কথায় নয়, কাজের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো হবে: মাসুদ খান
শেয়ারবার্তা ২৪ ডটকম, ঢাকা: পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট রয়েছে স্বীকার করে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেছেন, কথায় নয়, কাজের মাধ্যমে এ আস্থা ফিরিয়ে আনা হবে। কারণ বাজারের সূচক বা লেনদেন বাড়ানো বিএসইসির কাজ নয়। একটি ন্যায্য, স্বচ্ছ ও সুশৃঙ্খল বাজার নিশ্চিত করা এবং বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা দেওয়াই নিয়ন্ত্রক সংস্থার মূল দায়িত্ব।
আজ সোমবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ করণীয়’ শীর্ষক উন্মুক্ত আলোচনায় এসব কথা বলেন তিনি।
মাসুদ খান বলেন, নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা অনেক বেড়েছিল। এর অন্যতম কারণ, বর্তমান সরকার পুঁজিবাজারবান্ধব এবং বাজেটে পুঁজিবাজারের জন্য একসঙ্গে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ব্যক্তিশ্রেণির শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশের ওপর চূড়ান্ত কর ১৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। আপনার অ্যাকচুয়াল ট্যাক্স স্ল্যাব যাই হোক না কেন, ফাইনাল ট্যাক্স হচ্ছে ১৫ শতাংশ। এটা অনেক দেশে আপনি পাবেন না।
বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার দ্বিতীয় দিনেই দীর্ঘদিনের ‘পেইন পয়েন্ট’ ফ্লোর প্রাইস তুলে দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে এর গুরুত্ব ছিল অনেক বেশি। ফ্লোর প্রাইসের কারণে মরগ্যান স্ট্যানলি ক্যাপিটাল ইন্টারন্যাশনাল (এমএসসিআই) বাংলাদেশের সূচক স্থগিত করেছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমি এখন আপনাদের জানাতে চাই যে মরগ্যান স্ট্যানলি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আগামী নভেম্বর থেকে তারা আবার এটাকে চালু করবে। বেক্সিমকো ফার্মার লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে জিডিআর (গ্লোবাল ডিপোজিটরি রিসিপ্ট) তালিকাভুক্তির দীর্ঘদিনের জটিলতা সমাধান করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, কমিশনে যোগ দেওয়ার এক মাসের মধ্যে এ সমস্যার সমাধান করা হয়েছে। বিষয়টি সমাধান না হলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ থেকে আর কোনো কোম্পানির জিডিআর তালিকাভুক্তির সুযোগ থাকত না। এরই মধ্যে কয়েকটি বড় বাংলাদেশি কোম্পানি বিদেশি তালিকাভুক্তির বিষয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছে বলেও জানান তিনি।
ব্রোকারেজ হাউজগুলোর তদারকি প্রসঙ্গে মাসুদ খান বলেন, শুধু জরিমানা করে বড় ধরনের সিসিএ ঘাটতি মোকাবিলা করা কঠিন। এ ক্ষেত্রে বিএসইসি ও ডিএসইকে ঝুঁকিভিত্তিক পদ্ধতি এবং ‘সারপ্রাইজ ইন্সপেকশন’ এর দিকে যেতে হবে। সারপ্রাইজ ইজ ভেরি ইম্পর্ট্যান্ট এবং বোথ ডিএসই এবং আমরা দুজনেই মনে করি যে সারপ্রাইজ ইন্সপেকশন হওয়া উচিত এবং রেগুলারলি হওয়া উচিত, নট ৫ বছর পরে।
বিএসইসি ও ডিএসইর সার্ভিল্যান্স ব্যবস্থা এআইভিত্তিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। প্রথম ধাপে ডিএসই তাদের ব্যবস্থা আপগ্রেড করবে এবং পরবর্তী সময়ে বিএসইসিও এআইভিত্তিক সার্ভিল্যান্সে যাবে।
দেশের বন্ড মার্কেটকে শক্তিশালী করতে ডিএসইর সঙ্গে কাজ করা হচ্ছে জানিয়ে বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, বন্ড লেনদেনের অন্যতম বাধা ছিল ফি। ডিএসইর সঙ্গে আলোচনার পর বন্ড মার্কেটের ফি কমানো হয়েছে। ব্র্যাক ব্যাংক ১ হাজার কোটি টাকার সোশ্যাল বন্ড বাজারে আনার উদ্যোগ নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে তার শর্ত ছিল, বন্ডটি ডিএসইর মেইন বোর্ডে তালিকাভুক্ত করতে হবে। আইপিও প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার সমালোচনা করে বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, একটি কোম্পানির আইপিও আবেদনে একাধিক পর্যায়ে একই ধরনের প্রশ্ন ও নথি যাচাইয়ের কারণে প্রক্রিয়া দীর্ঘ হচ্ছে।
এ সমস্যা কমাতে নতুন আইপিও বিধিতে ‘এক্সটেন্ডেড অডিট’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ অডিটের মাধ্যমে কোম্পানির সম্পদ, জমি, যন্ত্রপাতি, পাওনা ও দায়সহ আর্থিক বিবরণীর বাস্তবতা যাচাই করা হবে। এই প্রত্যেকটা জিনিস একটা স্ট্যাটুটরি অডিটে ধরা পড়ে না। এইজন্য আমরা যেটা নতুন প্রণয়ন করতে যাচ্ছি আইপিও রুলসের মধ্যে, যে একটা এক্সটেন্ডেড অডিট থাকবে।
পুঁজিবাজারের সূচক বা লেনদেন বাড়ানো বিএসইসির দায়িত্ব নয় বলে স্পষ্ট করেন মাসুদ খান। তিনি বলেন, আমাদের রোলটা কি মার্কেটের টার্নওভারটা এনশিওর করা? আমাদের রোলটা কি ইনডেক্সটা বাড়তেই হবে? ইজ দ্যাট আ রোল? মাই কোশ্চেন। বিশ্বজুড়ে সিকিউরিটিজ কমিশনের মূল দায়িত্ব হলো ন্যায্য, স্বচ্ছ ও সুশৃঙ্খল বাজার নিশ্চিত করা, বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা দেওয়া এবং পুঁজিবাজারকে গভীর করা।
তিনি বলেন, সূচক বা লেনদেনকে কৃত্রিমভাবে প্রভাবিত করতে গেলে নিয়ন্ত্রকের সঙ্গে বাজারের স্বার্থের সংঘাত তৈরি হতে পারে। তাই বাজার তার নিজস্ব শক্তিতে চলবে এবং বিএসইসি এতে হস্তক্ষেপ করবে না। স্বল্পমেয়াদি কোনো পদক্ষেপ নিয়ে বাজারকে কৃত্রিমভাবে চাঙা করা টেকসই সমাধান নয় বলে মনে করেন তিনি।
সাধারণ বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, আপনারা আস্থা রাখেন। আমরা যে কাজ করছি, এই কাজগুলো আপনারা মূল্যায়ন করেন। মূল্যায়ন করে আপনারা আপনাদের ডিসিশনটা নেবেন। এই পুঁজিটা আপনার, এই পুঁজিটা আপনাকেই সংরক্ষণ করতে হবে।

