মতিউল হাসানের সৌজন্য সফর অনুমোদনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে কার্যবিবরণীতে বলা হয়েছিল, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনের পর সুবিধাজনক সময়ে সফরটি অনুষ্ঠিত হবে। অর্থাৎ এই সফর বাস্তবায়নের জন্য ব্যাংকের বোর্ডের সম্মতি প্রয়োজন ছিল।

ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, শেষ পর্যন্ত পরিচালনা পর্ষদ ওই সফরের প্রস্তাবে সম্মতি দেয়নি। ফলে সফরটির অনুমোদন ও বাস্তবায়ন নিয়ে পৃথক প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে সফরের প্রস্তাব, বোর্ডের সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের প্রকৃতি সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ চিত্র পেতে ব্যাংকের মূল নথি ও অনুমোদনসংক্রান্ত কাগজপত্র যাচাই করা প্রয়োজন।

মার্কেন্টাইল ব্যাংকের নথিতে দেখা যায়, ২০২৩ সালে প্রধান ঝুঁকি কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় মতিউল হাসান ক্রেডিট ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিভাগের দুটি ঋণ সুপারিশ মেমোতে স্বাক্ষর করেছিলেন। উভয় মেমোতেই নির্দিষ্ট মেয়াদে পরিশোধযোগ্য টাইম লোনের সুপারিশ করা হয়। একটি প্রস্তাব ছিল ঈদুল ফিতর উপলক্ষে বেতন ও বোনাস পরিশোধের জন্য ডিএসএল গ্রুপের চারটি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ৪ কোটি টাকার ঋণ। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো ডেনিম প্রসেসিং প্ল্যান্ট, জেডএ সোয়েটার্স, জেডএ অ্যাপারেলস এবং ওয়ে মার্ট অ্যাপারেলস।

অন্য মেমোতে টিআরজেড গার্মেন্ট ইন্ডাস্ট্রির জন্য ১০ কোটি টাকার টাইম লোনের সুপারিশ করা হয়েছিল। উভয় ঋণ প্রস্তাবের মেয়াদ ছিল ছয় মাস এবং সুদের হার ছিল ৯ শতাংশ। এসব নথিতে মতিউল হাসানের পাশাপাশি প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. মুস্তাহিদুর রেজা চৌধুরী, আরএমজি মনিটরিং সেলের প্রধান কে এম আনোয়ারুল ইসলাম, ক্রেডিট ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান শামীম আহমেদ এবং তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম চৌধুরীর স্বাক্ষর ছিল।

টিআরজেড গার্মেন্ট ইন্ডাস্ট্রির ঋণ প্রস্তাবের মেমোতে আরএমজি মনিটরিং সেলের পর্যবেক্ষণও উল্লেখ করা হয়। সেখানে বলা হয়েছিল, গ্রাহকের মেয়াদোত্তীর্ণ দায়ের পরিমাণ ১০০ কোটি টাকা এবং প্রতিষ্ঠানটিকে ঝুঁকিপূর্ণ গ্রাহক হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ২০২২ সালের ২৩ আগস্টের পরিদর্শন প্রতিবেদন অনুযায়ী, এফসি হিসাবে প্রতিষ্ঠানটির নিট ঘাটতি ছিল ৭৫ কোটি টাকা।

নথিতে আরও বলা হয়েছে, প্রস্তাবটি ক্রেডিট কমিটির সামনে উপস্থাপন করা হয় এবং ক্রেডিট ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিভাগ ঋণটির সুপারিশ করেছিল। তবে ঋণ সুপারিশের নথিতে স্বাক্ষর থাকা নিজে থেকেই কোনো অনিয়মের প্রমাণ নয়। ঋণ দুটি শেষ পর্যন্ত কী শর্তে অনুমোদিত হয়েছিল, অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহৃত হয়েছিল কি না এবং পরবর্তী সময়ে ঋণগুলোর পরিশোধ পরিস্থিতি কী ছিল—এসব বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সংশ্লিষ্ট ঋণ নথি ও পরবর্তী কার্যক্রমের তথ্য প্রয়োজন।

বিদেশ সফর, ব্যাংকের ব্যয় এবং অন্যান্য বিষয় নিয়ে বক্তব্য জানতে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মতিউল হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ব্যাংকের জনসংযোগ বিভাগের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। পরে জনসংযোগ বিভাগের মাধ্যমে পাঠানো লিখিত জবাবে তিনি প্রতিটি সফরের পেছনে ব্যবসায়িক, প্রশিক্ষণ অথবা চিকিৎসাসংক্রান্ত কারণ তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, সফরগুলো ব্যাংকের প্রয়োজনেই করা হয়েছে এবং ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যে কোনো সফর করা হয়নি।

সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর প্রসঙ্গে মতিউল হাসান জানান, মাশরেক ব্যাংকের আয়োজনে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যাংককে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। বাংলাদেশ থেকে শীর্ষ ১০ জন ফরেন ট্রেড এক্সপার্ট ব্যাংকার এবং তৎকালীন গভর্নর আমন্ত্রিত ছিলেন বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যাংকের ব্যবসায়িক সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য এ সফর প্রয়োজনীয় ছিল।

অস্ট্রেলিয়া সফর সম্পর্কে মতিউল হাসান বলেন, মেলবোর্ন চেম্বার অ্যান্ড কমার্সের রেমিট্যান্স অ্যাওয়ার্ড পাওয়ায় বাংলাদেশ থেকে ১০ জনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। মার্কেন্টাইল ব্যাংকের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি সেখানে অ্যাওয়ার্ড গ্রহণ করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সফরটি ছিল ব্যাংকের প্রতিনিধিত্ব ও স্বীকৃতিসংক্রান্ত কার্যক্রমের অংশ।

যুক্তরাজ্য সফরের ব্যাখ্যায় তিনি জানান, সোনালী ব্যাংক ইউকে পিএলসি বাংলাদেশের ১০টি স্বনামধন্য ব্যাংকের নির্বাচিত ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে ব্যাংকিং বিষয়ে চার দিনব্যাপী ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রামে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। মার্কেন্টাইল ব্যাংকের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি ওই কর্মসূচিতে অংশ নেন বলে দাবি করেন।

থাইল্যান্ড সফর সম্পর্কে মতিউল হাসান বলেন, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অফিসে হঠাৎ অচেতন হয়ে পড়ার পর তাঁকে ইউনাইটেড হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর কোনো রোগ শনাক্ত না হওয়ায় মেডিকেল বোর্ডের পরামর্শে চিকিৎসার জন্য ব্যাংককে চার দিন অবস্থান করেন।

তাঁর ভাষ্য, বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে এমডির চুক্তির শর্ত অনুযায়ী চিকিৎসকের সুপারিশে প্রয়োজন হলে দেশের বাইরে চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়া হয়েছিল এবং ব্যাংকের নিয়ম অনুসারে এ খরচ বহন করা হয়।

মতিউল হাসানের দাবি, তাঁর সব বিদেশ সফরই ব্যাংকের ব্যবসায়িক প্রয়োজনে হয়েছে এবং এসব কর্মসূচিতে অন্যান্য ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকেরাও অংশ নিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, কোনো সফরের পেছনে ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য ছিল না। পূর্ববর্তী ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের বিদেশ সফরের তথ্য যাচাই করলে তাঁর সফরের সংখ্যা ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে তুলনামূলক ধারণা পাওয়া যাবে বলেও তিনি মনে করেন।

তিনি আরও বলেন, গত তিন মাসে ১০ থেকে ১২টি ব্যাংক যুক্তরাষ্ট্রের হাবিব আমেরিকান ব্যাংকের আমন্ত্রণে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছে। তবে মার্কেন্টাইল ব্যাংক এসব কর্মসূচিতে অংশ নেয়নি। মতিউল হাসানের মতে, বিদেশি ব্যাংকগুলোর সঙ্গে ঋণ ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক বজায় রাখতে আন্তর্জাতিক সফর গুরুত্বপূর্ণ।

সব মিলিয়ে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের সামনে একদিকে টানা দুই বছর ডিভিডেন্ড দিতে না পারার বিষয়টি রয়েছে, অন্যদিকে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিদেশ সফরের ব্যয় এবং কয়েকটি ঋণ সুপারিশের নথি নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। এমডি এসব সফরের পক্ষে ব্যবসায়িক ও ব্যক্তিগত চিকিৎসার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এখন সফরগুলোর অনুমোদন, ব্যয়ের যৌক্তিকতা, ব্যাংকের নীতিমালা অনুসরণ এবং সংশ্লিষ্ট ঋণগুলোর পরবর্তী অবস্থা—এসব বিষয়ে নথিভিত্তিক যাচাইয়ের মাধ্যমে পুরো চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।