শেয়ারবার্তা ২৪ ডটকম, ঢাকা: যে কোনো সংকটের পাশেই থাকে সম্ভাবনা। পুঁজিবাজারও ঠিক এরকম। বর্তমানে পুঁজিবাজারে বহুমুখী সংকট রয়েছে। বিপরীতে দশ বছরের মধ্যে বিনিয়োগের জন্য সবচেয়ে আর্কষণীয় অবস্থায় রয়েছে বিভিন্ন কোম্পানির মূল্যস্তর। মৌলভিত্তি সম্পূর্ণ বেশ কিছু কোম্পানির শেয়ারের এমন অবস্থায় চলে এসেছে, তাতে বিনিয়োগ করলে ভালো মুনাফা আসবেই। এর মধ্যে শক্তিশালী মৌলভিত্তির কোম্পানিগুলো অন্যতম। পাশাপাশি অ্যানালাইসিস কোম্পানির শেয়ারের মুভমেন্ট বলে দেবে। শক্তিশালী মৌলভিত্তি সম্পূর্ণ শেয়ারের বেশ কিছু বৈশিষ্ট রয়েছে।

এরমধ্যে বিনিয়োগের জন্য প্রথমত শেয়ারের সম্পদ মূল্য দেখতে হবে। সংক্ষেপে বলা হয় নিট এসেট ভ্যালু (এনএভি)। প্রকৃত সম্পদ মূল্য ভালো শেয়ার সম্পদ মূল্য বেশি থাকে। দ্বিতীয় শেয়ারপ্রতি আয় বা ইপিএস। একটি কোম্পানি প্রতিটি শেয়ারের বিপরীতে কী পরিমাণ আয় করছে, বিনিয়োগের জন্য তা অবশ্যই বিবেচনা করা উচিত। এরপর শেয়ারের মূল্য ও আয়ের অনুপাত (পিই রেশিও) : কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয় এবং শেয়ারের বর্তমান বাজার মূল্যের অনুপাত। এটি বাজারের সবচেয়ে বড় মাপকাঠি। এ অনুপাত যত কম, শেয়ার তত ঝুঁকিমুক্ত।

বাজার বিশেষকদের মতে, বাজারের অন্যতম আরেক মাপকাঠি হল কোম্পানির লভ্যাংশ বা ডিভিডেন্ড। এ লভ্যাংশ কখনও নগদ বা বোনাস শেয়ার হতে পারে। তবে ভালো কোম্পানিগুলো নগদ লভ্যাংশ বেশি দেয়। এছাড়াও রয়েছে কোম্পানির বুক ভ্যালু ও প্রবৃদ্ধির হার। অন্যদিকে কোম্পানির উদ্যোক্তা হিসেবে কারা রয়েছে, তাদের পেছনের রেকর্ড অবশ্যই বিনিয়োগের জন্য বিবেচনায় নিতে হবে।

আর টেকনিক্যাল এনালাইসিসের মধ্যে বেশ কিছু বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে। এর ব্যাখা হল যে কোম্পানির শেয়ার কেনা হবে তার বর্তমান আয়, বার্ষিক আয়, কোম্পানির নতুন কোনো পরিবর্তন আসছে কিনা, কোম্পানির পণ্য সরবরাহ কেমন, নেতৃত্বে কারা আছে, কোম্পানির শেয়ারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ কেমন এবং সব শেষে ওই কোম্পানির পণ্যের বাজারে চাহিদা কেমন আছে।

যিনি পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে আগ্রহী তার প্রথম কাজ হবে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির আর্থিক বিবরণ সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা নেয়া। প্রতিটি কোম্পানি প্রতি বছর বার্ষিক আয়-ব্যয় সংবলিত একটি প্রতিবেদন পেশ করে। ওই প্রতিবেদন সংগ্রহ করে কোম্পানির আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে হবে।

তবে গত সপ্তাহে খাতভিত্তিক চিত্রেও একই ধরনের বার্তা পাওয়া যায়। ওষুধ খাত এখনো তুলনা মূলকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। স্থিতিশীল আয় ও ধারাবাহিক লভ্যাংশ এবং শক্তিশালী মৌলিক ভিত্তির কারণে এই খাত বিনিয়োগকারীদের আস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। ব্যাংকিং খাত নিয়ে মতভেদ থাকলেও অনেকেই মনে করেন, সংস্কার কার্যকর হলে এ খাত আবারও প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে। তবে সব ব্যাংক নয়; সুশাসন ও আর্থিক সক্ষমতায় এগিয়ে থাকা প্রতিষ্ঠান গুলোকেই গুরুত্ব দিতে হবে।

মিউচুয়াল ফান্ড খাতেও দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটার কিছু ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। অবমূল্যায়িত তহবিলগুলোর ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক পদক্ষেপ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় সহায়ক হতে পারে। একইভাবে করপোরেট বন্ড, সুকুক, গ্রিন বন্ড কিংবা ভবিষ্যতের ইটিএফ ও রিয়েল এস্টেট ইনভেস্টমেন্ট ট্রাস্টের মতো নতুন পণ্য বাজারকে আরও গভীর ও বৈচিত্র্যময় করতে পারে।

অবশ্য বাজারের সাম্প্রতিক উত্থানকে অতিরিক্ত উচ্ছ্বাসের কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা বলছে, পুঁজিবাজারে টেকসই উন্নতি আসে নীতিগত ধারাবাহিকতা, সুশাসন এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার ভিত্তিতে। কৃত্রিম চাহিদা সৃষ্টি কিংবা স্বল্পমেয়াদি জল্পনা-কল্পনার মাধ্যমে বাজারকে দীর্ঘদিন ধরে সচল রাখা যায় না।

বিনিয়োগকারীদের জন্যও এটি আত্মসমালোচনার সময়। পুঁজিবাজারে এখনো গুজব নির্ভর বিনিয়োগের প্রবণতা প্রবল। অথচ দীর্ঘমেয়াদে লাভবান হয়েছেন তাঁরাই, যারা কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা, ব্যবসার সম্ভাবনা এবং মৌলিক ভিত্তি বিবেচনায় বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বর্তমান বাস্তবতায় ভ্যালু ইনভেস্টিং—অর্থাৎ অবমূল্যায়িত কিন্তু শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ সবচেয়ে যুক্তিসংগত কৌশল বলে মনে হয়।

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সংস্কার সফল হলে এবং নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে পুঁজিবাজারও সেই ইতিবাচক পরিবর্তনের অংশ হতে পারে। কিন্তু সংস্কার ব্যর্থ হলে আস্থার সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। তাই এখন প্রয়োজন অতিরিক্ত আশাবাদ বা অযথা হতাশা নয়; প্রয়োজন বাস্তবতা বিবেচনায় ধৈর্য, সুশাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি।

পুঁজিবাজারের ইতিহাস বলে, বড় সুযোগের আগে প্রায়ই কঠিন সময় আসে। বাংলাদেশের বাজারও হয়তো সেই সময়ের মধ্য দিয়েই যাচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, নীতি নির্ধারকেরা তাঁদের প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়ন করতে পারেন এবং বিনিয়োগকারীরা সেই পরিবর্তনের জন্য কতটা প্রস্তুত।