বেক্সিমকোর শেয়ারে নি:স্ব হওয়া বিনিয়োগকারীদের আর্তনাদ
শেয়ারবার্তা ২৪ ডটকম, ঢাকা: রাজধানীর মতিঝিলে ব্রোকারেজ হাউসের বড় মনিটরজুড়ে তখন শুধু সুবজ আর লাল। সূচকও কিছুটা বেড়েছে, তবে টানা কমেছে বেক্সিমকো কোম্পানির শেয়ারের দাম। দুপুরের দিকে অফিস ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী মিজানুর রহমান। মুখে হতাশার ছাপ স্পষ্ট। পাঁচ বছর আগে লাভের আশায় পুঁজিবাজারে এসেছিলেন তিনি। এখন সেই বিনিয়োগই যেন দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মিজানুর রহমান বলেন, করোনা মহামারির পর থেকেই বাজার মন্দার মধ্যে আছে। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর কয়েকদিন বাজারে বড় উত্থান দেখা গেলেও অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো সময়জুড়ে আবারও দরপতন হয়েছে। আমার মতো সাধারণ বিনিয়োগকারীদের লোকসানের পাল্লা দিন দিন ভারী হয়েছে। তবে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর স্বপ্ন দেখছি পুঁজিবাজার ভাল হবে। তবে বাজার উত্থান পতনের মধ্যে চললেও আমার সাড়ে দশ লাখ টাকা বিনিয়োগ বর্তমানে সেই বিনিয়োগ কমে এক লাখ টাকায় চলে এসেছে।
তিনি বলেন, নতুন রাজনৈতিক সরকার এলে বাজার ঘুরে দাঁড়াবে, এই আশায় ছিলাম। শুরুতে কিছুটা ভালো অবস্থাও ছিল। কিন্তু বেক্সিমকো লিমিটেডের শেয়ার ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের পর ক্রেতা সংকটে পড়েছে। ফলে আমার পুঁজি নিয়ে দু:চিন্তায় আছি। যে ক্ষতির মধ্যে পড়েছি, তা হয়তো আর কখনো কাটিয়ে উঠতে পারবো না। এখন শুধু চেষ্টা করছি লোকসান কিছুটা কমানোর।
মিজানুর রহমানের এই হতাশা শুধু একজন বিনিয়োগকারীর গল্প নয়, দেশের পুঁজিবাজারে এখন হাজার ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী বেক্সিমকো লিমিটেডের শেয়ার কিনে এখন নি:স্ব প্রায়। ফলে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের পর টানা ১৩ কার্যদিবস ক্রেতা সংকটে পড়েছে পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত বেক্সিমকো লিমিটেড। কোম্পানিটির শেয়ারের ভয়াবহ দরপতন হচ্ছে। ফ্লোর প্রাইস তুলে দেওয়ার পর ১৩ কার্যদিবসেই কোম্পানিটির শেয়ার দাম সম্মিলিভাবে প্রায় আট হাজার কোটি টাকার কমে গেছে। এমন পতনের কারণে বেক্সিমকোর শেয়ারে বিনিয়োগ করা বিনিয়োগকারীরা বড় ধরনের লোকসানের মধ্যে পড়েছেন।
লোকসান মেনে নিয়ে কোনো কোনো বিনিয়োগকারী শেয়ার দিনের সর্বনিম্ন দামে বিক্রির চেষ্টা করলেও ক্রেতা পাচ্ছেন না। ফলে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের পর লেনদেন হওয়া ১৩ কার্যদিবসেই কোম্পানিটির শেয়ার দাম যতটা কমা সম্ভব ততটাই কমেছে। প্রতি কার্যদিবসেই দিনের সর্বনিম্ন দামে বিপুল শেয়ার বিক্রির আদেশ আসছে। বিপরীতে শূন্য পড়ে থাকছে ক্রয় আদেশের ঘর।
দেশের পুঁজিবাজারে প্রথম ফ্লোর প্রাইস আরোপ করা হয় ২০২০ সালে। তখন করোনো মহামারির প্রকোপ দেখা দিলে বাজারে লাগাতার পতন হতে থাকে। সেই পতন ঠেকাতে না পেরে প্রথমবার ওই বছরের মার্চে ফ্লোর প্রাইস আরোপ করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। তবে ২০২১ সালের জুলাইয়ে তা তুলে নেওয়া হয়। এরপর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে শেয়ারবাজারে দরপতন দেখা দিলে ২০২২ সালের জুলাইয়ে আবারও ফ্লোর প্রাইস আরোপ করে বিএসইসি। এ পর্যায়ে শেয়ার লেনদেন ব্যাপক কমে গেলে সমালোচনায় পড়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে পর্যায়ক্রমে ফ্লোর প্রাইস তুলে নেয় বিএসইসি।
তবে অদৃশ্য কারণে বেক্সিমকো ফ্লোর প্রাইস অব্যাহত রাখা হয়। স্টেকহোল্ডারদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে অবশেষে গত ৮ জুন বেক্সিমকো কোম্পানির ফ্লোর প্রাইস তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বিএসইসির নতুন নেতৃত্ব। যে সিদ্ধান্ত কার্যকর হয় গত ৯ জুন। ফ্লোর প্রাইস তুলে নেওয়ার পর কোম্পানিই বড় ধরনের দরপতনের মধ্যে পড়ে। কিন্তু বেক্সিমকোর শেয়ারের দাম কমার প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। আগের ১২ কার্যদিবসের মতো বৃহস্পতিবারও বেক্সিমকোর শেয়ারের ক্রেতা সংকট অব্যাহত থাকে।
এদিন পুঁজিবাজারে লেনদেন শুরু হতেই দিনের সর্বনিম্ন দামে বেক্সিমকোর কয়েক কোটি শেয়ার বিক্রির আদেশ আসে। বিপরীতে শূন্য ছিল ক্রয় আদেশের ঘর। আগের ১২ কার্যদিবসেও একই চিত্র ছিল। এতে ১৩ কার্যদিবসের ব্যবধানে ১১০ টাকা ১০ পয়সা থেকে কমে কোম্পানিটির শেয়ার দাম ২৮ টাকা ৪০ পয়সায় নেমে এসেছে।
অর্থাৎ প্রতিটি শেয়ারের দাম কমেছে ৮১ টাকা ৪০ পয়সা। ফলে সম্মিলিতভাবে কোম্পানিটির শেয়ার দাম কমেছে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা। এখন ভয়াবহ দরপতন হলেও কোম্পানিটির শেয়ার দামের উত্থানও ছিল অস্বাভাবিক। ২০২০ সালের ১৭ মার্চ কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ারের দাম ছিলো ১০ টাকা ৭৬ পয়সা। এরপর দফায় দফায় দাম বেড়ে ২০২১ সালে প্রতিটি শেয়ারের দাম রেকর্ড ১৭৮ টাকা ৯৫ পয়সায় উঠে। এরপর দরপতন হতে থাকলে ১১০ টাকা ১০ পয়সা ফ্লোর প্রাইস নির্ধারণ করে কোম্পানিটির শেয়ার দাম এক জায়গায় আটকে রাখা হয়।
বেক্সিমকোর মোট শেয়ার সংখ্যা ৯৪ কোটি ৩২ লাখ ৩৬ হাজার ২৬২টি। এর মধ্যে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের কাছে আছে ৩৩ দশমিক ১১ শতাংশ শেয়ার। বাকি শেয়ারের মতো ৩৩ দশমিক ৩৬ শতাংশ আছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ৩২ দশমিক ৫৯ শতাংশ এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে দশমিক ৯৪ শতাংশ আছে।

