পাঁচ ইস্যুতে পুঁজিবাজার স্থিতিশীল রাখা সম্ভব, বিএসইসি ও ডিএসইর যা করনীয়
শেয়ারবার্তা ২৪ ডটকম, ঢাকা: দেশের পুঁজিবাজারে পতন যেন পিছু ছাড়ছে না। দীর্ঘমন্দা বাজার কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেও বারবার হোঁচট খাচ্ছে। বাজারে পতন ঠেকাতে এবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) উদ্যোগ নিয়েছে। মুলত সাম্প্রতিক সময়ে সংস্কারের নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও পুঁজিবাজার স্থিতিশীল হয়নি বরং গত এক মাসে ডিএসইর সূচক উধাও ৫২৩ পয়েন্ট। এছাড়া পুঁজিবাজারে সাধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ একেবারেই নেই বলে চলে। এমনকি দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ ৪ শত কোটি টাকার ঘরে চলে আসছে।
ফলে ক্রেতার অভাবে লোকসানে শেয়ার বিক্রি করা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে একাধিক বিনিয়োগকারীরা মনে করেন।
কারণ সাম্প্রতিক সময়ে দেশের পুঁজিবাজারে চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে পার করছে। মাঝে মধ্যে সূচকের কিছুটা উত্থান দেখা মিললেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দরপতনের কবলে পড়ছে পুঁজিবাজার। তবে নির্বাচনের পর নতুন সরকার ও নতুন নিয়ন্ত্রক সংস্থা ঘিরে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বড় প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল।
এর ওপর ভর করে কিছুটা গতি ফিরেছিল দেশের পুঁজিবাজারে। তবে সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন বাস্তবে না ঘটায় এখন বাজারে দেখা দিয়েছে উল্টো চিত্র। ফলে আগস্ট মাসের মাঝামাঝি থেকে পুঁজিবাজারে টানা দরপতনের ঘটনা ঘটে। এর ফলে আবারও পুঁজি হারানোর আতঙ্ক পেয়ে বসেছে বিনিয়োগকারীদের। ফলে পুঁজিবাজার টানা দরপতন ঠেকাতে বিএসইসি ও ডিএসইর যা করনীয় তা নিয়ে একাধিক বিনিয়োগকারী ও বাজার সংশ্লিষ্টদের সাথে আলাপকালে যা জানা যায়।
প্রথমত, ডিএসই অযাচিত হস্তক্ষেপের কারণে বাজার ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না। দেখা যাচ্ছে কোনো বিনিয়োগকারী যদি বড় একটি ক্রয়াদেশ দেয়, নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে এর কারণ জানতে চাওয়া হয়। যদি বার বার হাউসে ফোন করে কারণ জানতে চাওয়া হয় তাহলে এখনো কেউ বিনিয়োগ করবে না। বাজারে বিনিয়োগ করতে গিয়ে যদি আতঙ্ক বোধ করে তাহলে কেন বিনিয়োগ করবে? পুঁজিবাজারকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দিতে হবে। কোনো ধরনের অযাচিত হস্তক্ষেপ করা যাবে না। এমনকি ডিএসই অযাচিত হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। তা না হলে বিনিয়োগকারীদের মাঝে আস্থা ফিরবে না।
দ্বিতীয়ত, পুঁজিবাজারকে সংস্কার ও বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার আগে বাজারকে স্থিতিশীল করতে হবে। প্রথমে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে এনে পরবর্তী সময়ে সেই স্থিতিশীলতা ধরে রাখা এবং বাজারকে আরও আকর্ষণীয় করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে হবে। এর ফলে বাজারে নতুন বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ বাড়ার পাশাপাশি লেনদেনেও গতি ফিরবে। অন্যদিকে বাজার স্থিতিশীল না করে শুধু সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিলে তার সুফল পাওয়া কঠিন হবে।
কারণ বর্তমানে একটি চক্র কৃত্রিমভাবে বাজারে সংকট তৈরি করে বিভিন্ন ধরনের গুজব ছড়াচ্ছে। এসব গুজব ও কারসাজির মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক বা প্যানিক সৃষ্টি করে বাজারকে অস্থিতিশীল করা হচ্ছে। এর ফলেই ধারাবাহিকভাবে পতন আরো তরান্বিত হচ্ছে বলে মনে করছেন। এ চক্রকে দ্রুত চিহ্নিত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। তা না হলে বাজারে টেকসই স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না বলেও তারা মনে করছেন।
তৃতীয়ত, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি ও সরকারকে কঠোর বাজার তদারকি ও অনিয়মে জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাাপাশি বিনিয়োগকারীদের পুঁজির নিরাপত্তা দিতে হবে তা না হলে পুঁজিবাজার স্বাভাবিক রাখান সম্ভব নয়। এমনকি ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তির ওপর জোর দিতে হবে। তেমনি কোম্পানিগুলো বছর শেষে বিনিয়োগকারীদের জন্য ভালো লভ্যাংশ দিতে হবে।
চতুর্থত, বাংলাদেশের পুঁজিবাজার এখনো মূলত খুচরা বিনিয়োগকারী-নির্ভর। বিএসইসি বাজারকে টেকসই করতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানোর চেষ্টা করতে হবে। এ জন্য প্রভিডেন্ট ফান্ড ও অন্যান্য তহবিলের অর্থ পুঁজিবাজারের পাশাপাশি করপোরেট বন্ডে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানোর দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ উন্নত দেশের পুঁজিবাজারে পেনশন ফান্ড ও বিমা কোম্পানি বড় বিনিয়োগকারী। বাংলাদেশেও এসব প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীকে বাজারে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।
পঞ্চতম, পুঁজিবাজারে কারসাজি করে এখন আর কেউ পার পাবে না এ নিশ্চিয়তা দিতে হবে। কারণ বিনিয়োগকারীরা পুঁজির নিরাপত্তা না পেলে এখানে বিনিয়োগ করবে না। মুলত বিশ্বের সবদেশেই পুঁজিবাজারে অল্প-স্বল্প কারসাজি হয়। উদীয়মান মার্কেটগুলোতে তা একটু বেশি হয়। হলেও তার জরিমানা হয়, কিংবা অন্যভাবে শাস্তির আওতায় আনা হয় কারসাজিকারীদের। এর একটি উদাহরণ দেই।
পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের প্রভাবশালী ধনকুবের এবং রিলায়েন্সের কর্ণধার অনিল আম্বানিকে শেয়ার লেনদেনে আইন অমান্য করার দায়ে ২০১১ সালে সেদেশের পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা (সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ বোর্ড অব ইন্ডিয়া) জরিমানা হিসেবে ৫০ কোটি রুপি আদায় করে। পাশাপাশি তাকে এক বছরের জন্য পুঁজিবাজারের যে কোনো লেনদেন থেকে নিষিদ্ধ করা হয়। এ ঘটনায় ভারতের অন্য কারসাজিকারীরাও সচেতন হয়। পাশাপাশি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থাও বৃদ্ধি পায়।

