Deshprothikhon-adv

প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা ডে ট্রেডারের ভূমিকায়!

0
Share on Facebook10Share on Google+0Tweet about this on TwitterPin on Pinterest0Share on LinkedIn0Share on Yummly0Share on StumbleUpon0Share on Reddit0Flattr the authorEmail this to someonePrint this page

শেয়ারবার্তা ২৪ ডটকম, ঢাকা: প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা ডে ট্রেডারের ভূমিকা পালন করছেন। ফলে বাজারের স্থায়িত্ব নিয়ে দু:চিন্তায় পড়েছেন বিনিয়োগকারী সহ বাজা বিশ্লেষকরা। তাছাড়া বর্তমান বাজারের গতিবিধি ঠিক কোনদিকে যাচ্ছে তা বুঝে উঠতে পারছেন না বিনিয়োগকারীরা। একদিন সূচক বাড়ছে তো লেনদেন কমছে। আবার পরদিন সূচক কমছেতো লেনদেন বাড়ছে। বিনিয়োগকারীরা বুঝে উঠতে পারছেন না, কী করবেন। পুঁজিবাজারের সূচক ও লেনদেনের উত্থান-পতনে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা বেশ দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়েছেন।

অভিজ্ঞ বিনিয়োগকারীরা বলছেন, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা ডে ট্রেডারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ায় বাজার খুবই অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বিক্রের চাপে সাপোর্টহীন হয়ে পড়েছে উভয় পুঁজিবাজার। গত সপ্তাহে প্রথম তিনদিন সূচক বাড়লেও চতুর্থ দিন বাজারে ব্যাপক ধস নামে। সপ্তাহের শেষদিনও কিছুটা নেতিবাচক প্রবণতায় থাকে উভয় পুঁজিবাজার।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, দেশের পুঁজিবাজারে সম্প্রতি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা সক্রিয় হয়েছেন। যার জের ধরে বেশকিছু দিন ধরে বাজারে স্থিতিশীল পরিবেশ বিরাজ করছে। গত কয়েক মাসে বিভিন্ন কোম্পানিতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ এক থেকে চার শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। পরিসংখ্যানে এমনটিই দেখা গেছে। সিংহভাগ কোম্পানির শেয়ার ধারণের দিক দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের শতকরা অংশ বেড়েছে। তবে হঠাৎ করে বাজারে ছন্দপতনে তাদের আচরণ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে বিনিয়োগকারী কাছে।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী শেয়ারের দর বাড়িয়ে বিক্রি করে দিয়ে এখন হাত গুটিয়ে বসে রয়েছেন। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের উপস্থিতি না থাকলে পুঁজিবাজার তার স্বাভাবিক গতি হারায়। যে কারণে কমে যায় লেনদেন। কমতে থাকে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর এবং বাজার মূলধন। এখন যারা বাজারে লেনদেন করছেন তারা সাধারণ বিনিয়োগকারী।

এ প্রসঙ্গে ডিএসইর সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বর্তমান পরিচালক রকিবুর রহমান বলেন,  প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা এখন ডে ট্রেডারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। এটা করলে বাজার নিজস্ব গতি হারাবে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের প্রকৃত কাজ হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। এখন দেখছি তার উল্টো চিত্র। তাদের কাছ থেকে এমন আচরণ প্রত্যাশা করেন না কেউই।’

একই প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি মার্চেন্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন ‘পুঁজিবাজারে সবাই লাভ করার জন্য আসে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা মুনাফা পেলে শেয়ার বিক্রি করে দেবে এটা স্বাভাবিক। এ জন্য তাদের দায়ী করা ঠিক হবে না।’

এদিকে বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হলে মিউচুয়াল ফান্ডের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়াতে হবে। কিন্তু দেশে মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ খুবই কম। তাই প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অবদানও কম।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সম্প্রতি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়লেও বাজারের তুলনায় তা এখনও কম। বিশ্বের বড় বড় পুঁজিবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ  আরও বেশি দেখা যায়। তাদের অভিমত প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বাজারে সক্রিয় হলে এটি বাজারের জন্য ইতিবাচক। কারণ তারা বাজারের সার্বিক অবস্থা বিচার-বিশ্লেষণ করে বিনিয়োগ করে থাকেন। তারা জানান প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা খুবই দক্ষ। কখন বাজার বাড়বে আবার কখন পড়বে এটা তারা বুঝতে পারেন। তাই মুনাফা তুলে নেওয়ার সময় তারা তুলে নেবেন এটাই স্বাভাবিক। এক্ষেত্রে বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদে হবে নাকি স্বল্পমেয়াদে হবে তা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুঁজিবাজারে কয়েক শ্রেণির বিনিয়োগকারীর সন্ধান মিলে। কিছু বিনিয়োগকারী রয়েছেন যারা অন্য পেশায় থাকলেও পুঁজিবাজার বোঝেন ও সবসময় খোঁজ-খবর রাখেন। তারা নিয়মিত লেনদেন না করলেও দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগ করেন। ক্যাপিটাল গেইনের পাশাপাশি বছর শেষে ডিভিডেন্ডসহ দুইভাবেই মুনাফা করেন। সংখ্যায় কম হলেও প্রকৃত অর্থে এরাই বিনিয়োগকারী

আর একর শ্রেণি রয়েছে, যাদের মূল পেশাই শেয়ার ব্যবসা। এরা প্রতিদিন বাজারে আসেন; নিয়মিত লেনদেন করেন। বাজার তেমন না বুঝলেও অন্যের পরামর্শে এক শেয়ার বিক্রি করে অন্যটা কেনেন। গুজবে কান দিয়ে লেনদেন করেন। বছরের পর বছর ব্যবসা করেও তারা তেমন সুবিধা করতে পারেন না। পুঁজিবাজারে ধস নামলে এই শ্রেণির লোকজন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমাদের পুঁজিবাজারে এই শ্রেণির বিনিয়োগকারীর সংখ্যাই বেশি।

আরেক শ্রেণির বিনিয়োগকারী রয়েছেন, তারা বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার ডিভিশনের কর্মকর্তার সঙ্গে ভালো যোগাযোগ রাখেন। মূল্য সংবেদনশীল তথ্য আগেই জেনে যান তারা। নিশ্চিত খবর পেয়ে বিনিয়োগ করে ভালো মুনাফাও বের করে অন্য কোম্পানি শেয়ার সুইস ওভার করেন। সংখ্যায় অল্প হলেও এরা বেশ পেশাদার। এ ব্যবসা করেই এক সময় অনেক সম্পদের মালিক হয়ে যান। দেশের পুঁজিবাজারে এরাই সবচেয়ে সুবিধাভোগী শ্রেণি। এদের সাথে বড় বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের যোগসাজস রয়েছে।

আরেক শ্রেণি বিনিয়োগকারী হলো প্রাতিষ্ঠানিক। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও দুই শ্রেণির বিনিয়োগকারী রয়েছেন। এক শ্রেণি কিছুটা লাভ হলেই জটপট মুনাফা তুলে নেন। এরা ডে ট্রেডারের ভূমিকায় থাকতে বেশি পছন্দ করেন। আরেক শ্রেণি কিছু আছে যারা কিছুটা দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগ করেন। এরা খুব কম লাভে শেয়ার ছাড়তে চান না। বিশেষ করে মৌলভিত্তির শেয়ারে এরা দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েই নামেন।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা ঝরঝরা মুডে থাকলেও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা বিপদের মধ্যে রয়েছেন। তারা বাজারের গতিবিধি অনুধাবন করতে পারছেন না। কারণ বাজার একদিন বাড়েতো পরের দিন পড়ে যাচ্ছে। আবার টানা তিন দিন বেড়ে একদিন হঠাৎ ধস নামে। কিন্তু পরের দিনই আবার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় টার্ন নেয়।

ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের পক্ষে বাজারের এই ইউ টার্ন বুঝা খুব মুশকিল। তাদের মধ্যে বেশির ভাগ বিনিয়োগকারী আটকে গেছেন। কারণ তারা শেয়ার কিনেন বেশিরভাগ সময়ে ঊর্ধ্বগতির বাজারে। এ কারণে তাদের বেশিরভাগ বিনিয়োগ প্রায়ই আটকে যায়। পোর্টফোলিও নেগেটিভ থাকায় তারা বের হয়েও আসতে পারেন না।

বর্তমান বাজার নিয়ে ডিএসইর বর্তমান পরিচালক শাকিল রিজভী বলেন, বাজার তার স্বাভাবিক গতিতে চলছে। উত্থান-পতন এটা পুঁজিবাজারের স্বাভাবিক নিয়ম। এতে বিনিয়োগকারীদের বিচলিত হওয়ার কিছুই নেই। তাই গুজবে কান না দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগের আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আরেকটা বিষয় সবারই খেয়াল রাখা উচিৎ। কোন স্টক থেকে কত শতাংশ মুনাফা নিতে চান বা কত লোকসান হলে শেয়ারটা ছেড়ে দেবেন, সেটা আগেই ঠিক করা উচিত। অতি মুনাফার লোভে প্রলুব্ধ যেন কেউ না হয়ে যায়। কারণ এই লোভে পরেই বিনিয়োগকারীদের সর্বনাশ হয়ে যায়। মুনাফার দিকে যতটা না বেশি নজর থাকবে, তার চেয়ে লোকসান যেন কম হয় সেই দিকটাই বেশি করে খেয়াল রাখা উচিত। তাহলে লাভ একসময় হবেই।

অভিজ্ঞ বিনিয়োগকারী এ্যাড. মাহামুদুল আলম বলেন, পুঁজিবাজারে মাঝে-মধ্যে ছন্দপতন ঘটলেও পরিস্থিতি এখনও অনুকূলে রয়েছে। বর্তমানে তালিকাভুক্ত অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারের মূল্য আয় অনুপাত রয়েছে বিনিয়োগের অনুকূলে। একইসঙ্গে বর্তমানে বাজারে অতিমূল্যায়িত শেয়ারও রয়েছে। সে কারণে বুঝেশুনে বিনিয়োগ করতে হবে।

তবে বাজার সংশ্লিষ্ট একটি অংশ বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা ডে ট্রেডারের ভূমিকা বাজারে নেমেছেন। এ কারণে বাজার খুব বেশি স্থায়ীও হয় না। আবার খুব বেশি নামেও না। বাজার কিছুটা বাড়লেই তারা সেলে আসেন, আবার বাজার নামতে থাকলে তার ধীরে ধীরে বাই করেন। এটা বাজারের জন্য ইতিবাচক হলে দীর্ঘমেয়াদে বাজারের জন্য ক্ষতিকর। কারণ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগের চিন্তাভাবনা করতে হবে। তা না হলে পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতা অধরাই থেকে যাবে।

 

Comments are closed.