স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, শেয়ারবার্তা ২৪ ডটকম, ঢাকা: চলতি সপ্তাহে টানা তিন কার্যদিবস ঊর্ধ্বমুখী থাকার পর সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচকের পতনে লেনদেন শেষ হয়েছে। তবে টানা দুই কার্যদিবস সূচকের দরপতনে নতুন ছড়িয়ে পড়ছে বিনিয়োগকারীদের মাঝে। কারণ যতবার দুই একদিন সূচকের উর্ধ্বমুখী দেখা যায় তার পরই দরপতন ঘটে। মুলত আস্থা সংকটের কারণে ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না পুঁজিবাজার। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএসইসির একের পর এক বাজার নিয়ে হুটহাট সিদ্ধান্তে বাজারের প্রতি আস্থা বাড়ছে না বিনিয়োগকারীদের।

গত ৫ আগস্টের পর দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সরকারের সঙ্গে পরিবর্তন আসে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি)। খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বাধীন নতুন কমিশন ১৮ আগস্ট দায়িত্ব নেওয়ার পর কারসাজি রোধে তৎপর হলেও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে ব্যর্থ হয়েছে। এছাড়া বাজার আজ ভাল তো কাল খারাপ।

এ অবস্থার মধ্যে বছরের পর বছর পার করছে বিনিয়োগকারীরা। ফলে দীর্ঘদিন ধৈর্য্য ধরেও বিনিয়োগকারীরা একটি স্থিতিশীল পুঁজিবাজার ফিরে পায়নি। যার কারণে আস্থা সংকট কাটছে না। এ অবস্থায় বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের মাঝে আস্থা ফিরিয়ে আনাই নিয়ন্ত্রক সংস্থার মুল চ্যালেঞ্জ। কারণ দেশে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর পুঁজিবাজার সংস্কারের উদ্যোগ নেয় সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) পুনর্গঠন করা হয়। তবে পুঁজিবাজারে সংস্কারের উদ্যোগে নতুন আশায় স্বপ্ন বুনতে থাকেন বিনিয়োগকারীরা।

তবে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের প্রায় ১৭ মাস অতিবাহিত হতে চললেও বাজারে স্থিতিশীলতা আসেনি। এমনকি নির্বাচনের তফসিলের ঘোষণার পরও ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না পুঁজিবাজার। মুলত টানা দরপতনে আস্থা সংকটে ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না পুঁজিবাজার। তাই যে কোন মূল্যে পুঁজিবাজারে আস্থা সংকট কাটলেই নির্বাচনের পর হু হু করে বাড়বে বলে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

তবে শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর বাজার ভাল হবে এমন প্রত্যাশা ছিলো লাখ লাখ বিনিয়োগকারীদের। কিন্তু বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তিতে বিশাল ফারাক। ফলে বিনিয়োগকারীরা নতুন করে বিনিয়োগে সাহস পাচ্ছেন না। এছাড়া নতুন বিনিয়োগকারীরা বাজারমুখী হচ্ছে না। এ অবস্থায় পুঁজিবাজারে আস্থার সংকট দূরীকরণে সুশাসনের বিকল্প নেই বলে মনে করছেন একাধিক বিনিয়োগকারীরা।

মুলত গত বুধবার ফাইন ফুডসের শেয়ার কারসাজিতে নতুন করে ১ কোটি ৫৩ লাখ টাকার জরিমানা আতঙ্কে বাজারে নেতিবাচক অবস্থা বিরাজ করছে। কারণ গত বছরও ফাইন ফুডসের শেয়ার কারসাজিতে ১ কোটি ৯৬ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। যার কারণে একের পর এক জরিমানা আতঙ্কে বাজারে অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। ফলে পুঁজিবাজার ইস্যুতে যে কোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিএসইসি ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবী জানিয়েছেন বিনিয়োগকারীরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শীর্ষ এক ব্রোকারেজ হাউজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, আস্থা সংকটের কারণে ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না পুঁজিবাজার। আর এ আস্থা সংকটের নেপথ্যে বিএসইসি ও বাংলাদেশ ব্যাংক। কারণ দরপতনের কারণ যাই হোক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

একাধিক ব্রোকার হাউস ও মর্চেন্ট ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, কমিশনের কাছে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা ছিল অতীতে যেসব অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হয়েছিল, সেগুলোর পুনরাবৃত্তি হবে না; এমন ভরসা তৈরি করা। অনিয়ম ও দুর্নীতির সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে ২০১০ সালের পুঁজিবাজার ধসের ঘটনায় জড়িতদেরও আইনের আওতায় আনা।

তবে সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য যেসব বিষয়ে তাদের অস্বস্তি আছে, সেগুলো আপাতত দূরে রাখা। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ভীতি সঞ্চার করে এবং বাজার মধ্যস্থতাকারীদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করে এ বাজার পরিচালনা করা যাবে না বলে তারা মনে করেন।

জানা গেছে, দিনশেষে ডিএসই ব্রড ইনডেক্স আগের দিনের চেয়ে ৬ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ৫ হাজার ৯৯ পয়েন্টে। আর ডিএসই শরিয়াহ সূচক ২ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ১ হাজার ২৫ পয়েন্টে এবং ডিএসই ৩০ সূচক ১ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ১ হাজার ৯৬২ পয়েন্টে।

দিনভর লেনদেন হওয়া ৩৯০ কোম্পানি ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মধ্যে দর বেড়েছে ১৪৫ টির, দর কমেছে ১৮৯ টির এবং দর অপরিবর্তিত রয়েছে ৫৬ টির। ডিএসইতে ৫৩৬ কোটি ১২ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। যা আগের কার্যদিবস থেকে ৬৯ কোটি ৪৮ লাখ টাকা কম। এর আগের দিন লেনদেন হয়েছিল ৬০৫ কোটি ৬০ লাখ টাকার ।

অপরদিকে, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ১৭ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ২৫৩ পয়েন্টে। সিএসইতে ১৬৪ টি কোম্পানি লেনদেনে অংশ নিয়েছে। এসব কোম্পানির মধ্যে ৮৩ টির দর বেড়েছে, কমেছে ৫৬ টির এবং ২৫ টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। সিএসইতে ১৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে।