শেয়ারবার্তা ২৪ ডটকম, ঢাকা: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইপিডিসি ফাইন্যান্স খেলাপি ঋণে জর্জরিত। প্রতিষ্ঠানটির ২০২৫ সালের বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদনে বৈপরীত্যের চিত্র ফুটে উঠেছে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩৯ কোটি টাকার বেশি বা ১০ শতাংশ। এ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির আমানতকারীরা অত্যন্ত ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন। এছাড়াও সম্প্রতি শেয়ার দর অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় কোম্পানিটিতে বিনিয়োগে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সতর্ক থাকতে বলেছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, গত বছর (৩১ ডিসেম্বর ২০২৪) আইপিডিসি ফাইন্যান্সের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৪০৫ কোটি ৬৭ লাখ ৪৭ হাজার ৯৭৩ টাকা। আর বিদায়ী বছরে তা এসে দাঁড়িয়েছে ৪৪৫ কোটি ২৫ লাখ দুই হাজার ৯৬ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠানটির খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩৯ কোটি ৫৭ লাখ ৫৪ হাজার ১২৩ টকা। এছাড়া কাগজে-কলমে প্রতিষ্ঠানটির নিট মুনাফা গত বছরের তুলনায় ২৫ শতাংশ বাড়লেও ধস নেমেছে তাদের মূল ঋণ ব্যবসায়।

ঋণ দিয়ে সুদ আদায়ের মাধ্যমে যে আয় হওয়ার কথা (নিট সুদ আয়), তা এক বছরে কমেছে ৩৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা। মূলত সরকারি ট্রেজারি বন্ড ও পুঁজিবাজারের বিনিয়োগ থেকে আসা অস্বাভাবিক আয়ের ওপর ভর করেই বড় ধরনের লোকসান এড়িয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। আইপিডিসির ২০২৫ সালের নিরীক্ষিত বার্ষিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান আয়ের উৎস হলো আমানত সংগ্রহ করে তা ঋণ হিসেবে বিতরণের মাধ্যমে অর্জিত সুদ। কিন্তু আইপিডিসির প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠানটির নিট সুদ আয় (নেট ইন্টারেস্ট ইনকাম) ছিল ২৩৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা। ২০২৫ সালে তা ১৬ দশমিক ১৭ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ২০০ কোটি ৬০ লাখ টাকায়।

অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মূল ব্যবসা থেকে আয় কমেছে ৩৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা। একই সময়ে আমানতকারীদের সুদ দিতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানের ব্যয় ১৭ দশমিক ৬৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও ঋণ থেকে অর্জিত আয় সেই হারে বাড়াতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি।

অন্যদিকে বিনিয়োগ খাত থেকে আয়ে বড় প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০২৪ সালে সরকারি ট্রেজারি বন্ড ও অন্যান্য বিনিয়োগ থেকে প্রতিষ্ঠানটির আয় ছিল ৬৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা। ২০২৫ সালে তা ৯৩ দশমিক ২৯ শতাংশ বেড়ে ১৩২ কোটি ৪০ লাখ টাকায় পৌঁছেছে। মূলত এ আয়ের ওপর ভর করেই প্রতিষ্ঠানটির নিট মুনাফা ৩৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা থেকে ২৫ দশমিক ৩৯ শতাংশ বেড়ে ৪৫ কোটি ৫০ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে।

বাজার-সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, মূল ঋণ ব্যবসায় মন্দার কারণে বিনিয়োগ আয়ের এ প্রবৃদ্ধি প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা ধরে রাখতে কৃত্রিম রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করেছে। আইপিডিসির খেলাপি ঋণের (এনপিএল) হার ও পরিমাণ দুই-ই উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠানটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৪০৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা, যা ২০২৫ সালে ৯ দশমিক ৭৬ শতাংশ বেড়ে ৪৪৫ কোটি ৩০ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে খেলাপি ঋণের গড় হার ৫ দশমিক ৮৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫ দশমিক ৯৭ শতাংশ হয়েছে।

খাতভিত্তিক খেলাপি ঋণের চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা ব্যবসা ও বাণিজ্য খাতে। এ খাতে খেলাপি ঋণের হার ১৫ দশমিক ০৫ শতাংশ। এ ছাড়া কৃষি খাতে খেলাপি ঋণের হার ১১ দশমিক ৯৯ শতাংশ। বড় অঙ্কের ঋণ অবলোপন (রাইট-অফ) করার পরও ব্যবসা ও কৃষি খাতে ঋণের এই নিম্নমান প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকেই নির্দেশ করে।

২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটি ১০৫ কোটি ৭০ লাখ টাকার ঋণ অবলোপন করেছে, যা আগের বছরের ৬১ কোটি ৫০ লাখ টাকার তুলনায় প্রায় ১২০ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। সাধারণত দীর্ঘদিন আদায়ের সম্ভাবনা কমে যাওয়া ঋণ নীতিমালা অনুযায়ী অবলোপন করা হয়। রাইট-অফের পরিমাণ এভাবে অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় ঋণ পোর্টফোলিওর গুণগত মান নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে মূলধন পর্যাপ্ততার হার (সিএআর) ১৮ দশমিক ০৯ শতাংশ থেকে কমে ১৭ দশমিক ১৪ শতাংশে নেমে এসেছে। যদিও এটি এখনো নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত ন্যূনতম ১০ শতাংশ সীমার ওপরে রয়েছে, তবুও এটি মূলধন সক্ষমতায় চাপের ইঙ্গিত দেয়।

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘ডিলয়েট’ (নুরুল ফারুক হাসান অ্যান্ড কোং) তাদের অডিট রিপোর্টে আইপিডিসির ঋণ শ্রেণীকরণ ও নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রোভিশন) নির্ধারণকে ‘কি অডিট ম্যাটার’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অডিটররা বলেছেন, ঋণ ক্লাসিফিকেশনের ক্ষেত্রে ম্যানেজমেন্ট অনেক সময় নিজস্ব বিচারবুদ্ধি ব্যবহার করেছে, যা প্রকৃত ঝুঁকির সঠিক প্রতিফলন না-ও হতে পারে।

প্রতিষ্ঠানটির তারল্য (লিকুইডিটি) বিবরণী বিশ্লেষণে দেখা যায়, পাঁচ বছরের বেশি মেয়াদে সম্পদ ও দায়ের মধ্যে ১ হাজার ৪১৪ কোটি টাকার বিশাল নেতিবাচক ব্যবধান বা ঘাটতি রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দীর্ঘমেয়াদি ‘গ্যাপ’ ভবিষ্যতে আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

বার্ষিক প্রতিবেদনের বিভিন্ন অংশে তথ্যগত অসংগতিও পাওয়া গেছে। কর্মকর্তাদের বার্ষিক প্রশিক্ষণ ব্যয় এক জায়গায় ৪৯ লাখ ৩০ হাজার টাকা (পৃষ্ঠা ১৩৮) দেখানো হলেও অন্য জায়গায় তা মাত্র ২৪ লাখ ৬০ হাজার টাকা (পৃষ্ঠা ১৬৭) উল্লেখ করা হয়েছে। শাখা বা ব্রাঞ্চের সংখ্যা কোথাও ১৭টি আবার কোথাও ১৮টি বলা হয়েছে।

ভৌগোলিক ঝুঁকি বিশ্লেষণে দেখা যায়, আইপিডিসির মোট ঋণের ৭৭ দশমিক ১ শতাংশই শুধু ঢাকা বিভাগে বিতরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির ১৩ শতাংশ দক্ষ কর্মী চাকরি ছেড়ে চলে গেছেন, যা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ কর্মপরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। নিট মুনাফায় সাময়িক প্রবৃদ্ধি দেখালেও পাঁচ বছরের দীর্ঘমেয়াদি যৌগিক বার্ষিক প্রবৃদ্ধি (সিএজিআর) এখন ঋণাত্মক ৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ।

এ ব্যাপারে আইপিডিসি কর্তৃপক্ষ জানায়, কোভিড পরবর্তী সামগ্রিক দুর্বল ব্যবসায়িক পরিবেশ, সচরাচর পলিসি পরিবর্তন, রাশিয়া-ইউক্রেন, মিডেল ইস্টের যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব এবং দেশের রাজনৈতিক রদবদল এবং অস্থিরতা বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে বিরুপ প্রভাব ফেলে। তারই ফলশ্রুতিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, উর্ধ্বমুখী সুদের হার এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের ফলে নির্দিষ্ট কিছু গ্রাহকদের ওপর উল্লেখযোগ্য আর্থিক চাপ সৃষ্টি হয়।

আমদানি সীমাবদ্ধতা ও সার্বিক ব্যবসায়িক মন্দার কারণে বহু প্রতিষ্ঠানের বিক্রয়ের পাশাপাশি নগদ প্রবাহ হ্রাস পেয়েছে, যার ফলে তাদের জন্য সময় মতো ঋণ পরিশাধের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। এছাড়া পূর্বে প্রদত্ত ঋণ পুনঃতফসিল সুবিধার মেয়াদ শেষ হওয়া এবং ঋণ শেণীকরণে রক্ষণশীলনীতি অনুসরণ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এনপিএল রেশিও কমানোর জন্য আইপিডিসি তাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।

বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান যখন খেলাপি ঋণের বেড়াজালে আটকে যায়, তখন সেই প্রতিষ্ঠানের প্রতি আমানতকারীদের আস্থা দিন দিন কমতে থাকে। কারণ যেকোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ, আমানতকারীদের আমানত ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা কমিয়ে দেয়। আইপিডিসির বর্তমান খেলাপি ঋণ কোনাভাবেই প্রত্যাশিত নয়। এতে করে কোম্পানিটির প্রতি আমানতকারীদের আস্থা, বিশ্বাস কমতে শুরু করেছে।

প্রতিষ্ঠানটির ঋণ খেলাপি বৃদ্ধির বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, যেকোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পেলে তা অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়। আমরা আইপিডিস ফাইন্যান্সের ঋণ খেলাপিসহ সামগ্রিক বিষয় পর্যবেক্ষণ করছি।

২০০৬ সালে আইপিডিসি ফাইন্যান্স পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। কোম্পানিটির মোট শেয়ারসংখ্যা ৪২ কোটি ৯৫ লাখ ৮৪ হাজার ৮৫১টি। এর মধ্যে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের কাছে রয়েছে ৪০ শতাংশ, সরকারের কাছে ২১ দশমিক ৮৮ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ২৩ দশমিক ৯৫ শতাংশ এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে শূন্য দশমিক ০৬ শতাংশ শেয়ার। বাকি ১৪ দশমিক ১১ শতাংশ শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে। সূত্র: দৈনিক দেশ প্রতিক্ষণ